১৫, আগস্ট, ২০১৮, বুধবার | | ৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৩৯



  • রাসেল, রাসেল তুমি কোথায়? ।।শেখ হাসিনা।।

    রাসেল, রাসেল তুমি কোথায়?
    রাসেলকে মা ডাকে, আসো,খাবে না, খেতে আসো।
    মা মা মা, তুমি কোথায় মা?
    মা যে কোথায় গেল–মাকে ছাড়া রাসেল যে ঘুমাতে চায় না ঘুমের সময় মায়ের গলা ধরে ঘুমাতে হবে। মাকে ও মা বলে যেমন ডাক দিত, আবার সময় সময় আব্বা বলেও ডাকত।

    আব্বা ওর জন্মের পরপরই জেলে চলে গেলেন।৬ দফা দেওয়ার কারণে আব্বাকে বন্দি করল পাকিস্তানি শাসকরা। রাসেলের বয়স তখন মাত্র দেড় বছরের কিছু বেশি। কাজেই তার তো সব কিছু ভালোভাবে চেনার বা জানারও সময় হয়নি। রাসেল আমাদের সবার বড় আদরের; সবার ছোট বলে ওর আদরের কোনও সীমা নেই। ও যদি কখনও একটু ব্যথা পায় সে ব্যথা যেন আমাদের সবারই লাগে। আমরা সব ভাইবোন সব সময় চোখে চোখে রাখি, ওর গায়ে এতটুকু আঁচড়ও যেন না লাগে। কী সুন্দর তুলতুলে একটা শিশু। দেখলেই মনে হয় গালটা টিপে আদর করি।

    ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর রাসেলের জন্ম হয় ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বাসায় আমার শোয়ার ঘরে। দোতলা তখনও শেষ হয়নি। বলতে গেলে মা একখানা করে ঘর তৈরি করেছেন। একটু একটু করেই বাড়ির কাজ চলছে। নিচতলায় আমরা থাকি। উত্তর-পূর্ব দিকের ঘরটা আমার ও কামালের। সেই ঘরেই রাসেল জন্ম নিল রাত দেড়টায়।

    আব্বা নির্বাচনী মিটিং করতে চট্টগ্রাম গেছেন। ফাতেমা জিন্নাহ প্রেসিডেন্ট প্রার্থী। সর্বদলীয় ঐক্য পরিষদ আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে একটা মোর্চা করে নির্বাচনে নেমেছে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সব রাজনৈতিক দল। তখনকার দিনে মোবাইল ফোন ছিল না। ল্যান্ডফোনই ভরসা। রাতেই যাতে আব্বার কাছে খবর যায় সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাসেলের জন্মের আগের মুহূর্তগুলো ছিল ভীষণ উৎকণ্ঠার। আমি, কামাল, জামাল, রেহানা ও খোকা কাকা বাসায়। বড় ফুফু ও মেজ ফুফু মার সাথে। একজন ডাক্তার এবং নার্সও এসেছেন। সময় যেন আর কাটে না। জামাল আর রেহানা কিছুক্ষণ ঘুমায় আর জেগে ওঠে। আমরাও ঘুমে ঢুলঢুলু চোখে জেগে আছি নতুন অতিথির আগমনবার্তা শোনার অপেক্ষায়।

    মেজ ফুফু ঘর থেকে বের হয়ে এসে খবর দিলেন আমাদের ভাই হয়েছে। খুশিতে আমরা আত্মহারা। কতক্ষণে দেখব। ফুফু বললেন, তিনি ডাকবেন। কিছুক্ষণ পর ডাক এলো। বড় ফুফু আমার কোলে তুলে দিলেন রাসেলকে। মাথাভরা ঘন কালো চুল। তুলতুলে নরম গাল। বেশ বড়সড় হয়েছিল রাসেল। মাথার চুল একটু ভেজা মনে হলো। আমি আমার ওড়না দিয়েই মুছতে শুরু করলাম। তারপরই এক চিরুনি নিলাম মাথার চুল আচড়াতে। মেজ ফুফু নিষেধ করলেন, মাথার চামড়া খুব নরম তাই এখনই চিরুনি চালানো যাবে না। হাতের আঙ্গুল বুলিয়ে সিঁথি করে দিতে চেষ্টা করলাম।

    আমাদের পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট রাসেল। অনেক বছর পর একটা ছোট বাচ্চা আমাদের ঘর আলো করে এসেছে, আনন্দের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। আব্বা বার্ট্র্যান্ড রাসেলের খুব ভক্ত ছিলেন, রাসেলের বই পড়ে মাকে ব্যাখ্যা করে শোনাতেন। মা রাসেলের ফিলোসফি শুনে শুনে এত ভক্ত হয়ে যান যে নিজের ছোট সন্তানের নাম রাসেল রাখলেন। ছোট্ট রাসেল আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। মা রাসেলকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সংসারের কাজ করতেন, স্কুল বন্ধ থাকলে তার পাশে শুয়ে আমি বই পড়তাম। আমার চুলের বেণি ধরে খেলতে খুব পছন্দ করতো ও। আমার লম্বা চুলের বেণিটা ওর হাতে ধরিয়ে দিতাম। ও হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে হাসতো। কারণ নাড়াচাড়ায় মুখে চুল লাগতো তাতে খুব মজা পেত।

    জন্মের প্রথম দিন থেকেই ওর ছবি তুলতাম, ক্যামেরা আমাদের হাতে থাকতো। কত যে ছবি তুলেছি। ওর জন্য আলাদা একটা অ্যালবাম করেছিলাম যাতে ওর জন্মের দিন, প্রথম মাস, প্রতি তিন মাস, ছয় মাস অন্তর ছবি অ্যালবামে সাজানো হতো। দুঃখের বিষয় ওই ফটো অ্যালবামটা অন্যসব জিনিসপত্রের সঙ্গে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী লুট করে নেয়। হারিয়ে যায় আমাদের অতি যত্নে তোলা আদরের ছোট্ট ভাইটির অনেক দুর্লভ ছবি।

    বাসার সামনে ছোট্ট একটা লন। সবুজ ঘাসে ভরা। আমার মা খুবেই যত্ন নিতেন বাগানের। বিকেলে আমরা সবাই বাগানে বসতাম। সেখানে একটা পাটি পেতে ছোট্ট রাসেলকে খেলতে দেওয়া হতো। একপাশে একটা ছোট্ট বাঁশ বেঁধে দেওয়া ছিল, সেখানে রাসেল ধরে ধরে হাঁটতে চেষ্টা করতো। তখন কেবল হামাগুড়ি দিতে শুরু করেছে। আমরা হাত ধরে হাঁটাতে চেষ্টা করতাম। কিন্তু কিছুতেই হাঁটতে চাইতো না। ওর স্বাস্থ্য খুব ভালো ছিল। বেশ নাদুস-নুদুস একটা শিশু। আমরা ভাইবোন সব সময় ওকে হাত ধরে হাঁটাতাম।

    একদিন আমার হাত ধরে হাঁটছে। ওর যেন হাঁটার ইচ্ছা খুব বেড়ে গেছে। সারা বাড়ি হাত ধরে ধরে হাঁটছে। হাঁটাতে হাঁটতে পেছনের বারান্দা থেকে সামনের বারান্দা হয়ে বেশ কয়েকবার ঘুরলো। এই হাঁটার মধ্যে আমি মাঝে মাঝে চেষ্টা করছি আঙ্গুল ছেড়ে দিতে, যাতে নিজে হাঁটতে পারে। কিন্তু সে বিরক্ত হচ্ছে, আর বসে পড়ছে, হাঁটবে না আঙ্গুল ছাড়া। তার সাথে হাঁটতে হাঁটতে আমি বরাবরই চেষ্টা করছি যদি নিজে হাঁটে। হঠাৎ সামনের বারান্দায় হাঁটতে হাঁটতে আমার হাত ছেড়ে নিজে হাঁটতে শুরু করলো। হাঁটতে হাঁটতে চলছে। আমি পেছনে পেছনে যাচ্ছি। সেই প্রথম হাঁটা শুরু করল। আমি ভাবলাম কতটুকু হেঁটে আবার আমার হাত ধরবে। কিন্তু যতই হাঁটছি দেখি আমার হাত আর ধরে না, চলছে তো চলছেই, একেবারে মাঝের প্যাসেজ হয়ে পেছনের বারান্দায় চলে গেছে। আমি তো খুশিতে সবাইকে ডাকাডাকি শুরু করেছি যে, রাসেল সোনা হাঁটতে শিখে গেছে। একদিনে এভাবে কোনও বাচ্চাকে আমি হাঁটতে দেখিনি। অল্প অল্প করে হেঁটে হেঁটে তবেই বাচ্চারা শেখে।

    কিন্তু ওর সবকিছু যেন ছিল ব্যতিক্রম। ও যে খুবই মেধাবী তার প্রমাণ অনেকভাবে আমরা পেয়েছি। আমাকে হাসুপা বলে ডাকত। কামাল ও জামালকে ভাই বলত আর রেহানাকে আপু। কামাল ও জামালের নাম কখনও বলতো না। আমরা অনেক চেষ্টা করতাম নাম শেখাতে, মিষ্টি হেসে মাথা নেড়ে বলতো ভাই। দিনের পর দিন আমরা যখন চেষ্টা করে যাচ্ছি- একদিন বলেই ফেলল ‘কামমাল’, ‘জামমাল’। তবে সব সময় ভাই বলেই ডাকত।

    চলাফেরায় বেশ সাবধানি কিন্তু সাহসী ছিল, সহসা কোনও কিছুতে ভয় পেতো না। কালো কালো বড় পিপড়া দেখলে ধরতে যেত। একদিন একটা বড় ওলা (বড় কালো পিঁপড়া) ধরে ফেললো আর সাথে সাথে কামড় খেল। ছোট্ট আঙ্গুল কেটে রক্ত বের হলো। সাথে সাথে ওষুধ দেওয়া হলো। আঙ্গুলটা ফুলে গেছে। তারপর থেকে আর পিঁপড়া ধরতে যেত না। কিন্তু ওই পিঁপড়ার একটা নাম নিজেই দিয়ে দিল। কামড় খাওয়ার পর থেকেই কালো বড় পিপড়া দেখলেই বলতো ‘ভুট্টো’। নিজে থেকেই নামটা দিয়েছিল।

    রাসেলের কথা ও কান্না টেপরেকর্ডারে টেপ করতাম। তখনকার দিনে বেশ বড় টেপরেকর্ডার ছিল। এর কান্না মাঝে মাঝে ওকেই শোনাতাম। সব থেকে মজা হতো ও যদি কোনও কারণে কান্নাকাটি করতো, আমরা টেপ ছেড়ে দিতাম, ও তখন চুপ হয়ে যেত। অবাক হতো মনে হয়। একদিন আমি রাসেলের কান্না টেপ করে বারবার বাজাচ্ছি, মা ছিলেন রান্নাঘরে। ওর কান্না শুনে মা ছুটে এসেছেন। ভেবেছিলেন ও বোধহয় একা, কিন্তু এসে দেখেন আমি টেপ বাজাচ্ছি আর ওকে নিয়ে খেলছি। মার আর কী বলবেন। প্রথমে বকা দিলেন, কারণ মা খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন ও একা আছে মনে করে। তারপর হেসে ফেললেন ওর টেপ করা কান্না শুনে। আমি ওকে দিয়ে কথা বলিযে টেপ করতে চেষ্টা করছিলাম।

    আব্বা যখন ৬-দফা দিলেন তারপরই তিনি গ্রেফতার হয়ে গেলেন। রাসেলের মুখে হাসিও মুছে গেল। সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে রাসেল আব্বাকে খুঁজত। রাসেল যখন কেবল হাঁটতে শিখেছে, আধো আধো কথা বলতে শিখেছে, আব্বা তখনই বন্দি হযে গেলেন। মা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আব্বার মামলা-মকদ্দমা সামলাতে, পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। সংগঠনকে সক্রিয় রেখে আন্দোলন-সংগ্রাম চালাতেও সময় দিতে হতো।

    আমি কলেজে পড়ি, সাথে সাথে রাজনীতিতে সক্রিয় হযে কাজ শুরু করি। কামাল স্কুল শেষ করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়। সেও রাজনীতিতে যোগ দেয়। জামাল ও রেহানা স্কুলে যায়। আব্বা গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই রাসেলের খাওয়া-দাওয়া একরকম বন্ধ হয়ে যায়। কিছু খেতে চাইতো না। ওকে মাঝে মাঝ ছোট ফুফুর বাসায় নিয়ে যেতাম। সেখানে গেলে আমার ছোট ফুফার সাথে বসে কিছু খেতে দিতেন। ছোট ফুফা ডিম পোচের সাথে চিনি দিয়ে রাসেলকে খেতে দিতেন। ঢেঁড়স ভাজির সাথেও চিনি দিয়ে রুটি খেতেন, রাসেলকেও খাওয়াতেন। আমাদের বাসায় আম্বিয়ার মা নামে এক বুয়া ছিল, খুব আদর করতো রাসেলকে। কোলে নিয়ে ঘুরে ঘুরে খাবার খাওয়াতো।

    আমাদের বাসায় কবুতরের ঘর ছিল। বেশ উঁচু করে ঘর করা হয়েছিল। অনেক কবুতর থাকতো সেখানে। মা খুব ভোরে উঠতেন, রাসেলকে কোলে নিয়ে নিচে যেতেন এবং নিজের হাতে কবুতরদের খাবার দিতেন। রাসেল যখন হাঁটতে শেখে তখন নিজেই কবুতরের পেছনে ছুটত, নিজে হাতে করে তাদের খাবার দিত। আমাদের গ্রামের বাড়িতেও কবুতর ছিল। কবুতরের মাংস সবাই খেত। বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন অধিকাংশ জমি পানির নিচে থাকতো তখন তরকারি ও মাছের বেশ অভাব দেখা দিত। তখন প্রায়ই কবুতর খাওয়ার রেওয়াজ ছিল। সকালের নাস্তার জন্য পরোটা ও কবুতরের মাংস ভুনা সবার প্রিয় ছিল। তাছাড়া কারও অসুখ হলে কবুতরের মাংসের ঝোল খাওয়ানো হতো। ছোট ছোট বাচ্ছাদের কবুতরের স্যুপ করে খাওয়ালে রক্ত বেশি হবে, তাই বাচ্চাদের নিয়মিত কবুতরের স্যুপ খাওয়াতো।

