শরীয়তপুরে যাত্রী সেজে দুর্বৃত্তরা রিকশায় চড়ে চালককে কুপিয়ে অচেতন করে রিকশা ছিনতাই করে নিয়ে গেছে। দুর্বৃত্তরা দাঁত ভেঙে দেওয়ায় এখন স্পষ্টভাবে কথা বলতে না পারছেন চালক আলমগীর মল্লিক। হাসপাতালে শুয়ে ব্যথায় কাতরালেও অস্পষ্ট স্বরে ইশারায় সবাইকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন, তিনি এখন রিকশার মালিককে কী জবাব দিবেন? কীভাবে চলবে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে সংসার?

শুক্রবার (৩১ মে) সকাল ১০ টার দিকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। ভূক্তভোগী রিকশা চালক শরীয়তপুর সদর উপজেলার আংগারিয়া ইউনিয়নের হাজতখোলা গ্রামের আব্দুর রহমান মল্লিকের ছেলে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার (২৯ মে) রাত পৌনে ৯ টার দিকে আংগারিয়া বাজারের মন্দির সংলগ্ন ফ্যামিলি সুপার শপের সামনে থেকে তিন জন ব্যক্তি এসে যাত্রী সেজে ৩০০ টাকা ভাড়ায় আলমগীরের রিকশায় চড়েন। যাত্রীরা বালাখানা নামক স্থানে নামতে চাইলে কথা মতো যাত্রীদের বালাখানার দিকে নিয়ে যান আলমগীর। রিকশাটি সাবেক আইজিপির বাড়ির কাছাকাছি স্থানে পৌঁছালে যাত্রী সেজে থাকা দুর্বৃত্তরা আলমগীরকে মারধর শুরু করে। এসময় দুর্বৃত্তরা ছুড়ি দিয়ে আলমগীরের গলায় আঘাত করে। গলায় ছুড়ির আঘাত ও মারধরে তার তিনটি দাঁত ভেঙে গেলে আলমগীর অচেতন হয়ে পড়ে গেলে দুর্বৃত্তরা রিকশাটি নিয়ে পালিয়ে যায়। এরপর স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করে।

রিকশা চালক আলমগীর মল্লিক ছোটবেলা থেকে রিকশা-ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। রিকশা চালিয়ে বড় মেয়েকে বিয়ে দিলেও এখনো তার উপার্জনেই স্ত্রী ও তিন ছেলের আহার জোটে। বাড়ির বসতঘর ছাড়া তার নিজস্ব কোনো কৃষি জমি বা পূঁজি নেই বলে আংগারিয়ার সিরাজুল ইসলাম টুটুল মালতের ব্যাটারি চালিত একটি রিকশা তিনি দৈনিক ২০০ টাকা ভাড়া চুক্তিতে নিয়েছিলেন। সেই রিকশাটি চালিয়ে উপার্জন করে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে কোনো মতে দিন চলত তার। কিন্তু দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে মারধর করে রিকশাটি ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়ায় এখন দুঃচিন্তায় পড়েছেন রিকশা শ্রমিক আলমগীর। দুর্বৃত্তরা গলায় ছুড়িকাঘাত ও মুখের দাঁত ভেঙে দেওয়ায় অস্পষ্ট স্বরে আলমগীর মল্লিক সবাইকে বারবার বলে যাচ্ছেন, হারিয়ে যাওয়া রিকশাটির মালিককে কী জবাব দিবেন তিনি? কীভাবে তার অভাবের সংসার চলবে?

আহত আলমগীর মল্লিকের ভাতিজা মোবারক মল্লিক বলেন, আমরা গরীব মানুষ। অন্যের রিকশা ভাড়ায় নিয়ে সেই রিকশা দিয়ে উপার্জন করে আমার চাচার সংসার চলতো। অভাবের সংসারে বাবাকে সাহায্য করার জন্য চাচাতো ভাই শাওন কিছুদিন আগে স্টিলের গেরেজে কাজ শেখা শুরু করছে। শাওন এখনো উপার্জন করে না। অন্য দুই চাচাতো ভাই এখনো ছোট, তারা প্রাথমিক স্কুলে যায়। তাদেরও মনে হয় আর স্কুলে যাওয়া হবে না। আমরা রিকশা ফেরত চাই, যারা আমার চাচাকে মারছে তাদের বিচার চাই।

রিকশা চালক আলমগীর মল্লিকের ছেলে শাওন মল্লিক বলেন, বাবার রিকশা চালানো টাকায় বোনকে বিয়ে দিতে ঋণ করতে হয়েছে। সংসারে বাবাকে সাহায্য করতে স্টিলের গেরেজে কাজ শেখা শুরু করছি। ছোট দুই ভাইকে স্কুলে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু দুর্বৃত্তরা আমার বাবাকে আধা মরা করে রেখে গেছে। রিকশার মালিককে এখন আমরা কী জবাব দেব? বাবার চিকিৎসা করাবো কীভাবে? সরকারি হাসপাতালে যে ওষুধ দেয়, তার বাইরে ওষুধ কিনতে কষ্ট হয়। সংসার চলবে কীভাবে? আমরা থানায় জানিয়েছি।

বিষয়টি নিয়ে পালং মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, রিকশা চালক আলমগীরকে মারধর করে রিকশা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় একটি অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বার্তা বাজার/এইচএসএস