নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার একটি হাটে যুগের পর যুগ ধরে বেহাত হয়ে গেছে প্রায় সাড়ে চার একর সরকারি জমি। এসব জমির আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় তিনশত শত কোটি টাকা। প্রশাসন ও দখলদারদের সখ্যতায় ভেস্তে যাচ্ছে সরকারের পক্ষে জায়গা ফাঁকা করার উদ্যোগ। নামমাত্র উচ্ছেদ অভিযানে ৩০ শতাংশ জায়গা উদ্ধার করেই ক্ষান্ত প্রশাসন। উপজেলার গয়াবাড়ী ইউনিয়নের শুটিবাড়ী বাজারে দখল হওয়া এসব জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে উঠা কয়েকশ দোকান-পাট থেকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। আর এসব দোকানপাট ভাড়া দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি প্রভাবশালী মহল।

ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন দাগে শুটিবাড়ী হাটের মোট জমির পরিমাণ ৫ একর ৪২ শতাংশ। অবৈধ দখল রোধ ও হাট উন্নয়নে ২০০৯ সালে ৪৩০০ ও ৪৩০৯ দাগ ব্যতীত এই হাটের ৪ একর ৪৮ শতাংশ জমি পেরীফেরীর জন্য সুপারিশ করে নীলফামারীর জেলা প্রশাসক।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ৪ একর ৪৮ শতক জায়গার মধ্যে আনুমানিক ৫০ শতাংশ জায়গায় বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে দোকান সেড। এই সেড গুলোতে চাল, মাছ, শুঁটকি, মরিচ-পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যবসা করছে ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ী, বিভিন্ন দলীয় নেতাকর্মী এবং প্রভাবশালীরা দীর্ঘদিন ধরে বাজারের অবশিষ্ট সম্পত্তি ও রাস্তার জায়গা দখল করে ব্যবসা করছেন তারা।

এরমধ্যে ৩০ (ত্রিশ) ফুট প্রস্থের ডালিয়া-ডিমলা রোডের জায়গা বেদখল দিয়ে ১৮ থেকে ২০ ফুটে নিয়ে এসে দু’ধারে গড়ে তুলেছে বিভিন্ন দোকানপাট ও হোটেল রেস্তোরাঁ। অন্যদিকে বাজারের প্রাণ কেন্দ্রের ভেতর দিয়ে গয়াবাড়ী স্কুল এন্ড কলেজ যাওয়ার রাস্তা প্রস্থে ২০ ফুট হওয়ার কথা থাকলে তা দখল দিয়ে অর্ধেকে দাঁড়িয়েছে।

এছাড়াও বাজারের বেশ কয়েকটি ১০ ফুট প্রস্থের রাস্তা এমন দশা যেনো বাইসাইকেল চালিয়ে যাওয়াও মুশকিল হয়ে পড়েছে। রাস্তাগুলোর দু’ধারে গড়ে ওঠা পাকা, আধাপাকা ও টিনশেড ঘর তুলে দিনকে দিন দখল হচ্ছে রাস্তাগুলো। বাজারে আগত ব্যবসায়ীদের জন্য ৪ একর ৪৮ শতাংশ জমি পেরীফেরীর জন্য বরাদ্দ থাকলেও তা কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ।

বাস্তবে এসব জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের দোকান-পাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। হাটের এসব জায়গায় অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় হাঁস-মুরগি, ধান, ভুট্টা, পাট, মরিচ, পেঁয়াজ, আলু, রসুন সুপারী, সবজি, ভ্রাম্যমান নার্সারিসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফল ব্যবসায়ীগণ মূল সড়কে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করে আসছেন।

এসব পণ্য সরবরাহে নিয়োজিত বিভিন্ন ধরনের যানবাহন ও দেশের নানান রুটের বাস-ট্রাক, পিকআপ, থ্রি-হুইলার, মোটরসাইকেল, ইজিবাইক ও ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা চলাচলে বাজারের মূল সড়কসহ আশপাশে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। যানজট অতিষ্ঠ হয় ব্যবসায়ী ও ক্রেতা সাধারণ। আর সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন বাজারের গা ঘেঁষে গড়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এরকম পরিস্থিতিতে প্রতিনিয়তই ঘটছে ছোট বড় নানান দুর্ঘটনা।