    রাসেলকে কবুতর দিলে কোনও দিন খেত না। এত ছোট বাচ্চা কিভাবে যে টের পেত কে জানে। ওকে আমরা অনেকভাবে চেষ্টা করেছি। ওর মুখের কাছে নিলেও খেত না। মুখ ফিরিয়ে নিত। শত চেষ্টা করলেও কোনোদিন কেউ ওকে কবুতরের মাংস খাওয়াতে পারে নি। আব্বার সঙ্গে প্রতি ১৫ দিন পর আমরা দেখা করতে যেতাম। রাসেলকে নিয়ে গেলে আর আসতে চাইতো না। খুবই কান্নাকাটি করতো। ওকে বোঝানো হয়েছিল যে আব্বার বাসা জেলখানা আর আমরা আব্বার বাসায় বেড়াতে এসেছি। আমরা বাসায় ফেরত যাবো। বেশ কষ্ট করেই ওকে বাসায় ফেরত আনা হতো। আর আব্বার মনের অবস্থা কী হতো তা আমরা বুঝতে পারতাম। বাসায় আব্বার জন্য কান্নাকাটি করলে মা ওকে বোঝাতো এবং মাকে আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন। মাকেই আব্বা বলে ডাকতো।

    ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি আব্বাকে আগরতলা মামলায় আসামি করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে বন্দি করে রাখে। ছয় মাস আব্বার সঙ্গে দেখা হয়নি। আমরা জানতেও পারিনি আব্বা কেমন আছেন, কোথায় আছেন।

    রাসেলের শরীর খারাপ হয়ে যায়। খাওয়া-দাওয়া নিয়ে আরও জেদ করতে শুরু করে। ছোট্ট বাচ্চা মনের কষ্টের কথা মুখ ফুটে বলতেও পারে না, আবার সহ্যও করতে পারে না। কী যে কষ্ট ওর বুকের ভেতরে তা আমরা বুঝতে পারতাম।

    কলেজ শেষ করে ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। মা আব্বার মামলা ও পার্টি নিয়ে ব্যস্ত। প্রায়ই বাসার বাইরে যেতে হয়। মামলার সময় কোর্টে যান। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন জোরদার করার জন্য ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ১৯৬৮ সালে ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলন নিয়ে সবাই ব্যস্ত। আন্দোলন সংগ্রাম তখন জোরদার হয়েছে। রাসলকে সময় দিতে পারি না বেশি। আম্বিয়ার মা সব সময় দেখে রাখতো। এমনি খাবার খেতে চাইত না কিন্তু রান্নাঘরে যখন সবাই খেত তখন সবার সঙ্গে বসতো। পাশের ঘরে বসে লাল ফুল আঁকা থালায় করে পিঁড়ি পেতে বসে কাজের লোকদের সঙ্গে ভাত খেতে পছন্দ করতো।

    আমাদের একটা পোষা কুকুর ছিল; ওর নাম টমি। সবার সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব ছিল। ছোট্ট রাসেলও টমিকে নিয়ে খেলতো। একদিন খেলতে খেলতে হঠাৎ টমি ঘেউ ঘেউ করে ডেকে ওঠে, রাসেল ভয় পেয়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে রেহানার কাছে এসে বলে, টমি বকা দিচ্ছে। তার কথা শুনে আমরা তো হেসেই মরি। টমি আবার কিভাবে বকা দিল। কিন্তু রাসেলকে দেখে মনে হলো বিষয়টা নিয়ে সে বেশ বেশ গম্ভীর। টমি তাকে বকা দিয়েছে এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না, কারণ টমিকে সে খুব ভালোবাসতো। হাতে করে খাবার দিত। নিজের পছন্দমতো খাবারগুলো টমিকে ভাগ দেবেই, কাজেই সেই টমি বকা দিলে দুঃখ তো পাবেই।

    ১৯৬৯ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি প্রায় তিন বছর পর আব্বা গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যখন মুক্তি পান তখন রাসেলের বয়স চার বছর পার হয়েছে। কিন্তু ভীষণ রোগা হয়ে গিয়েছিল বলে আরও ছোট্ট দেখাতো। ওর মধ্যে আর একটি জিনিস আমরা লক্ষ্য করলাম। খেলার ফাঁকে ফাঁকে কিছুক্ষণ পরপরই আব্বাকে দেখে আসত। আব্বা নিচে অফিস করতেন। আমরা তখন দোতলায় উঠে গেছি। ও সারাদিন নিচে খেলা করত। আর কিছুক্ষণ পরপর আব্বাকে দেখতে যেত। মনে মনে বোধহয় ভয় পেত যে আব্বাকে বুঝি আবার হারায়।

    ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন অসহযোগ আন্দোলন চলছে, তখন বাসার সামনে দিয়ে মিছিল যেত আর মাঝে মধ্যে পুলিশের গাড়ি চলাচল করত। দোতলায় বারান্দায় রাসেল খেলা করত, যখনই দেখত পুলিশের গাড়ি যাচ্ছে তখনই চিৎকার করে বলত, ‘ও পুলিশ কাল হরতাল’। যদিও ওই ছোট্ট মানুষের কণ্ঠস্বর পুলিশের কানে পৌঁছত না কিন্তু রাসেল হরতালের কথা বলবেই। বারন্দায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ‘হরতাল হরতাল’ বলে চিৎকার করত। স্লোগান দিত ‘জয় বাংলা’। আমরা বাসায় সবাই আন্দোলনের ব্যাপারে আলোচনা করতাম, ও সব শুনত এবং নিজেই আবার তা বলত।

    ১৯৭১ সালের পঁচিশ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হামলা চালালে আব্বা স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ছাব্বিশ মার্চ প্রথম প্রহরের পরপরই আব্বাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। পরদিন আবার আমাদের বাসা আক্রমণ করে। রাসেলকে নিয়ে মা ও জামাল পাশের বাসায় আশ্রয় নেন। কামাল আমাদের বাসার পেছনে জাপানি কনস্যুলেটের বাসায় গিয়ে আশ্রয় নেয়।

    কামাল মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চলে যায়। আমার মা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি হন। আমাদের ধানমণ্ডির ১৮ নম্বর সড়কে (পুরাতন) একটা একতলা বাসায় বন্দি করে রাখে। ছোট্ট রাসেলও বন্দি জীবনযাপন করতে শুরু করে। ঠিকমতো খাবার-দাবার নেই। কোনো খেলনা নেই, বইপত্র নেই, কী কষ্টের দিন যে ওর জন্য শুরু হলো।

    বন্দিখানায় থাকতে আব্বার কোনও খবরই আমরা জানি না। কোথায় আছেন কেমন আছেন কিছুই জানি না। প্রথম দিনে রাসেল আব্বার জন্য খুব কান্নাকাটি করত। তার ওপর আদরের কামাল ভাইকে পাচ্ছে না, সেটাও ওর জন্য কষ্টকর। মনের কষ্ট কীভাবে চেপে রাখবে আর কীভাবেই বা ব্যক্ত করকে। চোখের কোণে সব সময় পানি। যদি জিজ্ঞাসা করতাম, ‘কি হয়েছে রাসেল?’ বলত ‘চোখে ময়লা’। ওই ছোট্ট বয়সে সে চেষ্টা করত মনের কষ্ট লুকাতে। মাঝে মধ্যে রমার কাছে বলত। রমা ছোট থেকেই আমাদের বাসায় থাকতো, ওর সাথে খেলতো। পারিবারিকভাবে ওদের বংশ পরম্পরায় আমাদের বাড়িতে বিভিন্ন কাজ করত। ওকে মাঝে মধ্যে দুঃখের কথা বলত। ওর চোখে পানি দেখলে যদি জিজ্ঞেস করতাম, বলত চোখে কী হয়েছে। অবাক লাগত এটুকু একটা শিশু কীভাবে নিজের কষ্ট লুকাতে শিখল।

    আমরা বন্দিখানায় সব সময় দুঃশ্চিন্তায় থাকতাম, কারণ পাকবাহিনী মাঝে মধ্যেই ঘরে এসে সার্চ করত। আমাদের নানা কথা বলত। জামালকে বলত, তোমাকে ধরে নিয়ে শিক্ষা দেব। রেহানাকে নিয়েও খুব চিন্তা করতো। জয় এরই মধ্যে জন্ম নেয়। জয় হওয়ার পর রাসেল যেন একটু আনন্দ পায়। সারাক্ষণ জয়ের কাছে থাকত। ওর খোঁজ নিতো।

    যখন ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধ শুরু হয় তখন তার জয়কে নিয়েই চিন্তা। এর কারণ হলো, আমাদের বাসার ছাদে বাংকার করে মেশিনগান বসানো ছিল, দিন-রাতই গোলাগুলি করত। প্রচণ্ড আওয়াজ হতো। জয়কে বিছানায় শোয়াতে কষ্ট হতো। এটুকু ছোট্ট বাচ্চা মাত্র চার মাস বয়স, মেশিনগানের গুলিতে কেঁপে কেঁপে উঠত।

    এরপর শুরু হল এয়ার রেইড। আক্রমণের সময় সাইরেন বাজত। রাসেল এ ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিল। যখনই সাইরেন বাজত বা আকাশে মেঘের মতো আওয়াজ হত, রাসেল তুলা নিয়ে এসে জয়ের কানে গুঁজে দিত। সব সময় পকেটে তুলা রাখত।

    সে সময় খাবারের কষ্টও ছিল, ওর পছন্দের কোনো খাবার দেওয়া সম্ভব হতো না। দিনের পর দিন বন্দি থাকা, কোনো খেলার সাথি নেই। পছন্দমতো খাবার পাচ্ছে না একটা ছোট বাচ্চার জন্য কত কষ্ট নিয়ে দিনের পর দিন কাটাতে হয়েছে তা কল্পনাও করা যায় না।

    রাসেল অত্যন্ত মেধাবী ছিল। পাকসেনারা তাদের অস্ত্রশস্ত্র পরিস্কার করত। ও জানালায় দাঁড়িয়ে সব দেখত। অনেক অস্ত্রের নামও শিখেছিল। যখন এয়ার রেইড হতো তখন পাকসেনারা বাংকারে ঢুকে যেত আর আমরা তখন বারান্দায় বের হওয়ার সুযোগ পেতাম। আকাশে যুদ্ধবিমানের ‘ডগ ফাইট’ দেখারও সুযোগ হয়েছিল। প্লেন দেখা গেলেই রাসেল খুশি হয়ে হাতে তালি দিত।

    ষোল ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে সারেন্ডার হয়, পাকিস্তান যুদ্ধে হেরে যায়, বাংলাদেশ মুক্ত হয়। আমরা সেদিন মুক্তি পাইনি। আমরা মুক্তি পাই ১৭ ডিসেম্বর সকালে। যে মুহূর্তে আমরা মুক্ত হলাম এবং বাসার সৈনিকদের ভারতীয় মিত্রবাহিনী বন্দি করল, তারপর থেকে আমাদের বাসায় দলে দলে মানুষ আসতে শুরু করল। এর মধ্যে রাসেল মাথায় একটা হেলমেট পরে নিল, সাথে টিটোও একটা পরল। দুইজন হেলমেট পরে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা শুরু করল।

    আমরা তখন একদিকে মুক্তির আনন্দে উদ্বেলিত আবার আব্বা, কামাল, জামালসহ অগণিত মানুষের জন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। কে বেঁচে আছে কে নেই কিছুই তো জানি না। এক অনিশ্চয়তার ভার বুকে নিয়ে বিজয়ের উল্লাস করছি। চোখে পানি, মুখে হাসি–এই ক্ষণগুলো ছিল অদ্ভুত এক অনুভূতি নিয়ে, কখও হাসছি কখনও কান্নাকাটি করছি। আমাদের কাঁদতে দেখলেই রাসেল মন খারাপ করত। ওর ছোট্ট বুকের ব্যথা আমরা কতটুকু অনুভব করতে পারি? এর মধ্যে কামাল ও জামাল রণাঙ্গন থেকে ফিরে এসেছে। রাসেলের আনন্দ ভাইদের পেয়ে, কিন্তু তখন তার দু’চোখ ব্যথায় ভরা, মুখফুটে বেশি কথা বলত না। কিন্তু ওই দুটো চোখ যে সব সময় আব্বাকে খঁজে বেড়াচ্ছে তা আমি অনুভব করতে পারতাম।

    আমরা যে বাসায় ছিলাম তার সামনে বাড়িভাড়া নেওয়া হলো। কারণ এত মানুষ আসছে যে বসারও জায়গা দেওয়া যাচ্ছে না। এদিকে আমাদের ৩২ নম্বর ধানমণ্ডির বাসা লুটপাট করে বাথরুম, দরজা-জানলা সব ভেঙে রেখে গেছে পাকসেনারা। মেরামত না হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকতে হবে।

    ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি আব্বা ফিরে এলেন বন্দিখানা থেকে মুক্তি পেয়ে। আমার দাদা রাসেলকে নিয়ে এয়ারপোর্ট গেলেন আব্বাকে আনতে। লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল সেদিন, আব্বা প্রথম গেলেন তার প্রিয় মানুষের কাছে। তারপর এলেন বাড়িতে। আমরা সামনের বড় বাড়িটায় উঠলাম। ছোট যে বাসাটায় বন্দি ছিলাম সে বাসাটা দেশ-বিদেশ থেকে সব সময় সাংবাদিক ফটোগ্রাফার আসত আর ছবি নিত। মাত্র দুটো কামরা ছিল। আব্বার থাকার মতো জায়গা ছিল না এবং কোনও ফার্নিচারও ছিল না। যা হোক, সব কিছু তড়িঘড়ি করে জোগাড় করা হলো।

    রাসেলের সব থেকে আনন্দের দিন এলো যেদিন আব্বা ফিরে এলেন। এক মুহূর্তে যেন আব্বাকে কাছছাড়া করতে চাইত না। সব সময় আব্বার পাশে পাশে ঘুরে বেড়াত। ওর জন্য ইতোমধ্যে অনেক খেলনাও আনা হয়েছে। ছোট সাইকেলও এসেছে, কিন্তু কিছুক্ষণ পরপরই ও আব্বার কাছে চলে যেত।

    ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা ৩২ নম্বর সড়কে আমাদের বাসায় ফিরে এলাম। বাসাটা মেরামত করা হয়েছে। রাসেলের মুখে হাসি, সারা দিন খেলা নিয়ে ব্যস্ত। এর মাঝে গণভবনও মেরামত করা হয়েছে। পুরনো গণভবন বর্তমানে সুগন্ধাকে প্রধানমন্ত্রীর কর্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এবার গণভবন ও তার পাশেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কার্যক্রম শুরু করা হলো। গণভবন প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসস্থান আর এর পাশেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে, ভেতর থেকে রাস্তা ছিল, হেঁটেই কার্যালয়ে যাওয়া যেত।

    আব্বা প্রতিদিন সকালে অফিসে আসতেন, দুপুরে গণভবনে বিশ্রাম নিতেন, এখানেই খাবার খেতেন। বিকেলে হাঁটতেন আর এখানেই অফিস করতেন। রাসেল প্রতিদিন বিকেলে গণভবনে আসত। তার সাইকেলটাও সাথে আসত। রাসেলের মাছ ধরার খুব শখ ছিল। কিন্তু মাছ ধরে আবার ছেড়ে দিতো। মাছ ধরবে আর ছাড়বে এটাই তার খেলা ছিল। একবার আমরা সবাই মিলে নাটোরে উত্তরা গণভবনে যাই। সেখানেও সারা দিন মাছ ধরতেই ব্যস্ত থাকতো।

    রাসেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি স্কুলে ভর্তি হয়। তবে স্কুলে যেতে মাঝে মধ্যেই আপত্তি জানাত। তখন আমরা ছোটবেলা থেকে যে শিক্ষকের কাছে পড়েছি তার কাছে পড়বে না। তখন ও স্কুলে ভর্তি হয় নি এটা স্বাধীনতার আগের ঘটনা, তার পছন্দ ছিল ওমর আলীকে। বগুড়ায় বাড়ি। দি পিপল পত্রিকার অ্যাডে কণ্ঠ দিয়েছিল, টেলিভিশনে ইংরেজি খবর পড়ত। মাঝে মধ্যে আমাদের বাসায় আসত, তখন রাসেলের জন্য অনেক ‘কমিক’ বই নিয়ে আসত এবং রাসেলকে পড়ে শোনাত।

    যা হোক স্বাধীনতার পরে একজন ভদ্র মহিলাকে রাসেলের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো। রাসেলকে পড়ানো খুব সহজ কথা ছিল না। শিক্ষককে তার কথাই শুনতে হতো। প্রতিদিন শিক্ষয়িত্রীকে দুটো করে মিষ্টি খেতে হবে। আর এ মিষ্টি না খেলে সে পড়বে না। কাজেই শিক্ষিকাকে খেতেই হতো। তা ছাড়া সব সময় তার লক্ষ্য থাকত শিক্ষিকার যেন কোনও অসুবিধা না হয়। মানুষকে আপ্যায়ন করতে খুই পছন্দ করত।

    টুঙ্গিপাড়া গ্রামের বাড়িতে গেলে তার খেলাধুলার অনেক সাথী ছিল। গ্রামের ছোট ছোট অনেক বাচ্চাদের জড়ো করত। তাদের জন্য ডামি বন্দুক বানিয়ে দিয়েছিল। সে-ই বন্দুক বানিয়ে দিয়েছিল। সেই বন্দুক হাতে তাদের প্যারেড করাত। প্রত্যেকের জন্য খাবার কিনে দিত। রাসেলের খুদে বাহিনীর জন্য জামা-কাপড় ঢাকা থেকেই কিনে দিতে হতো। মা কাপড়-চোপড় কিনে টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যেতেন। রাসেল সেই কাপড় তার খুদে বাহিনীকে দিত। সব সময় মা কাপড়-চোপড় কিনে আলমারিতে রেখে দিতেন। নাসের কাকা রাসেলকে এক টাকা নোটের বাণ্ডিল দিতেন। খুদে বাহিনীকে বিস্কুট লজেন্স কিনে খেতে টাকা দিত। প্যারেড শেষ হলেও তাদের হাতে টাকা দিত। এই খুদে বাহিনীকে নিয়ে বাড়ির উঠোনেই খেলা করতো। রাসলেকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করতো, বড় হয়ে তুমি কি হবে? তাহলে বলতো, আমি আর্মি অফিসার হব। ওর খুব ইচ্ছা ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দেবে। মুক্তিযুদ্ধের চলাকালীন থেকেই ওর ওই ইচ্ছা। কামাল ও জামাল মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর সব গল্প বলার জন্য আবদার করতো। খুব আগ্রহ নিয়ে শুনতো।

    রাসেল আব্বাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করতো। আব্বাকে মোটেই ছাড়তে চাইতো না। যেখানে যেখানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব আব্বা সেখানে তাকে নিয়ে যেতেন। মা ওর জন্য প্রিন্স স্যুট বানিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ আব্বা প্রিন্স স্যুট যেদিন পরতেন রাসেলও পরতো। কাপড়-চোপড়ের ব্যাপারে ছোটবেলা থেকেই তার নিজের পছন্দ ছিল। তবে একবার একটা পছন্দ হলে তা আর ছাড়তে চাইতো না।

    ওর নিজের আলাদা একটা ব্যক্তিত্ব ছিল। নিজের পছন্দের ওপর খুব বিশ্বাস ছিল। খুব স্বাধীন মত নিয়ে চলতে চাইতো। ছোট মানুষটার চরিত্রের দৃঢ়তা দেখে অবাক হতে হতো। বড় হয়ে সে যে বিশেষ কেউ একটা হবে তাতে কোনও সন্দেহ ছিল না। জাপান থেকে আব্বার রাষ্ট্রীয় সফরের দাওয়াত আসে। জাপানিরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দেয়। শরণার্থীদের সাহায্য করে জাপানের শিশুরা তাদের টিফিনের টাকা দেয় আমাদের দেশের শিশুদের জন্য।

    সেই জাপান যখন আমন্ত্রণ জানায় তখন গোটা পরিবারকেই আমন্ত্রণ দেয় বিশেষভাবে রাসেলের কথা উল্লেখ করে। রাসেল ও রেহানা আব্বার সাথে জাপান যায়। রাসেলের জন্য বিশেষ কর্মসূচিও রাখে জাপান সরকার। খুব আনন্দ করেছিল রাসেল সেই সফরে।

    তবে মাকে ছেড়ে কোথাও ওর থাকতে কষ্ট হয়। সারাদিন খুব ব্যস্ত থাকতো কিন্তু রাতে আব্বার কাছেই ঘুমাতো। আর তখন মাকে মনে পড়ত। মার কথা মনে পড়লেই মন খারাপ করতো। আব্বার সঙ্গে দেশেও বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগ দিতো। আব্বা নেভির কর্মসূচিতে যান। সমুদ্রে জাহাজ কমিশন করতে গেলে সেখানে রাসেলকে সাথে নিয়ে যান। খুব আনন্দ করেছিল ছোট্ট রাসেল।

    রাসেলের একবার খুব বড় অ্যাকসিডেন্ট হলো। সে দিনটার কথা এখনও মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে। রাসেলের একটা ছোট মপেট মোটরসাইকেল ছিল আর একটা সাইকেলও ছিল। বাসায় কখনও রাস্তায় সাইকেল নিয়ে চলে যেত। পাশের বাড়ির ছেলেরা ওর সঙ্গে সাইকেল চালাতো। আদিল ও ইমরান দুই ভাই এবং রাসেল একসঙ্গে খেলা করতো। একদিন মপেট চালানোর সময় রাসেল পড়ে যায় আর ওর পা আটকে যায় সাইকেলের পাইপে। বেশ কষ্ট করে পা বের করে। আমি বাসার উপর তলায় জয় ও পুতুলকে নিয়ে ঘরে। হঠাৎ রাসেলের কান্নার আওয়াজ পাই। ছুটে উত্তর- পশ্চিমের খোলা বারান্দায় চলে আসি, চিৎকার করে সবাইকে ডাকি। এর মধ্যে দেখি কে যেন ওকে কোলে নিয়ে আসছে। পায়ের অনেকখানি জায়গা পুড়ে গেছে। বেশ গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হযেছে। ডাক্তার এসে ওষুধ দিল। অনেকদিন পর্যন্ত পায়ের ঘা নিয়ে কষ্ট পেয়েছিল।

    এর মধ্যে আব্বা অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাশিয়া যান চিকিৎসা করাতে। সেখানে রাসেলের পায়ে চিকিৎসা হয়। কিন্তু সারতে অনেক সময় নেয়। আমাদের সবার আদরের ছোট ভাইটি। ওর ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। খুবই সাবধানী ছিল। আর এখন এতো কষ্ট পাচ্ছে। ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে কামাল ও জামালের বিয়ে হয়। হলুদ ও বিয়ের অনুষ্ঠানে আমরা অনেক মজা করি। বাইরে চাকচিক্য বেশি ছিল না কিন্তু ভেতরে আমরা আত্মীয়-স্বজন মিলে অনেক আনন্দ করি। বিশেষ করে হলুদের দিন সবাই খুব রং খেলে। রাসেল ওর সমবয়সীদের সাথে রং খেলে। বিয়ের সময় দুই ভাইয়ের পাশে পাশেই থাকে। দুই ভাইয়ের বিয়ে কাছাকাছি সময়ই হয়। কামালের ১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই, আর জামালের ১৭ জুলাই বিয়ে হয়। রাসেল সব সময় ভাবিদের পাশে ঘুর ঘুর করতো, আর কী লাগবে খুব খেয়াল রাখতো।

    ৩০ জুলাই আমি জার্মানিতে স্বামীর কর্মস্থলে যাই। রাসেলের খুব মন খারাপ ছিল। কারণ সে জয়ের সাথে এক সঙ্গে খেলতো। সব থেকে মজা করতো যখন রাসেল জয়ের কাছ থেকে কোনও খেলনা নিতে চাইতো তখন জয়কে চকলেট দিত। আর চকলেট পেয়ে জয় হাতের খেলনা দিয়ে দিত, বিশেষ করে গাড়ি। রাসেল গাড়ি নিয়ে খেলতো, জয়ের যেই চকলেট শেষ হয়ে যেত তখন বলত চকলেট শেষ, গাড়ি ফেরত দাও। তখন আবার রাসেল বলতো চকলেট ফেরত দাও, গাড়ি ফেরত দেব। এই নিয়ে মাঝে মধ্যে দু`জনের মধ্যে ঝগড়া লেগে যেত, কান্নাকাটি শুরু হতো। মা সবসময় আবার জয়ের পক্ষ নিতেন।

    রাসেল খুব মজা পেত। পুতুলের খেলার জন্য একটা ছোট্ট খেলনা পুতুল ও প্রাম ছিল, ওই প্রাম থেকে খেলার পুতুল সরিয়ে পুতুলকে বসিয়ে ঠেলে নিয়ে বেড়াত। পুতুল এত ছোট ছিল যে, খেলার প্রামে ভালোই বসে থাকতো। রাসেল খুব মজা করে জয়-পুতুলকে নিয়ে খেলত। আমি জার্মানি যাওয়ার সময় রেহানাকে আমার সাথে নিয়ে যাই। রাসেলকে সাথে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু ওর জন্ডিস হয়, শরীর খারাপ হয়ে পড়ে। সে কারণে মা ওকে আর আমাদের সাথে যেতে দেননি। রাসেলেকে সেদিন আমাদের সাথে নিয়ে যেতে পারতাম তা হলে ওকে আর হারাতে হতো না।

    ১৯৭৫ সালের পনের আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেট কেড়ে নিল ছোট্ট রাসেলকে। মা, বাবা, দুই ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী, চাচা সবার লাশের পাশ দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে সবার শেষে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করল রাসেলকে। ওই ছোট্ট বুকটা কি তখন ব্যথায় কষ্টে বেদনায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। যাদের সান্নিধ্যে স্নেহ-আদরে হেসে খেলে বড় হয়েছে তাদের নিথর দেহগুলো পড়ে থাকতে দেখে ওর মনের কী অবস্থা হয়েছিল- কী কষ্টই না ও পেয়েছিল!!

    কেন কেন কেন আমার রাসেলকে এত কষ্ট দিয়ে কেড়ে নিল? আমি কি কোনোদিন এই “কেন”র উত্তর পাব?

    শেখ হাসিনা: প্রধানমন্ত্রী- গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, সভাপতি- বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

    ** বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ওয়েবসাইট থেকে, লিখাটি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এর বার্ষিক প্রকাশনা ‘মাতৃভূমি’-২০১১ তে প্রকাশিত।

  • বাবা বললো পেটে কৃমি, চিকিৎসক জানালেন অন্তঃসত্ত্বা

    জেলার ফতুল্লায় সৎপিতার হাতে ধর্ষিত হয়ে ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে ১২ বছরের এক স্কুলছাত্রী। এ ঘটনায় সৎপিতা সোহাগকে (৪২) আটক করেছে পুলিশ।

    মঙ্গলবার (১৪ আগস্ট) দুপুরে ফতুল্লার মাহমুদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। ধর্ষণের শিকার কিশোরী স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। ধর্ষণের কথা স্বীকার করে অন্তঃসত্ত্বা কিশোরীকে বিয়ে করার কথা পুলিশকে জানিয়েছে সৎপিতা ।

    আটক সোহাগ মুন্সীগঞ্জের বেতকার এলাকার তারা মিয়ার ছেলে। ফতুল্লার মাহমুদপুর এলাকায় ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করে অনাবিল পরিবহনের হেলপার হিসেবে কাজ করে সোহাগ।

    ধর্ষণের শিকার কিশোরীর মা জানান, তার আগের ঘরের সংসারে এক কন্যাশিশু রেখে তার স্বামী চলে যান। পরে কোলের শিশুকে নিয়ে সোহাগকে বিয়ে করেন তিনি।

    সোহাগ অনাবিল পরিবহনের হেলপার হিসেবে কাজ করলেও সংসারে অভাবের কারণে গার্মেন্টসে চাকরি নেন কিশোরীর মা। সকালে ডিউটিতে চলে যাওয়ার সুযোগে তার মেয়েকে ধর্ষণ করে সোহাগ।

    পরে কিশোরীর পেটে ব্যথা উঠলে ওষুধ সেবন করায় সোহাগ। কিন্তু এতে ব্যথা কমেনি। পেট ব্যথার মাত্রা বাড়লে সোমবার নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তার সৎপিতাকে জানায়, মেয়ের পেটে কৃমি হয়েছে। তখন মেয়ের আল্ট্রাসনোগ্রাম করার পরামর্শ দেন চিকিৎসক।

    আল্ট্রাসনোগ্রামের রিপোর্টে প্রকাশ পায় ওই কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা। পরে মেয়েকে জিজ্ঞেস করলে সৎপিতা সোহাগের কথা জানায়।

    ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশের ওসি মঞ্জুর কাদের বলেন, সৎপিতার হাতে ধর্ষণের শিকার হয়ে কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর ঘটনা প্রকাশ পায়। এ ঘটনায় ধর্ষক সৎপিতাকে আটক করা হয়েছে। বিষয়টি স্বীকার করে অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকে বিয়ের করার কথা জানায় সোহাগ। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

    /পি.এস

  • উয়েফার সেরা গোলদাতার তালিকায় তিনি!

