প্রস্তাবিত বাজেট প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি। এ বাজেট করনির্ভর, ঋণনির্ভর ও লুটেরাবান্ধব বলে দাবি করে দলটি। রোববার বিকালে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট কেবল গণবিরোধী নয়, এ বাজেট বাংলাদেশ বিরোধী। অসহনীয় মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ জনগণের ত্রাহি অবস্থা, এর ওপর বাজেটে করের বোঝা। দেশি-বিদেশি ঋণ ও সাধারণ জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া করের নির্লজ্জ ফিরিস্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রস্তাবিত বাজেট দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ দখলদার আওয়ামী সরকার ও তাদের মাফিয়া গুরুদের মাঝে ভাগাভাগির এক সুনির্দিষ্ট ইজারাপত্র।

মির্জা ফখরুল বলেন, জনসাধারণের ম্যান্ডেট ছাড়াই একটি অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতা আঁকড়ে রয়েছে। আইন-কানুন ও সংবিধান লঙ্ঘন করে ‘ডামি’ নির্বাচনের মাধ্যমে ‘ডামি সংসদ’ বানিয়েছে। এমন সরকারের পক্ষে বাজেট প্রদানের কোনো নৈতিক অধিকার নেই। প্রস্তাবিত বাজেট দেশের সাধারণ দরিদ্র মানুষদের শোষণের লক্ষ্যে একটি সাজানো হাতিয়ার মাত্র। বর্তমান লুটেরা সরকারের এ বাজেট কেবল দেশের গুটিকয়েক অলিগার্কদের জন্য। যারা শুধু চুরিই করছে না, ব্যবসা করছে, পলিসি প্রণয়ন করছে, আবার তারাই পুরো দেশ চালাচ্ছে। দেশ আজ দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। এই বাজেট কল্পনার এক ফানুস, ফোকলা অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, বাজেট প্রণয়নের জন্য যে সম্পদ প্রয়োজন, সেটাই এ অলিগার্করা লুট করে নিয়েছে। ব্যাংকগুলো খালি। সরকারের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে অলিগার্করা ঋণ নিয়ে ব্যাংকগুলোকে শূন্য করে দিয়েছে। এ অর্থের সিংহভাগই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। আমানতকারীরা ব্যাংকে তাদের জমা করা অর্থের চেক ক্যাশ করতে পারছে না। মানুষের মধ্যে নজিরবিহীন হাহাকার দেখা দিয়েছে। গরিব আরও গরিব হচ্ছে। যেকোনো সময় মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যেতে পারে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের রিজার্ভের অবস্থা তলানিতে। তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো ডলার রিজার্ভে নেই। ডলারের অভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে অচলাবস্থা চলছে। দেনা বাড়তে বাড়তে এমন হয়েছে, সেই দেনা শোধ করতেই বাজেটের বড় একটা অংশ চলে যাচ্ছে। মির্জা ফখরুল বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট চুরি হালাল করার ধান্দাবাজি। দেশের অর্থ নতুনভাবে লুটপাটের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আয়ের চেয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে অনেক বেশি। অথচ পুরো বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। ঋণও ঘাটতিভিত্তিক বড় বাজেট অতীতেও বাস্তবায়ন হয়নি, আগামীতেও হবে না।

তিনি আরও বলেন, এই বাজেটে কর্মসংস্থান তৈরির কোনো দিকনির্দেশনা নেই। ডলার সংকটের কথা বলে আমদানি সংকুচিত করায় ক্যাপিটাল মেশিনারিজ এবং মেটারিয়ালস আমদানি প্রায় অবরুদ্ধ। ফলে শিল্পকারখানা বন্ধের পথে। ব্যাংকগুলো শূন্য। সুদের হার অনেক বেশি। সরকার নিজেই ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ নেওয়ায় বেসরকারি সেক্টরে ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ কমে গেছে। যার ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। তিন হাজারের বেশি শিল্প, গার্মেন্টস শিল্প বন্ধ হয়ে গেছে ও যাচ্ছে। এ বাজেটে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির কোনো আশা নেই।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, পুরো বাজেটটিই করা হয়েছে মেগা প্রকল্প ও মেগা চুরি ও দুর্নীতি করার জন্য। অর্থনীতির এই ত্রিশঙ্কু অবস্থায় উচিত ছিল অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্পসমূহ বা অর্থহীন, অনুৎপাদক দৃশ্যমান অবকাঠামোগুলো বন্ধ রাখা। সেই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমুখী খাতে ব্যবহার করা। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও সম্প্রসারিত করা যেত। কিন্তু সেগুলো বন্ধ করলে তো দুর্নীতির পথ বন্ধ হয়ে যাবে। তাই বোধগম্য কারণেই সেটা করা হয়নি।

মির্জা ফখরুল বলেন, এবার শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ জিডিপির ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ, যা চলতি বছরে ছিল ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। গণবিরোধী সরকার শিক্ষা খাতে ক্রমাগত বরাদ্দ কমাচ্ছে। এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রেখেছে জিডিপির দশমিক ৭৪ শতাংশ, যা নিতান্তই অপ্রতুল। কৃষির জন্যও বরাদ্দ কমিয়েছে এই ‘মাফিয়া’ সরকার।

এই বাজেট কালো টাকাকে সাদা করার বাজেট উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, বাজেটে কালো টাকায় ঢালাও দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সৎ ও বৈধ আয়ের করদাতাদের নিরুৎসাহিত এবং দুর্নীতিকে সরকারিভাবে উৎসাহিত করা হলো। তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে সরকারের আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। ২০০৯ সালে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, যা এখন ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা।

সেখানে জনগণের সমস্যার সমাধান ও বাজেটে মূল্যস্ফীতি বন্ধ করার কোনো ব্যবস্থা নেই। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আলোচনা সভার আয়োজন করে ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব)। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ।

সভায় সভাপতিত্ব করেন ইউট্যাবের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম। সংগঠনের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ড. মো. রইছ উদদীনের সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভিসি অধ্যাপক আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক মিলন, পেশাজীবী পরিষদের সদস্য সচিব কাদের গণি চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মো. আবদুর রশিদ, অধ্যাপক লুৎফর রহমান, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান, অধ্যাপক ড. আবুল কালাম সরকার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামসুল আলম সেলিম প্রমুখ।