এ দিকে নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, বাজারের বাকী সরকারি জায়গায় না ভাঙ্গার আশ্বাস দিয়ে ব্যবসায়ি ও অবৈধভাবে দখলদারদের কাছে মোটা অঙ্কের তুলেছে কয়েকজন জনপ্রতিনিধি।

শুটিবাড়ী বাজার বণিক সমিতির সভাপতি আব্দুল বাতেন বলেন, সরকার যদি চায় তোহা বাজারের জায়গা খালি করবে সে ক্ষেত্রে আমাদের কিছুই করার নেই। আমরা চাই হাটবাজারের উন্নয়ন হোক এবং জনসাধারণ সুবিধা পাক এবং এ ব্যাপারে কাজ করুক। বাজারের সড়কগুলোতে অবৈধভাবে গাড়ি পার্কিং ও বিভিন্নভাবে রাস্তায় ব্যবসা পরিচালনা বন্ধে প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

শুটিবাড়ী হাটের ইজারাদার মো. আইয়ুব চৌধুরী জানান, জায়গায় উদ্ধারের বিষয়টি প্রশাসনিক ব্যাপার, আমার দ্বারা তো সম্ভব না। আমি যদি কোথাও হাত দেই তাহলে নানান কথা হবে। এসিল্যান্ড কি করেন আমি এটা সঠিক জানিনা। দীর্ঘদিন ধরে বাজারের জায়গা দখল হাওয়ায় এবার ভাড়া জায়গায় হাট পরিচালনা করছি। আর এ সম্পত্তি উদ্ধার না হলে সরকারকে হাটের টাকা না দেয়ার চিন্তা-ভাবনা করছি। বাজারের রোড, ঘাট ফাঁকা না হলে স্কুল কলেজ গুলোর বিশাল সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

এবিষয়ে গয়াবাড়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ফরহাদ হোসেন সরকার বলেন, হাটের দিন শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় আসতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। যত্রেতত্রে গাড়ী পার্কিং আর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীগণ চলাচলের জায়গায় দোকান-পাট বসিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এজন্য সাপ্তাহিক হাটের দিন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অন্যান্য দিনের চেয়ে কিছুটা কম হয়।

দখলদারদের উচ্ছেদ ও জমি উদ্ধার প্রসঙ্গে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফারজানা আকতার বলেন, ইতোমধ্যেই অভিযান চালিয়ে ৩০ শতাংশ সরকারি জায়গা অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

অতিসত্বর জায়গা খালি করার জন্য দখলদারদের বলা হয়েছে। শিঘ্রই অবৈধভাবে দখল হওয়া বাকী সরকারি জায়গাগুলো উদ্ধার করা হবে বলে জানান তিনি।

সরকারি জায়গা দখলদারদের উচ্ছেদের কথা জানিয়ে নীলফামারীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বিরোদা রানী রায় বলেন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করার নামে কোনো জনপ্রতিনিধি বা প্রভাবশালী মহল যদি টাকা পয়সার দাবি করে এর দায়দায়িত্ব তাদের। এক্ষেত্রে আমাদের কোন ভূমিকা নেই। কোনো জনপ্রতিনিধি বা প্রভাবশালী এ কাজ করে থাকলে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

এ বিষয়ে নীলফামারী জেলা প্রশাসক পঙ্কজ ঘোষকে মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে তার মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও এবিষয়ে বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এসব জায়গায় উদ্ধারের কথা জানিয়ে রংপুরের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. আবু জাফর বলেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী কমিশনারের (ভূমি) সাথে কথা বলে জায়গাগুলো উদ্ধারের জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আর অবৈধভাবে সরকারি জায়গা দখল করলে তাদের বিরুদ্ধেও বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বার্তা বাজার/এইচএসএস