    ২০১৮ মৌসুমে হওয়া উয়েফার প্রতিটি প্রতিযোগিতা থেকে একটি করে গোল নিয়ে ১১ জন গোল দাতাকে নিয়ে তালিকা নির্বাচন করা হয়েছে। উয়েফার মৌসুম সেরা সেই সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছেন পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো।

    চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে রোনালদোর বর্তমান ক্লাব জুভেন্টাসের বিপক্ষে করা বাইসাইকেল গোলটি স্থান পেয়েছে সেরাদের তালিকায়।

    গত বছর উয়েফার সেরা গোলদাতা হয়েছিলেন ক্রোয়াট তারকা মারিও মানজুকিচ। এর আগের দুই আসরের সেরা ছিলেন বার্সা অধিনায়ক লিওনেল মেসি। এছাড়া ইউরোপ লিগ থেকে এই তালিকায় জায়গা পেয়েছে দিমিত্রি পায়েতের গোল।

    ফুটবল প্রেমীরা উয়েফার ওয়েবসাইট তালিকায় স্থান পাওয়া সবগুলো গোল দেখতে ও ভোট দিতে পারবে।

    উয়েফার মৌসুম সেরা গোলের সংক্ষিপ্ত তালিকা:

    ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো, (রিয়াল মাদ্রিদ), লুসি ব্রোঞ্জ (লিওঁ নারী দল), ওলগা কারমোনা,(স্পেন নারী অনূর্ধ্ব-১৯ দল), এলিসান্দ্রো (ইন্টার মিলা), এলিওট এম্বলটন (ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-১৯ দল), ক্রিস্টিয়ান এরিকসেন (ডেনমার্ক, পাওলো এস্ত্রেলা), পোর্তো (যুব দল), ইভা নাভারো, (জার্মানি অনূর্ধ্ব-১৯ নারী দল), দিমিত্রি পায়েত, (মার্সেই, গনসালো রামোস), পর্তুগাল অনূর্ধ্ব-১৭ দল, (রিকার্দিনিয়ো, পর্তুগাল ফুটসাল দল)।

  • যেভাবে চিনবেন ইনজেকশন দেয়া গরু

    পবিত্র ঈদুল আজহা আগামী ২২ আগস্ট অনুষ্ঠিত হবে। আর মাত্র ছয়দিন বাকি। ঈদুল আজহা ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় দু’টো ধর্মীয় উৎসবের একটি। বাংলাদেশে এই উৎসবটি কুরবানির ঈদ নামে পরিচিত। ঈদুল আজহা মূলত আরবী শব্দ এর অর্থ হলো ত্যাগের উৎসব। আসলে এটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ত্যাগ করা। এ দিনটিতে মুসলমানেরা তাদের সাধ্যমত ধর্মীয় নিয়মানুযায়ী উট, গরু, দুম্বা কিংবা ছাগল কোরবানি বা জবাই দেয়।

    ঈদুল আজহা মূলত মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানি করা হয়ে থাকে। কিন্তু, কোরবানির ঈদ আসলেই কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা গবাদিপশু কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

    সে সমস্ত অসাধু ব্যবসায়ীর এমন অসৎ চিন্তার কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় সাধারণ মানুষের। অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি দামে পশু বিক্রি করতে হবে এই সব চিন্তা নিয়ে নানা ধরনের পন্থা অবলম্বন করে থাকেন। এ সময় তারা বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, ইনজেকশন ও রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে এসব পশুকে মোটাতাজা করে থাকেন তারা, যা পুরোপুরি স্বাস্থ্যের জন ভয়ানক ক্ষতিকর।

    এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত হচ্ছে, কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজাকরণ গরুর মাংস খেলে মানুষের শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, পানি জমে যাওয়া, মূত্রনালি ও যকৃতের বিভিন্ন রকম সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ কারণে এসব পশু ক্রয় করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।

    তবে মোটাতাজাকরণ গবাদিপশু চেনার কিছু উপায় রয়েছে।

    চলুন জেনে নেয়া যাক, ইনজেকশন দেয়া কোরবানির পশু চিনবেন যেভাবে-

    খুব শান্ত
    স্টেরয়েড ট্যাবলেট খাওয়ানো বা ইনজেকশন দেয়া গরু হবে খুব শান্ত। ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারবে না। পশুর ঊরুতে অনেক মাংস মনে হবে।

    খাবার
    গরুর মুখের সামনে খাবার ধরলে যদি নিজ থেকে জিব দিয়ে খাবার টেনে নিয়ে খেতে থাকে তবে বোঝা যাবে গরুটি সুস্থ। যদি অসুস্থ হয়, তবে সে খাবার খেতে চায় না।

    আঙুলের চাপ
    কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজাকরণ গরুর গায়ে আঙুল দিয়ে চাপ দিলে ওই স্থানের মাংস স্বাভাবিক হতে অনেক সময় লাগে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবে মোটা গবাদিপশুর ক্ষেত্রে দ্রুতই মাংস স্বাভাবিক হয়।

    লালা বা ফেনা
    যেসব গরুর মুখে কম লালা বা ফেনা থাকে সেই গরু কেনার চেষ্টা করুন। এগুলো কৃত্রিম উপায়ে মোটা করা পশু নয়।

    শরীরে পানি জমে
    অতিরিক্ত হরমোনের কারণে পুরো শরীরে পানি জমে মোটা দেখাবে। আঙুল দিয়ে গরুর শরীরে চাপ দিলে সেখানে দেবে গিয়ে গর্ত হয়ে থাকবে।

    দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ
    কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজাকরণ গরু দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করে। একটু হাঁটলেই হাঁপায়। খুবই ক্লান্ত দেখায়। ইনজেকশন দেয়া গরুর রানের মাংস নরম হয়। স্বাভাবিকভাবে যেসব গরু মোটা হয় সেগুলোর রানের মাংস শক্ত হয়।

    নাকের ওপরটা ভেজা
    সুস্থ গরুর নাকের ওপরটা ভেজা ভেজা থাকে। সুস্থ গরুর পিঠের কুঁজ মোটা ও টান টান হয়।

    পা ও মুখ ফোলা
    বিশেষ করে গরুর পা ও মুখ ফোলা, শরীর থলথল করবে, অধিকাংশ সময় গরু ঝিমাবে, সহজে নড়াচড়া করবে না। এসব গরু অসুস্থতার কারণে সব সময় নিরব থাকে। ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারে না। খাবারও খেতে চায় না।

    এছাড়াও চকচক করা গরু বা ছাগলকে দেয়া হয় ইনজেকশন। অন্যদিকে, উশকোখুশকো, চামড়ার ওপর দিয়ে হাড় বেরিয়ে পড়া পশু কিনতে চেষ্টা করুন। এগুলো কোনো রকম কৃত্রিম উপায় ছাড়াই বাজারে সরবরাহ করা হয়।

  • ঢেলে সাজানো হচ্ছে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগ

    সদ্য অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দল সমর্থিত মেয়রপ্রার্থীর পরাজয়ের পর নড়েচড়ে বসেছে আওয়ামী লীগ। পরাজয়ের নেপথ্যে সাংগঠনিক দুর্বলতাকেই বড় করে দেখছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেটের আসনগুলোয় দলীয় প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করতে সিলেটের সাংগঠনিক কাঠামো ঢেলে সাজাতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ।
    এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দ্রæতই ঢেলে সাজানো হবে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগ। দলের দায়িত্বশীল নেতারা তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন।

    দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও দলীয় মেয়রপ্রার্র্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের পরাজয়ে ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্বাচনের দুদিন পর গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে আসেন কামরান। ওই দিনই প্রধানমন্ত্রী কামরানকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগ ঢেলে সাজানো হবে। কামরান বর্তমানে একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতির পদে রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী জানান, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কামরানকে কেন্দ্রেই রাখা হবে, মহানগরের দায়িত্ব দেওয়া হবে নতুন কাউকে। ওই দিন সন্ধ্যায় গণভবনে উপস্থিত আওয়ামী লীগের দুজন কেন্দ্রীয় নেতা আমাদের সময়কে বলেন, প্রধানমন্ত্রী সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি মোটামুটি সাজিয়ে ফেলেছেন। শোকের মাস, এ কারণে আগস্টে কমিটি ঘোষণা করা হবে না। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মহানগর আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে।
    দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা আমাদের সময়কে জানান, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দীন আহমদ। সাধারণ সম্পাদক পদে কিছুটা জটিলতা রয়েছে। এ পদে একাধিক নাম রয়েছে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গুডবুকে। বর্তমান কমিটির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক আজাদুর রহমান আজাদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম নাদেলÑ এ দুজনের মধ্য থেকে যে কোনো একজন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ পেতে পারেন।
    এ বিষয়ে সিলেট বিভাগে বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ আমাদের সময়কে বলেন, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগকে ঢেলে সাজানো হবে। বর্তমান সভাপতি বদরউদ্দিন আহমদ কামরান যেহেতু কেন্দ্রীয় কমিটিতে আছেন, তাই মহানগরে অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
    সিলেট আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, সিটি নির্বাচনে পরাজিত মেয়রপ্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের অনুসারীরা মনে করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের গোপন সমর্থনের কারণেই বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। কারণ হিসেবে আওয়ামী লীগের ওই নেতারা বলছেন, সিলেটের রাজনীতিতে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আরিফুল হকের ঘনিষ্ঠরা ‘ওপেন সিক্রেট’। এমনকি ভোটের দিনও ভোট দেওয়া শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, কামরান ও আরিফুল দুজনই ভালো প্রার্থী। দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং সরকারের অর্থমন্ত্রী মুহিতের মুখে এমন কথায় ভোটের মাঠে প্রভাব পড়েছে বলে মনে করেন সিলেটের নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া ওই একই বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী একজন সংখ্যালঘু নারী কাউন্সিলরকে ‘গুÐি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, ওই গুÐিটা যেন জিততে না পারে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন সিলেটের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। ক্ষমতাসীন দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার মুখে এমন কথায় হতাশ হিন্দু সম্প্রদায় ও মণিপুরি স¤প্রদায়ের মানুষরা।
    অপরদিকে সিটি নির্বাচনের এ ‘ভ‚মিকায়’ সংসদ নির্বাচনে সিলেট থেকে অর্থমন্ত্রী অথবা তার পরিবারের কেউ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হলে দলের অনেকেই তার বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারেন বলেও আভাস পাওয়া গেছে। তথ্যসূত্র : আমাদের সময়।

  • স্মৃতির পাতায় জাতির জনক ও আজকের বাংলাদেশ

    পনেরোই আগস্টের কালরাত্রিতে শাহাদতবরণকারী সবার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। জাতির জনককে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে ঘাতক খুনিচক্র স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল দেশের অগ্রগতিকে। ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সব অর্জনকে। এদিন শুধু জাতির জনককেই হত্যা করা হয়নি, মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ও লক্ষ্যকে ভিত্তি করে অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া একটি জাতির আশা-আকাক্সক্ষা ও স্বপ্নপূরণের নেতৃত্বকে হত্যা করা হয়েছিল। ঘাতকদের লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর রক্তের কোনো উত্তরাধিকার যেন বেঁচে না থাকে। আর সেজন্যই ঘাতকের দল বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র দশ বছরের শিশু রাসেলকেও রেহাই দেয়নি। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে, পরম করুণাময়ের অশেষ কৃপায় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বিদেশ থাকায় সেদিন ঘাতকের হাত থেকে প্রাণে রক্ষা পান। আজ গর্ব করে বলতে পারি, ষড়যন্ত্রকারী খুনিচক্রের সেই আশা সফল হয়নি। বঙ্গবন্ধুর সারাজীবনের স্বপ্ন ছিল প্রিয় মাতৃভ‚মি স্বাধীন হবে এবং স্বাধীন বাংলাদেশ হবে সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা সোনার বাংলা। আমি বিশ্বাস করি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নপূরণ করে বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করতে তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ এগিয়ে চলেছে দৃপ্ত পদক্ষেপে।

    বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে কত কথা, কত স্মৃতি আজ মনের চারপাশে ভিড় করে আসে। মনে পড়ে ১৯৭১-এর রক্তঝরা মার্চের ১৭ তারিখের কথা। সেদিন ছিল বঙ্গবন্ধুর ৫২তম জন্মদিন। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা শেষে দুপুরে ধানমÐির বাসভবনে বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘরোয়া আলোচনাকালে একজন সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনার ৫২তম জন্মদিনে আপনার সবচেয়ে বড় ও পবিত্র কামনা কী?’ উত্তরে বঞ্চিত বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা স্বভাবসিদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘জনগণের সার্বিক মুক্তি।’ এর পর সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপনকালে তিনি ব্যথাভারাতুর কণ্ঠে বেদনার্ত স্বরে বলেছিলেন, ‘আমি জন্মদিন পালন করি নাÑ আমার জন্মদিনে মোমের বাতি জ্বালি না, কেকও কাটি না। এ দেশে মানুষের নিরাপত্তা নেই। আপনারা আমাদের জনগণের অবস্থা জানেন। অন্যের খেয়ালে যে কোনো মুহূর্তে তাদের মৃত্যু হতে পারে। আমি জনগণেরই একজন, আমার জন্মদিনই কী আর মৃত্যুদিনই কী? আমার জনগণের জন্য আমার জীবন ও মৃত্যু।’ বিশাল হৃদয়ের মহৎ মনের অধিকারী ছিলেন তিনি।

    স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে বাংলাদেশ বিশ্বের ১১৬টি দেশের স্বীকৃতি লাভ করে। বিশ্বসভায় বঙ্গবন্ধু শ্রদ্ধার আসনে সমাসীন হন। সে সময় বাংলাদেশ যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে তন্মধ্যে অন্যতমÑ ‘কমনওয়েলথ অব নেশনস্’, ‘জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন’, ‘ইসলামিক সম্মেলন সংস্থা’ ও ‘জাতিসংঘ’। এই ৪টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সম্মেলন ও অধিবেশনগুলোতে বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। প্রতিটি সম্মেলন ও অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু ছিলেন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

    বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয় ’৭৫-এর ১৪ আগস্ট। প্রতিদিনের মতো সকালবেলা ধানমÐির ৩২ নম্বরে যাই। সেখান থেকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গণভবনে গিয়েছিলাম। দিনের কাজ শেষে দুপুরবেলা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একই টেবিলে বসে একসঙ্গে খেয়েছি। বাসা থেকে বঙ্গবন্ধুর খাবার যেত। পরম শ্রদ্ধেয়া বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবÑ যিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গী। সুখে-দুঃখে, আপদে-বিপদে যিনি বঙ্গবন্ধুকে যতœ করে রাখতেন। নিজ হাতে রান্না করে বঙ্গবন্ধুকে খাওয়াতেন। খাবার শেষে বঙ্গবন্ধু বিশ্রাম নিলেন। এর পর গণভবনে নিজ কক্ষে বসলেন। বঙ্গবন্ধু প্রায় প্রতিদিন বিকালে মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের সঙ্গে দৈনন্দিন রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করতেন। একসঙ্গে চা পান করতেন। এর পর রাত ৮টায় স্বীয় বাসভবনে ফিরতেন। বঙ্গবন্ধুকে পৌঁছে দিয়ে আমি বাসায় ফিরতাম। যেতামও একসঙ্গে, ফিরতামও একসঙ্গে। গণভবনে যেখানে বঙ্গবন্ধুর অফিস, সেখানে তিনি দুপুর ২টা পর্যন্ত অফিস করতেন। গণভবনের পাশে এখন যেখানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সেটি ছিল বঙ্গবন্ধুর অফিস। বঙ্গবন্ধুর অফিস কক্ষের পাশেই আমার দপ্তর। সেদিন বঙ্গবন্ধুর যুগ্মসচিব জনাব মনোয়ারুল ইসলাম এবং ব্যক্তিগত সচিব জনাব ফরাসউদ্দীন এই দু’জন পিএইচডি করতে বিদেশ যাবেন এ উপলক্ষে কর্মকর্তাদের নৈশভোজ। নৈশভোজ শেষে তাদের বিদায় করে আমি আবার ৩২ নম্বরে এলাম। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু তখন খাবার টেবিলে। আমাকে কাছে ডেকে বললেন, ‘কাল সকালে আমার বাসায় আসবি। আমার সঙ্গে তোর প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাবি।’ আমার আর প্রিয় নেতার সঙ্গে প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাওয়া হয়নি।

