দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা ছাগলকা-ের জেরে শেষ পর্যন্ত কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বহুল আলোচিত মতিউর রহমানকে। সোনালী ব্যাংকের পরিচালকের পদ থেকেও তাকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) শিগগিরই মতিউর ও তার পরিবারের অবৈধভাবে অর্জিত বিপুল বিত্তবৈভবের অনুসন্ধান শুরু করতে যাচ্ছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ইতোমধ্যেই আত্মগোপনে চলে গেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এই সদস্য। এদিকে যে সন্তানের কা-ের কারণে সংবাদের খোরাক হয়েছেন মতিউর, সেই সন্তানও তার মা (মতিউরের দ্বিতীয় স্ত্রী) ও ভাইকে নিয়ে দেশ ছেড়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছে। গতকাল মতিউরের অফিসে খোঁজ নিয়ে এবং বিভিন্ন সূত্রে এসব খবর পাওয়া গেছে।

মুশফিকুর রহমান ইফাত নামের এক যুবক গত ঈদুল আজহার আগে কোরবানির জন্য ১৫ লাখ টাকায় একটি ছাগল কিনে এ নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেওয়ার পর ভাইরাল হয়ে যান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে শুরু হয় নানারকম সমালোচনা। প্রশ্ন ওঠে, কে এই ইফাত? তার পরিচয় খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসে তার বাবা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট মতিউর। পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখে ইফাত তার ছেলে নন বলে জানান মতিউর। এতে করে আরও বেশি বেকায়দায় পড়েন তিনি। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বিভিন্ন তথ্যসূত্রের বরাতে উল্লেখ করা হয়, মতিউরই ইফাতের বাবা। শুধু তাই নয়, তার সম্পদের খোঁজ নিতে গিয়ে বেরিয়ে আসতে থাকে একের পর এক কেউটে সাপ। উঠে আসতে থাকে তার নানারকম অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্যও। সর্বশেষ, পরিস্থিতি বেসামাল দেখে আত্মগোপনে চলে গেছেন মতিউর; গণমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে না; গণমাধ্যমকর্মীদের ফোনে সাড়াও দিচ্ছেন না।

গতকাল রবিবার সকালে একটি টিম কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে গিয়ে জানতে পারে, মতিউর সেখানে যাননি। ট্রাইব্যুনালের গতকালের কার্যতালিকায় বেশ কিছু মামলা থাকলেও প্রেসিডেন্ট মতিউরের অনুপস্থিতির কারণে কোনো শুনানি হয়নি।

এর মধ্যেই দুপুরে জানা যায়, মতিউর রহমানকে ট্রাইব্যুনাল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে সংযুক্ত করে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বিসিএস (শুল্ক ও আবগারি) ক্যাডারের কর্মকর্তা মতিউর রহমানকে তার বর্তমান পদ থেকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে সংযুক্ত করা হয়েছে। কেন এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে- প্রজ্ঞাপনে তা উল্লেখ করা হয়নি।

গতকালই খবর আসে যে, মতিউর রহমানকে সোনালী ব্যাংকের পরিচালকের পদ থেকেও সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন খোদ ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী। তিনি এ দিন সাংবাদিকদের জানান, মতিউর রহমান আর কখনো সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সভায় আসবেন না। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

গতকাল রবিবার মতিউরের ‘অবৈধ’ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অনুসন্ধানে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে দুদক। কমিশনের উপপরিচালক মো. আনোয়ার হোসেনকে প্রধান করে এ কমিটি করা হয়েছে। এর অন্য দুজন সদস্য হলেন সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান ও উপ-সহকারী পরিচালক সাবিকুন নাহার।

সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দুদক সচিব খোরশেদা ইয়াসমীন বলেন, এনবিআরের সদস্য মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগে গত ৪ জুন কমিশন একটি টিমের মাধ্যমে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। টিমের সদস্যরা তাদের কাজও শুরু করেছেন।

এর আগেও মতিউরের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে চারবার অভিযোগ উঠেছিল বলে জানিয়েছেন দুদকের কর্মকর্তারা। ২০০৪, ২০০৮, ২০১৩ ও ২০২১ সালে সেগুলোর পরিসমাপ্তি টানা হয় তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণের অভাবে। এ বিষয়ে দুদক সচিব খোরশেদা ইয়াসমীন বলেন, এর আগে মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে চারবার করা অনুসন্ধানগুলো এখন আবার পর্যালোচনা করে দেখা হবে।

মতিউর রহমান দুই বিয়ে করেছেন। প্রথম স্ত্রীর নাম লায়লা কানিজ লাকি। তিনি নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। এই সংসারে তৌফিকুর রহমান অর্ণব ও ফারজানা রহমান ইপসিতা নামে দুই সন্তান রয়েছে। লাকি সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। পরে চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেন। কথিত আছে, তিনি স্বামীর পদ-পদবির প্রভাব খাটিয়ে ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। লাকির নামে নরসিংদীর রায়পুরার মরজালে বিশাল এলাকাজুড়ে ‘ওয়ান্ডার পার্ক’ নামে একটি রিসোর্ট রয়েছে। এ ছাড়াও নরসিংদীর নাগরিয়াকান্দির গোল্ডেন স্টার পার্কে রয়েছে অংশীদারত্ব। তার নামে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বহুতল ভবন রয়েছে।

এই পরিবারের সদস্যদের নামে টঙ্গীতে এসকে ড্রিম ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডসহ অন্তত এক ডজন কোম্পানিতে বিনিয়োগ রয়েছে বলে জানা যায়। পুঁজিবাজারের ব্রোকারেজ হাউসের অংশীদারত্ব রয়েছে এই পরিবারের। রয়েছে রিসোর্ট, আলিশান বাড়ি, বহুমূল্য গাড়ি ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ। এ ছাড়াও গাজীপুরের পূবাইলে রিসোর্ট, শুটিংস্পট, বাংলো বাড়ি, জমিসহ নামে-বেনামে রয়েছে অঢেল সম্পদ। এ ছাড়া ময়মনসিংহ ও গ্রামের বাড়ি বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন মতিউর। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও বাড়ি রয়েছে তার। তার ছেলের রয়েছে বিশ্বের নামিদামি ব্র্যান্ডের গাড়ির কালেকশন। যে ছেলের কা-ে সংবাদের খোরাক মতিউর, সেই ইফাত তার মা শাম্মি আক্তার ও ভাই ইরফানকে নিয়ে মালয়েশিয়ায় পালিয়ে গেছেন, বলছে গণমাধ্যম।