    পরদিন ১৫ আগস্ট দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের এদেশীয় এজেন্ট সেনাবাহিনীর কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল সদস্য জাতির জনককে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে। দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে পরিবারের সদস্যসহ এরূপ ভয়াবহভাবে হত্যার ঘটনা দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল। ভোর থেকেই দিনটি ছিল বিভীষিকাময়। হত্যাকাÐের পর পরই আমাকে প্রথমে গ্রেপ্তার করে গৃহবন্দি করা হয়। ধানমÐির যে বাসায় আমি থাকতামÑ সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত সেই বাসাটি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। বাসায় কাউকে ঢুকতে বা বেরোতে দেওয়া হয়নি। দুদিন পর ১৭ তারিখ খুনিচক্রের অন্যতম ক্যাপ্টেন মাজেদের নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনীর একদল উচ্ছৃঙ্খল সদস্য আমার বাসভবন তছনছ করে। ঘরের দেয়ালে সংরক্ষিত বঙ্গবন্ধুর ছবিগুলো ভেঙে ফেলে। মায়ের সামনেই হাত-চোখ বেঁধে আমায় রেডিও স্টেশনে নিয়ে যায়। সেখানে খুনিচক্রের সমর্থনে সম্মতি আদায়ে উপর্যুপরি নির্যাতন চালায়। তখনো জেনারেল শফিউল্লাহ সেনাপ্রধান এবং কর্নেল শাফায়াত জামিল ব্রিগেড কমান্ডার। তাদের হস্তক্ষেপে আমাকে মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এর পর ২৩ তারিখ ই এ চৌধুরীর নেতৃত্বে একদল পুলিশ আমাকে এবং জনাব জিল্লুর রহমানকে (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি) বঙ্গভবনে নিয়ে যায়। বঙ্গভবনে খুনি মোশতাক তার অবৈধ সরকারকে সমর্থন করার জন্য আমাদের দুজনকে প্রস্তাব দেয়। আমরা খুনি মোশতাকের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করি। সেপ্টেম্বরের ৬ তারিখ জিল্লুর রহমান, আমাকে ও আবদুর রাজ্জাককে (শ্রদ্ধেয় নেতা প্রয়াত আবদুর রাজ্জাক) একইদিনে গ্রেপ্তার করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কোণে অবস্থিত পুলিশ কন্ট্রোলরুমে ৬ দিন বন্দি রেখে অমানুষিক নির্যাতন চালায়। আমাদের সঙ্গে আর একজন বন্দি ছিলেন। তিনি ‘দি পিপল’ পত্রিকার সম্পাদক প্রখ্যাত সাংবাদিক প্রয়াত জনাব আবিদুর রহমান। পুলিশ কন্ট্রোল রুমের একটি ছোট্ট ঘরের মধ্যে পাশাপাশি দুটি চৌকির একটিতে ঘুমাতাম আমি ও রাজ্জাক ভাই এবং অপরটিতে জিল্লুর ভাই ও আবিদুর রহমান। একদিন রমজান মাসের তিন তারিখ রোজা রেখে নামাজ পরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। শেষ রাতের দিকে সেনাবাহিনীর একদল লোক কক্ষে প্রবেশ করে উচ্চস্বরে চিৎকার করে বলতে থাকে ‘হু ইজ তোফায়েল’ ‘হু ইজ তোফায়েল!’ রাজ্জাক ভাই জেগে উঠে আমাকে ডেকে তোলেন। চোখ মেলে দেখি আমার বুকের ওপর স্টেনগান তাক করা। আমি অজু করতে চাইলে অনুমতি দেওয়া হয়। কক্ষের সঙ্গেই সংযুক্ত বাথরুম। অজু করে আসার সঙ্গে সঙ্গেই জিল্লুর ভাই, রাজ্জাক ভাই এবং আবিদুর রহমানের সামনেই আমার চোখ বেঁধে বারান্দায় নিয়ে হাত বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। আমি অনুভব করি আমাকে রেডিও স্টেশনে আনা হয়েছে। এর পর হাত-চোখ বাঁধা অবস্থায়ই চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরলে অনেকগুলো প্রশ্ন করা হয়। বঙ্গবন্ধু কী করেছেন, তার কোথায় কী আছে এ রকম বহু প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের উত্তর না দেওয়ায় ভীতি প্রদর্শন করে খুনিরা বলে, ‘ইতোমধ্যে আমার এপিএস শফিকুল আলম মিন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সে আমার বিরুদ্ধে ৬০ পৃষ্ঠার এক বিবৃতি দিয়েছে। সেই বিবৃতিতে আমার বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ রয়েছে।’ আমি নিরুত্তর থাকি। শুধু একটি কথাই বলেছিলাম, ‘বঙ্গবন্ধু যা ভালো করেছেন আমি তার সঙ্গে ছিলাম, যদি কোনো ভুল করে থাকেন তার সঙ্গেও ছিলাম।

    এর বেশি কিছুই আমি বলতে পারব না।’ তখন তারা চরম অসন্তুষ্ট হয়ে পুনরায় আমার ওপর নির্মম নির্যাতন শুরু করে। ভয়াবহ সেই নির্যাতনের ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি। এর পর অর্ধমৃত অবস্থায় পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিয়ে আসা হয়। সেখানে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদকারীদের মধ্যে খুনি ডালিমের কণ্ঠস্বর স্পষ্ট চিনতে পেরেছিলাম। আমাকে রুমের মধ্যে একা রেখে তারা মিটিং করছিল আমাকে নিয়ে কী করবে। অজ্ঞাত একজন আমার মাথায় হাত রেখে শুধু বলছিলেন, ‘আল্লাহ্ আল্লাহ্ করেন, আল্লাহ্ আল্লাহ্ করেন।’ তার ধারণা হয়েছিল ঘাতকের দল আমাকে মেরে ফেলবে। শেষ পর্যন্ত ঘাতকরা এসে বলল, ‘আমরা যে প্রশ্নগুলো করেছি তার উত্তর দিতে হবে; উত্তর না দিলে আপনাকে আমরা রাখব না।’ নিরুত্তর থাকায় পুনরায় তারা আমাকে নির্যাতন করতে থাকে এবং একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তখন ঘাতক দল পুলিশ কন্ট্রোল রুমের যে কক্ষে আমরা অবস্থান করছিলাম সেই কক্ষে রাজ্জাক ভাই ও জিল্লুর ভাইয়ের কাছে আমাকে অজ্ঞানাবস্থায় রেখে আসে। জ্ঞান ফিরলে যন্ত্রণায় চিৎকার করতে থাকি। শারীরিক অসহ্য ব্যথা নিয়ে যখন আর্তনাদ করছি তখন জিল্লুর ভাই ও রাজ্জাক ভাই আমার এ অবস্থা দেখে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন এবং তারা দুজনেই সেবা-শুশ্রƒষা করেন। এর পর সিটি এসপি সালাম সাহেব ডাক্তার নিয়ে আসেন। এ অবস্থার মধ্যেই রাতে মেজর শাহরিয়ার আমার কাছ থেকে লিখিত বিবৃতি নিতে আসে। তিনি আমাকে বলেন, ‘যে প্রশ্নগুলো করা হয়েছে তার লিখিত উত্তর দিতে হবে।’ আমি মেজর শাহরিয়ারকে বললাম, ‘আপনারা আমাকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন দিতে পারেন; আমি কোনো কিছু লিখতেও পারব না, বলতেও পারব না।’ ওরা যখন দেখল আমার কাছ থেকে কোনো বিবৃতি আদায় করা সম্ভবপর নয়; তখন তারা উপায়ান্তর না দেখে চলে যায়। পরদিন অর্থাৎ ১২ সেপ্টেম্বর আমাকে ও আবিদুর রহমানকে ময়মনসিংহ কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ফাঁসির আসামিকে অন্ধকার নির্জন প্রকোষ্ঠে যেভাবে রাখা হয় ময়মনসিংহ কারাগারে আমাকেও সেভাবে বন্দি করে কনডেম সেলে রাখা হয়। তিন মাস আমি সূর্যের আলো দেখিনি। আমার সঙ্গে তখন কারাগারে বন্দি ছিলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি জনাব আবদুল হামিদ, ধর্মমন্ত্রী মতিউর রহমানসহ অনেকে। সে দিনগুলোর কথা যখন স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে তখন চিন্তা করি কী করে সেসব দিন অতিক্রম করেছি। এর পর ২০ মাস ময়মনসিংহ কারাগারে অবস্থানের পর ’৭৭-এর ২৬ এপ্রিল আমাকে কুষ্টিয়া কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।

    কুষ্টিয়া কারাগারে আটকাবস্থায় ’৭৭-এর ২৭ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনৈক সেকশন অফিসার কর্তৃক ব্যাকডেটে স্বাক্ষরিত অর্থাৎ ’৭৫-এর ১০ সেপ্টেম্বর তারিখে জারি করা আটকাদেশের সত্যায়িত কপি আমার কাছে প্রেরণ করা হয়। আটকাদেশের সত্যায়িত কপি প্রাপ্তির পর আমার স্ত্রী আনোয়ারা আহমেদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আটকাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আমার পক্ষের আইনজীবীরা (যারা আমার স্ত্রীর কাছ থেকে মাত্র ১ টাকা ফি নিয়েছিলেন) সর্বজনাব সিরাজুল হক, এএইচ খোন্দকার, সোহরাব হোসেন, সালাহউদ্দীন আহমেদ এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত- আদালতে বলেন, ‘তার আটক সম্পূর্ণ অন্যায় এবং ১৯৭৫ সালের জরুরি ক্ষমতা আইনের আওতায় তার আটকাদেশের যৌক্তিকতা প্রতিপন্ন করার মতো কোনো তথ্য-প্রমাণ সরকারের হাতে নেই। ফলে ওই আটকাদেশ অবৈধ ও আইনের এখতিয়ারবহির্ভূত।’ বিচারপতি জনাব কেএম সোবহান এবং বিচারপতি জনাব আবদুল মুমিত চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের একটি ডিভিশন বেঞ্চ ’৭৮-এর ৯ জানুয়ারি এক রুল জারি করেন। রুলে বলা হয়, ‘কারাগারে আটক জনাব তোফায়েল আহমেদকে কেন আদালতের সামনে হাজির করা হবে না এবং কেন তাকে মুক্তি দেওয়া হবে না’ সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ও অন্যদের কারণ দর্শাতে বলা হচ্ছে। রাজ্জাক ভাই এবং আমার একসঙ্গে রিট হয়। রাজ্জাক ভাই হাইকোর্ট থেকে মুক্তি পেলেও আমি মুক্তি পাইনি। অবশেষে সুপ্রিমকোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের রায়ে মুক্তি পেলাম ৪ মাস পর অর্থাৎ ’৭৮-এর ১২ এপ্রিল। কুষ্টিয়া কারাগারে ১৩ মাসসহ সর্বমোট ৩৩ মাস বন্দি থাকার পর মুক্তি লাভ করি। কুষ্টিয়া কারাগারে যখন বন্দি তখন আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয় এবং কারাগারে আটকাবস্থায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হই।

    স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের আমলে আমাদের ওপর অনেক নির্যাতন হয়েছে। আমাদের মিছিল-মিটিংয়ে আক্রমণ হয়েছে। সেসব উপেক্ষা করে প্রাণান্ত পরিশ্রম করে দলকে সংগঠিত করেছি, নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছি। সামরিক শাসনের মধ্যেও মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে আমরা সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়েছি। ’৭৫-এর পর চরম দুঃসময়। তখন তো একটা করুণ অবস্থা। দেশজুড়ে কারফিউ, হত্যা, গুম, গ্রেপ্তার আর ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা। অবর্ণনীয় করুণ অবস্থায় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস আমাদের কেটেছে। নিজের বাড়িতে থাকতে পারিনি। আমি যখন কারাগারে, আমার স্ত্রীকে কেউ বাড়ি ভাড়া দেয়নি। তোফায়েল আহমেদের স্ত্রীকে বাড়ি ভাড়া দিলে আর্মি ধরে নিয়ে যাবে। আমার ভাগ্নি-জামাই নজরুলের নামে বাড়ি ভাড়া নিয়ে পরিচয় গোপন করে মাসিক দেড় হাজার টাকা ভাড়ায় সেই বাড়িতে আমার স্ত্রী থেকেছেন। তিনি এক বছর ছিলেন কলাবাগানে। সেই বাসায় কোনো ফ্যান ছিল না। পরে বরিশালের সাবেক এডিসি জনাব এমএ রবের কল্যাণে তার আজিমপুরের বাসার দোতলায় আমার পরিবারের ঠাঁই হয়। কারামুক্ত হয়ে ফিরে সেই বাসায় থেকেছি। আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ। সেই সময় করুণ অবস্থা গেছে আমার পরিবারের। আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দেওয়ার বহু রকম চেষ্টা হয়েছে। কোনো দুর্নীতি আবিষ্কার করতে পারেনি। কোনো মামলা দিতে পারেনি। কেরানীগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা বোরহানউদ্দীন গগনকে দলের সাংগঠনিক কাজ করার জন্য আমি সাধারণ একটা গাড়ি দিয়েছিলাম। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি সেই গাড়ি ফেরত দিয়েছিলেন। অথচ সেই গাড়ির জন্য আমার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। আমার এপিএস ছিল শফিকুল ইসলাম মিন্টু। আমি তাকে চাকরি দিয়েছিলাম ’৭৩ সালে। ১৫ আগস্টের পর আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য খুনিচক্রের ক্যাপ্টেন মাজেদের নেতৃত্বে কতিপয় সেনাসদস্য তাকে ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় মিন্টুকে হত্যা করে বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেয়। তার মৃতদেহটি পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আমার মেজো ভাইকে ’৭৫-এর ৫ অক্টোবর গুলি করে হত্যা করা হয়। গ্রামের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে তাকে হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা। আমার বড় ভাই ’৭৫-এর ১১ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। এক ছেলে কারাগারে, দুই ছেলে নেই। আমার মায়ের তখন ভয়াবহ করুণ অবস্থা! আমি যে বাড়িতে ছিলাম সেটা পরিত্যক্ত বাড়ি। গভর্নমেন্টের বাড়ি।

    এই বাড়ি প্রথমে বরাদ্দ দিয়েছিল ‘তোফায়েল আহমেদ, পলিটিক্যাল সেক্রেটারি টু প্রাইম মিনিস্টার’ অর্থাৎ আমার নামে। তখন আমার বয়স বত্রিশ। এই অল্প বয়সে আমি চিন্তা করি আমার নামে বরাদ্দপত্র দেবে কেন? তাহলে তো এটা মনে করার অবকাশ থাকবে যে এটা আমার বাড়ি। তখন আমার নাম বাদ দিয়ে বরাদ্দপত্র সংশোধন করে ‘অ্যালোটেড টু পলিটিক্যাল সেক্রেটারি টু দি প্রাইম মিনিস্টার’ লেখার নির্দেশ দিই। পরবর্তীকালে এই বাড়ির জন্যই জিয়াউর রহমান আমার নামে এই মর্মে মামলা দিয়েছিল, এই বাড়ি আমি দখল করেছি। যখন আদালত বিশদে কাগজপত্র বিশ্লেষণ করল তখন প্রমাণিত হলো, বাড়িটি ‘পলিটিক্যাল সেক্রেটারি টু দি প্রাইম মিনিস্টার’-এর নামে অ্যালোটেড। ফলে মামলা বাতিল হলো। এভাবে একের পর এক মামলা দিয়ে আমাকে হেনস্তা করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর পলিটিক্যাল সেক্রেটারি হিসেবে বাড়ি ভাড়া পেতাম। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর পাশের বাড়ি এখন যেখানে বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিকের পিতা মালেক সাহেব থাকেন তার বাসায় আমি ভাড়া থাকি। সেই বাড়ির ভাড়া ছিল ছয়শ টাকা। এই বাড়ির মালিক মালেক সাহেবকে আর্মির লোকরা এসে চাপ দিয়েছে আমার বিরুদ্ধে এই স্বীকারোক্তি নিতে যে, ‘আপনি বলেন তোফায়েল আহমেদ জোর করে আপনার বাড়িতে ছিলেন।’ তখন মালেক সাহেব উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তিনি জোর করে থাকেননি। ভাড়া নিয়ে থেকেছেন এবং যেদিন আমি নিজে থাকব বলে বাড়িটি ফেরত চেয়েছি সেদিনই উনি চলে গিয়েছেন।’ সামরিক সরকার এ রকম ক্ষিপ্ত ছিল আমার ওপর।
    দুঃসহ অবস্থার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে আমরা সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধি করে সব ভেদাভেদ ভুলে কেবল দলকেই ধ্যান-জ্ঞান করে, দলীয় ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ’৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতে আওয়ামী লীগের সংগ্রামী পতাকা তুলে দিয়েছি। তিনি আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হয়ে দলের সংগ্রামী পতাকা গৌরবের সঙ্গে সমুন্নত রেখেছেন। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হওয়ার পর আমরা তাকে নিয়ে যাত্রা শুরু করে যেখানেই গিয়েছি, সেখানেই সর্বস্তরের গণমানুষের সমর্থন পেয়েছি। ব্যাপক গণসমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে কাজ করেছে সংবিধান ও সত্যের কাছে আমাদের অঙ্গীকার ও দৃঢ় মনোবল। ’৯৬-এ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব লাভ করে স্বাধীনতার চেতনা ও মূল্যবোধ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। প্রথমেই তিনি সংবিধান থেকে কুখ্যাত ‘ইমডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’ বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাÐের বিচারের পথ সুগম করেন। ’৭৫-এর মর্মন্তুদ ঘটনার পর সামরিক শাসকরা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের শুধু ক্ষমাই করেনি, বিদেশের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনর্বাসিত করেছে। রাজনৈতিক দল গঠন করে নির্বাচন করার সুযোগ করে দিয়ে বাঙালি জাতিকে কলঙ্কিত করেছে। ২০০১-এ খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে একই কাজ করেছে। ২০০৯-এর নির্বাচনে ভ‚মিধস বিজয়ের মধ্য দিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব লাভ করেন এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের কাজ সমাপ্ত করে খুনিদের ফাঁসির রায় কার্যকর করেন। খুনিচক্রের যারা এখনো পালিয়ে বেড়াচ্ছে আমরা তাদের দেশে এনে দÐাদেশ কার্যকর করার চেষ্টা করে চলেছি।

    আজ ভাবতে কত ভালো লাগে, বঙ্গবন্ধুর অনুসৃত নীতি অনুযায়ী দেশ এগিয়ে যাচ্ছে তারই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। দেশে আজ অনেক মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হওয়ার পথে। যার মধ্যে রয়েছে ১০ বিলিয়ন ডলারের পায়রা সমুদ্রবন্দর, প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্প। পদ্মা সেতু ছাড়াও রয়েছে দেশজুড়ে স্পেশাল ইকোনমিক জোন, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ, ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প, মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ইত্যাদি। অতীতে ৭ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত বাংলাদেশে মানুষের খাদ্যাভাব ছিল, এখন ১৬ কোটি মানুষের দেশে আমরা খাদ্যে উদ্বৃত্ত এবং খাদ্য রপ্তানিকারক দেশ। এক সময় দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল না বললেই চলে, এখন ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। রেমিট্যান্স ১৫ বিলিয়ন ডলার। এক্সপোর্ট ছিল মাত্র ৩০০ মিলিয়ন ডলার আজ তা ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। শুরুতে বাজেট ছিল মাত্র ৭৮৭ কোটি টাকা, এখন ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বিশ্ব বাংলাদেশ সম্পর্কে বলছে ‘বিস্ময়কর উত্থান বাংলাদেশের।’ মাল্টিন্যাশনাল ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস্ ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, ‘পরবর্তীকালে যে ১১টি দেশ অর্থনৈতিকভাবে দ্রæতগতিতে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ তার অন্যতম।’ আরেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান জেপি মরগ্যান, ‘বাংলাদেশ উদীয়মান দ্রæতগতির অর্থনীতি’ বলে অভিহিত করেছে। ইতোমধ্যে আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছি এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার ৫০তম বর্ষপূর্তিতে আমরা বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করতে সক্ষম হবো। বঙ্গবন্ধুর যেমন দুটি লক্ষ্য ছিলÑ এক. দেশ স্বাধীন করা এবং দুই. অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করা। বঙ্গবন্ধু গর্ব করে বলতেন, ‘আমার বাংলা রূপসী বাংলা, আমার বাংলা সোনার বাংলা।’ একইভাবে ২০০৮-এর নির্বাচনের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুকন্যাও বাংলাদেশের মানুষের জন্য দুটি লক্ষ্য স্থির করেছেনÑ এক. ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং দুই. বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত করা।

    ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব। ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে মোবাইল ও তথ্যপ্রযুক্তির সেবায় দেশের মানুষ ইতোমধ্যে তার সুফল ভোগ করতে শুরু করেছে। ’৭১-এ দেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল ৩৯ বছর; একই কালপর্বে ভারতের মানুষের গড় আয়ু ছিল ৫০ বছর; আর ২০১৪-এর হিসাব মতে বর্তমানে ভারতের মানুষের গড় আয়ু ৬৬ বছর, পাকিস্তানের ৬৫ বছর আর বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু এখন ৭২ বছর। ’৭১-এ ৫ বছরের নিচে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে বাংলাদেশে ছিল ২২৫ জন; ভারতে ১৬৬ জন। এখন বাংলাদেশে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৪৬ জনে, ভারতে তা ৬৫ জন আর পাকিস্তানে ৭২ জন। আর্থ-সামাজিক সব ক্ষেত্রেই আমরা এগিয়ে চলেছি। নোবেল লরিয়েট অমর্ত্য সেনের ভাষায়, ‘সামাজিক-অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে এগিয়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারত থেকে এগিয়ে।’ খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুর ভাষায়, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি চমৎকার। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বিশ্বে একটি মডেল।’ মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় বিস্মিত জাতিসংঘ বলছে, ‘অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশের উচিত বাংলাদেশকে অনুসরণ করা।’ বিগত বছরগুলোতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয় যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, এই হার অব্যাহত থাকলে সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আমরা ২০২১-এর আগেই মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবো। তাই সামাজিক জীবনের সব ক্ষেত্রেই আজ আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে এগিয়ে চলেছি। শিক্ষার হার বেড়েছে, দারিদ্র্যের হার কমেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্বে আমরা যখন যাই তখন আমাদের যারা একদিন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে বলেছিল, ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’, আজ তারাই বলে, ‘বিস্ময়কর উত্থান বাংলাদেশের।’ বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন, আজ তার কন্যার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেই গণতান্ত্রিক পথেই এগিয়ে যাচ্ছে এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তব রূপলাভ করতে চলেছে। আমি গ্রামের ছেলে। গ্রামে যখন যাই তখন মুগ্ধ হই। কারণ গ্রাম এখন শহরের মতো। গ্রামে এখন বৈদ্যুতিক আলো। পিচঢালা পথ। ঘরে ঘরে টেলিভিশন। মানুষের মুখে হাসি। পায়ে জুতা, গায়ে সুন্দর জামা। সুন্দরভাবে বাংলাদেশের মানুষ চলছে। দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে দেশে জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করতে চাচ্ছে তারা, যারা মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত ও আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে হত্যাকারী অগণতান্ত্রিক শক্তি। কিন্তু আমি দৃঢতার সঙ্গে বলতে পারি, কোনো ষড়যন্ত্রই আজকের বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না।

    বঙ্গবন্ধু তার জীবনের প্রতিটি ধাপেই বাঙালির সার্বিক মুক্তির জয়গান গেয়েছেন। তিনি সব সময় বলতেন, এমনকি দু-দুবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বলেছেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’ যে বাংলার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, যে বাংলার জন্য তিনি যৌবনের অধিকাংশ সময় কারাগারে কাটিয়েছেন, ফাঁসির মঞ্চে গেয়েছেন বাঙালির জয়গান, সেই বাংলা ও বাঙালির জন্য তার হৃদয়ের ভালোবাসা অপরিসীম। সমুদ্র বা মহাসমুদ্রের গভীরতা পরিমাপ করা সম্ভব; কিন্তু বাংলা ও বাঙালির জন্য বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ের যে দরদ, যে ভালোবাসা তার গভীরতা অপরিমেয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অগ্রযাত্রা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘গণতন্ত্রকামী জনগণের মনে রাখা দরকার, গণতন্ত্রেও একটা নীতিমালা আছে। গণতন্ত্রের দিশারি যারা তাদের গণতন্ত্রের নীতিকে মানতে হয়। খালি গণতন্ত্র ভোগ করবেন আর নীতিমালা মানবেন না, ওটা হবে না, হতে পারে না।’ তাই আজকের দিনে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অগ্রসর করে নেওয়ার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর এই উক্তি দল-মত নির্বিশেষে আমাদের সবার জন্য অনুসরণীয়। মানুষের জন্য অপার ভালোবাসা আর তাদের কল্যাণে কাজ করাই বঙ্গবন্ধুর মূল ভাবাদর্শ। নিজ চিন্তা ও আদর্শ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।’ মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর এই দরদ আর অকৃত্রিম ভালোবাসার নিরন্তর প্রতিফলন আমরা দেখি তার কন্যা শেখ হাসিনার নীতি-আদর্শ ও কর্মে। শোককে শক্তিতে পরিণত করে জনকল্যাণে নিবেদিত থেকে সংবিধান সমুন্নত রেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সফলভাবে দেশ পরিচালনা করছেন। তার সুযোগ্য নেতৃত্বে পরিচালিত হয়ে বাংলাদেশ একদিন উন্নত দেশে রূপান্তরিত হবে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বপূর্ণ চেতনা ধারণ করে সমগ্র বিশ্বে পুনরায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে এ আমার দৃঢ়বিশ্বাস।

    য় তোফায়েল আহমেদ : আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য, বাণিজ্যমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

  • ঈদ যাত্রা, দুর্ভোগই সঙ্গী!

    আসছে ঈদ। বাড়ি ফিরবে কোটি মানুষ। ঈদুল ফিতরে মহাসড়কে আগের তুলনায় দুর্ভোগ কম হলেও শেষ দিনে ছিল দীর্ঘ যানজট। ফিরতি যাত্রায় ছিল পথে পথে দুর্ভোগ। ঈদুল আজহায় মহাসড়কে থাকবে কোরবানির পশুবাহী গাড়ির ঢল। এবার তাই দুর্ভোগের ভয় আরও বেশি। সরকারি হিসাবে, গত ঈদযাত্রায় সড়কে নিহতের সংখ্যা ১৪৯; তবে বেসরকারি হিসাবে সংখ্যাটি ৪০৫। সব মিলিয়ে দুর্ভোগ ও দুর্ঘটনা যেন সঙ্গী হয়ে উঠেছে ঈদযাত্রায়।

    তবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আশাবাদী, এবারের ঈদযাত্রা হবে স্বস্তিদায়ক। ঢাকা-আরিচা ও নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক পরিদর্শনে গিয়ে তিনি জানান, গত ঈদের মতো এবারও রাস্তা সচল থাকবে। যাত্রীরা স্বস্তিতে যাত্রা করতে পারবেন। ভারি বর্ষণের কারণে পশুবাহী গাড়িগুলোর গতি কিছুটা কম হলেও যান চলাচল অব্যাহত থাকবে।

    ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, জয়দেবপুর-চন্দ্রা-এলেঙ্গা মহাসড়ক, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, ঢাকা-মাওয়া-খুলনা মহাসড়ক ও ঢাকা-মাওয়া-বরিশাল মহাসড়ক- এই ছয়টি রাস্তা দেশের ৬৩ জেলাকে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সড়কপথে যুক্ত করেছে। এগুলোর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত হয়েছে। যদিও দুর্ভোগ পিছু ছাড়েনি।

    ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তিনটি সেতু এখনও দুই লেনের। সরু সেতুর কারণে কয়েক বছর ধরেই দীর্ঘ যানজট হচ্ছে। দুর্ভোগ এড়াতে এবারও আগেভাগে বৈঠক করে প্রস্তুতি নিয়েছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। যদিও দুর্ভোগ পিছু ছাড়বে- তেমন সম্ভাবনা কম। এ মহাসড়কে দুর্ভোগের আরেক কারণ, নারায়ণগঞ্জের শিল্পঘন এলাকায় রাস্তার পাশে কলকারখানার গাড়ি পার্কিং। একই অবস্থা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তা অংশে। দুই মহাসড়কে অবৈধ পার্কিং ঠেকাতে গত মাসে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী অংশীজনদের নিয়ে বৈঠক করেছেন। প্রতিনিধিরা সরেজমিনে ঘুরে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি আগের মতোই রয়েছে।

    বাকি মহাসড়কগুলো দুই লেনের। সেখানে রয়েছে পুরনো দুর্ভোগ। বিভাজকবিহীন এসব মহাসড়কে গত ঈদে শতাধিক মানুষের প্রাণ গেছে। জয়দেবপুর-চন্দ্রা-এলেঙ্গা ও ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। উন্নয়নকাজের কারণে এই পথের যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। জয়দেবপুর-চন্দ্রা-এলেঙ্গা মহাসড়কে গত ঈদে যমুনা নদীর দুই পাড়েই দীর্ঘ যানজট হয়েছে। এবারও একই ভয় রয়েছে।

    সড়কের মতো দুর্ভোগের ভয় রয়েছে ঘাটগুলোতেও। আরিচা ঘাটে ফেরি পারাপার এখনও স্বাভাবিক থাকলেও মাওয়া ঘাটে নাব্য সংকটে ফেরি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। চলতি সপ্তাহের শুরু থেকেই এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। গাড়ির দীর্ঘ সারি লেগেই আছে ঘাটে। ঈদে যানবাহনের সংখ্যা বাড়লে দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

    সরকারি হিসাবে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাতটি, ঢাকা-উত্তরবঙ্গ মহাসড়কের চারটি, ঢাকা-ময়মনসিংহের তিনটি স্থান যানজটপ্রবণ। ভাঙাচোরা সড়ক, নির্মাণকাজ ও অব্যবস্থাপনায় এসব স্থানে যানজট হচ্ছে। সমস্যা সমাধানে গত মে মাসে সড়ক পরিবহন বিভাগ বিস্তারিত পরিকল্পনা করে। ঈদুল ফিতরের আগে এসব কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি এখনও। এবারও তাই দুর্ভোগের শঙ্কা রয়ে গেছে।

    দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক সরেজমিনে ঘুরে  প্রতিনিধিরাও জানিয়েছেন, রাস্তার অনেক জায়গা ভাঙাচোরা। আগের বছরগুলোর মতো এবারও ঈদযাত্রায় দুর্ভোগের কারণ হবে মহাসড়ক। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের পর ভাঙাচোরা ‘মেরামতে’ ইট-বালু ফেলছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। কিন্তু তা ঈদ পর্যন্ত টিকবে কি-না, সংশয় রয়েছে।

    বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেছেন, প্রতিবছরই ঈদের আগে সড়কের ভাঙাচোরা মেরামত করা হয়। দুই মাস আগেও করা হয়েছে। সঠিকভাবে করা হলে আবার মেরামত করার প্রয়োজন পড়ত না। ঈদের আগে মেরামতের পুরো প্রক্রিয়াই ত্রুটিপূর্ণ। ইট-বালু ফেলে খানাখন্দ ভরাট করা হয়। এক বৃষ্টিতেই তা ধুয়ে যায়।

    সওজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের (এইচডিএম) সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, সারাদেশের প্রায় পৌনে চার হাজার কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কের ৮০০ কিলোমিটার ভাঙাচোরা। ২৩৯ কিলোমিটারের অবস্থা খুবই খারাপ। আঞ্চলিক মহাসড়কের ৯২০ কিলোমিটার কমবেশি ভাঙাচোরা। ২৯৪ কিলোমিটার চলাচলের অযোগ্য। জেলা সড়কের অবস্থা আরও খারাপ। প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার জেলা সড়ক খানাখন্দে ভরা ও ভাঙাচোরা।

    তবে সওজ বলছে, জরিপ প্রকাশের পর গত চার মাসে অনেক জায়গায় ভাঙা মেরামত করা হয়েছে। সংস্থাটির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণ) আফতাব হোসাইন খান জানিয়েছেন, মহাসড়কের অবস্থা অতীতের তুলনায় ভালো। সড়কে নিয়ম মেনে চললে যানজটের দুর্ভোগ হবে না।

    প্রতি ঈদেই ঘোষণা দেওয়া হয়, ঈদযাত্রায় মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলতে দেওয়া হবে না। ঈদের আগে তিন দিন করে সাত দিন মহাসড়কে পণ্যবাহী যান চলবে না। কিন্তু বাস্তবে সিদ্ধান্তের প্রতিফলন দেখা যায় না। গত ঈদেও ট্রাকের চাপায় গাইবান্ধায় হতাহত হয়েছে মানুষ। সড়কে ফিটনেসবিহীন গাড়ি বিকল হওয়ায় দীর্ঘ যানজট হয়েছে চন্দ্রা-এলেঙ্গা মহাসড়কে।

    শিক্ষার্থীদের আলোচিত নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে ফিটনেসবিহীন গাড়ি ধরতে আগের চেয়ে কঠোর হয়েছে সরকার। সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান বলেছেন, ‘এবার কোনো ফিটনেসবিহীন গাড়ি মহাসড়কে চলতে দেওয়া হবে না।’

    ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট নিরসনে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ডে মহাসড়কের পাশের খালি জায়গা ভরাট করে বাস বে নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কথা ছিল, ঈদুল ফিতরের আগেই শেষ হবে এর কাজ। সিদ্ধান্ত হয়েছিল শিমরাইলে সার্ভিস লেন ও বাস বে নির্মাণের। যানজটপ্রবণ কাঁচপুরে রাস্তা চওড়া করার কথা ছিল। কিন্তু এখনও এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি। বাস্তবায়নের দায়িত্ব সওজের নারায়ণগঞ্জ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী আলিউল হোসাইনের। তবে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

    ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলার সড়ক যোগাযোগের একমাত্র পথ জয়দেবপুর-চন্দ্রা-এলেঙ্গা মহসড়ক। এটিকে চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে, যা গত মার্চে শেষ হওয়ার কথা হ্নিছল। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২০ সালের জুনে। পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, এ মহাসড়কের ঢাকা ইপিজেএড, বিকেএসপি, কালিয়াকৈর সেতু ও এলেঙ্গা বাজার যানজটপ্রবণ।

    ঢাকা-রংপুর রুটের আগমনী পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বললেন, চন্দ্র-জয়দেবপুর-এলেঙ্গা মহাসড়কের উন্নয়নকাজের কারণে রাস্তা ভাঙাচোরা, বাস ধীরে চলে। যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর সিরাজগঞ্জের রাস্তাও ভাঙাচোরা। ঢাকা থেকে রংপুর ৩৩৫ কিলোমিটার পথ যেতে স্বাভাবিক সময়েই ১০ ঘণ্টা লাগে। ঈদযাত্রায় সড়কে গাড়িসংখ্যা যখন কয়েক গুণ বেড়ে যায়, সময় তখন আরও বেশি লাগে।

    প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ভোগড়া বাইপাস থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার পথের কিছু কিছু অংশ চার লেনে উন্নীত হয়েছে। বাকিটা ভাঙাচোরা। কোনাবাড়ী এলাকায় ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ চলছে। নিচের পথ চলাচলের অযোগ্য।

    দুর্ভোগের ভয় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কেও। কারণ, বৃষ্টিতে খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। এ মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের ভুলতায় চলছে ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ। ভুলতা মোড় পার হতেই লেগে যায় দু-তিন ঘণ্টা।

    ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তা আগে থেকেই বেহাল। এ অংশে বাসের জন্য পৃথক লেন (বিআরটি) নির্মাণকাজ চলছে। দুই পাশে ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে। গত ১৮ জুলাই সড়ক পরিবহনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এক সভায় এখানে যানজটের জন্য সড়কের দু’পাশের ময়লার স্তূপ ও যত্রতত্র পার্কিংকে দায়ী করা হয়। প্রায় এক মাস পার হতে চললেও ময়লার স্তূপ এবং পার্কিং দূর হয়নি।

    যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী  বলেন, ঈদ এলেই ভাঙাচোরা মেরামত করা হয়। বহু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন না থাকায় দুর্ভোগ কমে না।

  • বঙ্গবন্ধুই আমাকে শিখিয়েছেন জনগণের কাছে যাওয়ার মাহাত্ম্য

    প্রান্তে নয়, কেন্দ্রেই রাজনৈতিক জীবন শুরু করতে চেয়েছিলাম আমি। ১৯৬৯ সালের কথা। তখনও কিশোরগঞ্জে ছাত্রলীগ করি। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ঢাকায় চলে এলাম। বিএ পাস করার পর এক ইয়ার লস দিয়ে আইন পড়ব বলে ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বঙ্গবন্ধুকে আমার পরিকল্পনা জানাব বলে গেলাম ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে। আমাদের সবার প্রিয় মুজিব ভাই আমার ঢাকায় আসতে চাওয়ায় প্রবল আপত্তি জানালেন। সেই দিনটির কথা আমি আগেও লিখেছি, বলেছিও বহুবার, সভা-সমাবেশ এবং অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায়। এর আগে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দু’বার দেখা হয়েছে আমার। সেটি ছিল তৃতীয়বারের মতো প্রিয় নেতার মুখোমুখি হওয়া। বঙ্গবন্ধু বয়োকনিষ্ঠদের সাধারণত তুই করে বলতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়ে বললেন, ‘না, তোর ঢাকায় আসা চলবে না। তুই সেন্ট্রাল ল’ কলেজে ভর্তি হয়ে কিশোরগঞ্জ চলে যা। সেখানে গিয়ে সংগঠন আর আন্দোলনে মন দে।’ আমার মন খারাপ হলো। তখন ঢাকায় এসে রাজনীতি করার জন্য ব্যাকুল আমার মন। সেন্ট্রাল ল’ কলেজে ভর্তি না হওয়ার জন্য একটু চালাকি করে বলি, ‘বাড়ি থেকে যে টাকা নিয়ে এসেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতেই তা শেষ হয়ে গেছে, অন্য কোথাও ভর্তি হওয়ার মতো টাকা নেই।’ বঙ্গবন্ধু সঙ্গে সঙ্গে নিজের পকেট থেকে ৩০০ টাকা বের করে আমার হাতে দিলেন। সেই সময় ৩০০ টাকা, অনেক টাকা।

    বঙ্গবন্ধু যখন আমাকে সেন্ট্রাল ল’ কলেজে ভর্তি হয়ে কিশোরগঞ্জে ফিরে যেতে বলছিলেন, তখনই সেখানে এসে ঢুকেছেন তোফায়েল আহমেদ। বঙ্গবন্ধু তাকে বললেন, “হামিদকে সেন্ট্রাল ল’ কলেজে ভর্তি করার ব্যবস্থাটা করে দাও এবং বইপত্র কিনে দিয়ে কিশোরগঞ্জ পাঠানোর ব্যবস্থা করো।” অগত্যা কী আর করা, কিশোরগঞ্জে ফিরে আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করার কাজেই মনোনিবেশ করলাম।

    তখন তো বুঝতে পারিনি, আমাকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অনেক বড় পরিকল্পনা রয়েছে। এখন বুঝতে পারি, তৃণমূলে ফেরার রহস্য। বঙ্গবন্ধু এভাবেই আমাকে শিখিয়েছিলেন জনগণের কাছে যাওয়ার মাহাত্ম্য। আমার নির্বাচনী এলাকা তো বটেই, পুরো কিশোরগঞ্জে গ্রাম-গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছি আমি। কিশোরগঞ্জের এমন কোনো পাড়া-মহল্লা নেই, যেখানকার মানুষজনকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। সত্তরের নির্বাচনের সময় আমার নির্বাচনী এলাকা ছিল ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলী ও তাড়াইল নিয়ে। পরে অবশ্য নিকলী ও তাড়াইল আলাদা হয়ে গেছে। আজকাল হাওরাঞ্চলের ওইসব গ্রাম থেকে যখন তরুণরা আমার কাছে আসে, আমি তাদের পুরনো মানুষের কথা জিজ্ঞেস করি। আলাপে-আলাপে জানা হয়ে যায়, আমার চেনা মানুষটি হয়তো ওই তরুণটির বাবা-চাচা, অথবা নিকটাত্মীয় কেউ। তরুণ-তরুণীদের কেউ কেউ জানায়, আমার চেনা মানুষটি তার দাদা, ওই মানুষটি এখন আর বেঁচে নেই। মানুষকে নামধামসহ মনে রাখতে পারাটাও আমি বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে শিখেছি। তবে বঙ্গবন্ধুর মতো স্মৃতিধর হতে পারিনি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রথম দেখা ১৯৬৪ সালে। প্রথম ও দ্বিতীয় দেখার মধ্যে ব্যবধান ছিল বছর তিনেকের এবং দ্বিতীয়বার যখন দেখা হয়, তখন নিমিষেই আমাকে চিনতে পেরেছিলেন তিনি।

    প্রথম দেখা হওয়ার গল্পটাই প্রথমে বলি। সময়টা ছিল ১৯৬৪ সাল। তখন কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজের ছাত্র আমি। তখনও কিশোরগঞ্জ ছিল মহকুমা এবং আমি মহকুমা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। মুজিব ভাই ওই সময় কিশোরগঞ্জ আসেন আওয়ামী লীগের সমাবেশে। নেতার সঙ্গে দেখা করা এবং কথা বলার আগ্রহে আমরা দু-তিনশ’ ছাত্রলীগ কর্মী নিয়ে সমাবেশস্থলে গিয়েছিলাম। আওয়ামী লীগ নেতারা আমাদের ভেতরে ঢুকতে দিলেন না। আমরাও নাছোড়, বাইরে অপেক্ষা করতে থাকলাম, নেতা বের হলে প্রয়োজনে রাস্তার মধ্যেই তার সঙ্গে দেখা করব, কথা বলব। শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা সফল হয়েছে, আমরা প্রিয় নেতার সঙ্গে দেখা করতে পেরেছিলাম সেদিন। তিনি আমাদের উৎসাহব্যঞ্জক কথাবার্তায় উদ্দীপ্ত করেছিলেন।

    প্রথমবার দেখা হয়েছিল ভিড়ের মধ্যে। অনেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর মধ্যে তিনি আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। আমি ছিলাম মুখপাত্র। আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে সন্ধ্যার আগে আগে তিনি যখন সমাবেশ থেকে বেরিয়ে আসছিলেন, তখন আমরা তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য স্লোগান ধরলাম, ‘মুজিব ভাই যেখানে, আমরা আছি সেখানে’। বঙ্গবন্ধু আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন, আমরাও সমস্বরে অভিযোগ জানালাম, ‘আমরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এসেছিলাম আপনার বক্তৃতা শুনতে; কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতারা আমাদের হলের ভেতরে ঢুকতে দেননি।’

    এইটুকু সময়ের দেখায় বঙ্গবন্ধু আমাকে মনে রাখতে পেরেছিলেন। দ্বিতীয়বার যখন দেখা হলো, দেখামাত্রই আমাকে চিনতে পারলেন তিনি এবং নাম ধরে ডেকে জড়িয়ে ধরলেন। অথচ সময়টা ছিল প্রতিকূল। তিনি ছিলেন বন্দি এবং রাতের বেলা আমরা ট্রেন থামিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সম্ভবত ১৯৬৭ সালের প্রথম দিকের কথা এটি, সিলেটে গিয়ে গ্রেফতার হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। খবর পেলাম, পুলিশ তাঁকে বাহাদুরাবাদ মেইল ট্রেনে করে সিলেট থেকে ময়মনসিংহে নিয়ে যাবে। ততদিনে বঙ্গবন্ধু বাংলার অন্য সব নেতাকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছেন। এর আগের বছর ৭ জুন জীবনবাজি রেখে ছয় দফা ঘোষণা করে শাসকদের কাছে যেমন নিন্দিত হয়েছিলেন, তেমনি আপামর মানুষের কাছে হয়ে উঠেছিলেন বাংলার অধিকার আদায়ের প্রতিভূতে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ছয় দফা দাবির পক্ষে দেশব্যাপী তীব্র গণআন্দোলনের সূচনা হয়েছিল এবং তিনিও দাবির পক্ষে জনমত গঠনের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো সিলেট গিয়েছিলেন।

    ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরে পাকিস্তানের পরিস্থিতি ছিল সংকটাপন্ন। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে আহূত বিরোধীদলীয় সভায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল যোগ দেয়। পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র নিয়ে সেখানে বিভিন্ন দলের নেতারা আলোচনা করেন। আওয়ামী লীগ শুরু থেকেই ফেডারেল পদ্ধতির সংসদীয় সরকার এবং আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়ে এসেছে। ১০ ফেব্রুয়ারি সাবজেক্ট কমিটির বৈঠকে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা দাবিনামা উপস্থাপন করেন। ওই দাবিনামা তখনও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো সভায় গৃহীত সুপারিশ ছিল না। ওই দাবি উত্থাপনের পর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা তো বটেই, তাদের পূর্ব বাংলার তাঁবেদাররা তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন। তারা মুহূর্ত দেরি না করে বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে চিহ্নিত করা শুরু করেন।

    দলের সাধারণ সম্পাদক হলেও বঙ্গবন্ধু ছয় দফা উপস্থাপন করেছিলেন তার ব্যক্তিগত সুপারিশ হিসেবে। কয়েক সপ্তাহ পরই আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি দলের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ছয় দফাকে অনুমোদন করিয়ে নেন। ছয় দফার মূল বক্তব্য ছিল- প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র ছাড়া সব ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে থাকবে। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ছয় দফা দাবির মুখে পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খান বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, ছয় দফা নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে অস্ত্রের ভাষায় উত্তর দেওয়া হবে। ছয় দফা ঘোষণার পর কারান্তরীণ করা হয় বঙ্গবন্ধুকে। পাকিস্তানের ২৩ বছরের শাসনকালে বঙ্গবন্ধু ১৮ বার জেলে গেছেন এবং মোট সাড়ে ১১ বছর জেলে কাটিয়েছেন, মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন দু’বার। শুনেছি ছয় দফা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘সাঁকো দিলাম, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য।’

    আমরা দারুণ উদ্বুদ্ধ ছিলাম তখন। সিলেট থেকে বঙ্গবন্ধুকে ময়মনসিংহে নিয়ে যাওয়া হবে কিশোরগঞ্জের ওপর দিয়ে- এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আমরা চার-পাঁচ হাজার ছাত্র জড়ো হয়ে কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশন অবরুদ্ধ করে ফেললাম। সন্ধ্যা থেকেই আমরা স্টেশনে জড়ো হচ্ছিলাম। রাত ১২টায় যখন ট্রেনটি এলো, তখন স্টেশনে তিলধারণের জায়গা নেই। আমরা তো মুজিব ভাইকে না দেখে, তার বক্তৃতা না শুনে ট্রেন যেতে দেব না। তাকে রাখা হয়েছিল ফার্স্ট ক্লাসের একটি কামরায়। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে আমরা কয়েকজন সেখানে গেলাম। ‘হামিদ’ বলেই তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। বুঝলাম, একবারের দেখাতেই নেতা আমার নামটি মনে রেখেছেন। আমরা একটি হ্যান্ড মাইকেরও ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম। সেই মাইক হাতে ট্রেনের বগির দরজায় দাঁড়িয়ে সমবেত ছাত্র-জনতার উদ্দেশে তিনি ১০-১২ মিনিট বক্তৃতা করলেন। সবশেষে আমার পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘আন্দোলন চালিয়ে যা, জয় আমাদের হবেই।’

    সত্তরের নির্বাচনে জয় আমাদের হয়েছে। ওই নির্বাচনের সময় মুজিব ভাই গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়ার সময় আমাকে নিয়ে যে পরিকল্পনা করেছিলেন, সেটি বুঝতে পারলাম। সত্তরের জানুয়ারি মাসে কিশোরগঞ্জে একটা জনসভা করেছিলাম আমরা। ততদিনে আমি ছাত্রলীগের সভাপতি পদ থেকে বিদায় নিয়েছি। লোকজনকে বলি আওয়ামী লীগ করি, কিন্তু কোনো কমিটিতে আমার জায়গা হয়নি। সভাপতির পদে না থাকলেও ছাত্রসংগঠন পুরোটাই আমি নিয়ন্ত্রণ করি। ওই জনসভার আগে কিশোরগঞ্জ মহকুমা আওয়ামী লীগ একটা মিটিং ডাকল। জনসভার জন্য অভ্যর্থনা কমিটি করা হলো। আওয়ামী লীগের সভাপতি মরহুম আবদুস সাত্তার অ্যাডভোকেটকে কমিটির চেয়ারম্যান করা হলো। আমাকে করা হলো সদস্য সচিব। জনসভায় বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে সেই প্রথম বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ হলো আমার। বঙ্গবন্ধুর মতো বাগ্মীর সামনে বক্তৃতা দেওয়া একটা দুঃসাহসের কাজ। বঙ্গবন্ধু শুনলেন এবং পছন্দও করলেন। বোধ হয় সাধারণ মানুষের সঙ্গে, সাধারণের ভাষায় যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টাকেই পছন্দ করেছিলেন তিনি। তাই সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দিয়েছিলেন।

    সত্তরে আমিই ছিলাম আওয়ামী লীগের সর্বকনিষ্ঠ প্রার্থী। বঙ্গবন্ধু অবশ্য প্রথমে আমাকে এমপিএ (মেম্বার অব প্রভিন্সিয়াল অ্যাসেমব্লি) নির্বাচন করতে বলেছিলেন। আমি ভাবলাম, ইলেকশন যদি করিই তাহলে এমপিএ কেন, এমএনএ (মেম্বার অব ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লি) ইলেকশনই করব। বঙ্গবন্ধুকে আমার এ ইচ্ছার কথা জানাতেই তিনি বললেন, মেসবাহ উদ্দিন নামে অবসরপ্রাপ্ত এক জজকে আমার নির্বাচনী এলাকা (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম-নিকলী-তাড়াইল) থেকে এমএনএ নির্বাচনের জন্য মনোনীত করে রেখেছেন। মেসবাহ উদ্দিন সাহেবের আকস্মিক মৃত্যুর কারণে পরে আমাকে সত্তরের নির্বাচনে প্রার্থী করা হয় এবং বয়স বিবেচনায় তৎকালীন পাকিস্তানে আমি ছিলাম সর্বকনিষ্ঠ এমএনএ প্রার্থী।

    কিশোরগঞ্জে সত্তরের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জনসভার পর এপ্রিল মাসে ঢাকায় এসেছিলাম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। এবার আমাকে দেখেই তিনি অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। সেই হাসি যেন থামেই না। ভাবলাম, আমার কাপড়-চোপড়ে কোনো সমস্যা হয়েছে কি-না। তিনি যত হাসতে থাকলেন, আমার অস্বস্তিও তত বাড়তে থাকল। হাসতে হাসতেই বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘তুর জজ মারা গেছে। আমি কি আর তোর কথা না রাইখা পারি। তুই তো আমার দাদা।’ বঙ্গবন্ধুর দাদার নাম যে শেখ আবদুল হামিদ সেটা তখনও আমার জানাই ছিল না।

    জজ সাহেব নেই, তাই বঙ্গবন্ধু যে আমাকেই মনোনয়ন দেবেন, এই খবর আব্বাকে জানালে তিনি খুবই অবাক ও যুগপৎ খুশি হয়েছিলেন। আমার আব্বা হাজী মো. তায়েবউদ্দিন সর্বদাই চাইতেন তার ছেলেরা সমাজের নেতৃত্ব দিক। আমার বড় ভাই মো. আবদুল গণি ছিলেন আমাদের ইউনিয়নের বিডি সিস্টেমে নির্বাচিত চেয়ারম্যান। আব্বার পক্ষপাত ছিল আমার প্রতি। তিনি বুঝতে পারছিলেন, তার ছেলে হামিদ, মিঠামইনের গণ্ডি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বড় ভাইয়ের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধেও তিনি সূক্ষ্ণভাবে আমার পক্ষই নিতেন। ১৯৬৪ সালে বুনিয়াদি গণতন্ত্রের আদলে মৌলিক গণতন্ত্রের মাধ্যমে মেম্বার-চেয়ারম্যানদের ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের মাধ্যমে আইয়ুব খান বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন এবং ফাতেমা জিন্নাহ পরাজিত হন। সেই সময় আইয়ুব খানের নির্বাচনী প্রতীক ছিল গোলাপ ফুল এবং ফাতেমা জিন্নাহর হারিকেন। আমার বড় ভাই গোলাপ ফুলের নির্বাচন করছেন, আমি হারিকেন। একই দিনে দুই ভাই ভোটারদের নিমন্ত্রণ করলাম। এখন ভাই তো আমাকে ছাড় দেবেন না। এ নিয়ে দুই ভাইয়ের লড়াইয়ে আব্বা মধ্যস্থতা করে বললেন, গণির যেহেতু আয়-রোজগার আছে, সে তার মেহমানদের অন্য কোনোখানে খানাদানা করাক, হামিদ বাড়িতেই আয়োজন করবে। মাছ-ভাত দিয়ে আমি ৭-৮ শত লোকের মেহমানদারি সেরেছিলাম সেদিন এবং আব্বা নীরবে আমাকে সমর্থন করেছিলেন।

    সত্তরের নির্বাচনের সময় বঙ্গবন্ধুর মনোনয়ন পাওয়ার পর আব্বারও সমর্থন পেলাম। বঙ্গবন্ধু আব্বাকে আমার নির্বাচনী খরচ দেওয়ার জন্য বলে দিলেন। আব্বা আমাকে দুই কিস্তিতে ৫০ হাজার টাকা করে মোট এক লাখ টাকা দিয়েছিলেন। তা ছাড়া প্রায় ছয় মাস নির্বাচনী কর্মকাণ্ড পরিচালনার সময় পঞ্চাশ-ষাটজন লোকের, কোনো কোনো সময় একশ’-দেড়শ’ লোকের বাড়িতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হতো। আমি বঙ্গবন্ধুকে ধরেছিলাম আরও কিছু টাকা দেওয়ার জন্য বলে দিতে। বঙ্গবন্ধু আমাকে ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন, নির্বাচনের জন্য এত টাকা লাগে না। তবে বঙ্গবন্ধু ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলীর জনসভায় আমার জন্য ভোট চাইতে গিয়েছিলেন। কোনো কোনো জায়গায় নৌকা থেকেও বক্তৃতা করলেন এবং বিপুল ভোটে নির্বাচিত হলাম। নির্বাচিত হলেও স্বাধীনতার আগে সংসদে যাওয়ার সুযোগ হয়নি আমাদের। তবে সত্তরের ওই নির্বাচন আমাকে বঙ্গবন্ধুর মতো এক মহান নেতার আরও কাছে যাওয়ার সুযোগ করে দিল এবং তার কাছ থেকে শিখলাম, রাজনীতি হচ্ছে মানুষের মনের কাছে যাওয়ার চেষ্টা। মানুষও আমাকে প্রতিদান দিয়েছে, আমার মতো প্রান্তবর্গীয় একজন সাধারণ মানুষ তাই দু’বার বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার বিরল সুযোগ পেয়েছে।

    লেখক :গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি।

  • আজ ৭৪ বছরে পা রাখলেন খালেদা জিয়া

    গত ৬ মাস ধরে কারাগারে বন্দি বিএনপি চেয়ারপার্সন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ৭৩তম জন্মবার্ষিকী আজ। তিনি ৭৪ বছরে পা রাখলেন। পার্টি সূত্র জানায়, বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা চন্দনবাড়ির মেয়ে তৈয়বা মজুমদার আর পিতা ফেনীর ফুলগাজির ইস্কান্দার মজুমদার।

    পার্টি সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে তার কারামুক্তি, আশু রোগমুক্তি ও দীর্ঘায়ু কামনায় সারাদেশের জেলা ও উপজেলায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। আজ সকাল ১১টায় রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল হবে। খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে আজ দেশের সকল ইউনিটসমূহে যুবদলের মিলাদ ও দোয়া মাহফিল হবে।

  • ১৫ আগস্টের শহীদদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

    রাজধানীর বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

    বুধবার (১৫ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৭টায় বনানী কবরস্থানে বোন শেখ রেহানাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে ১৫ আগস্টের শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর শহীদদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তারা।

    এর আগে জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচির শুরুতে সকাল সাড়ে ৬টায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

    জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচির অংশ হিসেবে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাবেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি হেলিকপ্টারে টুঙ্গিপাড়া যাবেন।

    সকাল ১০টার দিকে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে ফাতেহা পাঠ, পুষ্পস্তবক অর্পণ, সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক অনার গার্ড প্রদান এবং মোনাজাতে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।

    সকাল ১১টায় প্রধানমন্ত্রী সেখানে বঙ্গবন্ধুর মাজার প্রাঙ্গণে মিলাদ মাহফিলে অংশ নেবেন।

    টুঙ্গিপাড়ার কর্মসূচির শেষ করে দুপুরে ঢাকায় ফিরে আসবেন প্রধানমন্ত্রী।

    বাদ আছর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত মিলাদ মাহফিলে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

    এছাড়া বৃহস্পতিবার (১৬ আগস্ট) বিকেলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় যোগ দেবেন বঙ্গবন্ধুর বড় মেয়ে শেখ হাসিনা।