দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীদের কাছে নৌকা শুধু একটি প্রতীকই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, রাজনৈতিক দর্শন এবং আবেগ। অথচ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই নৌকাকে হারাতে উঠেপড়ে লেগেছে ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী।

আগামী ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের লক্ষ্যে তিন শ’ আসনে সমন্বয়ক টিম গঠন করেছে ছাত্রলীগ। তবে কেন্দ্রের নির্দেশ অমান্য করে সমন্বয় টিমে থাকা ও টিমের বাহিরের একাধিক ছাত্রলীগ নেতা নৌকার প্রার্থীর বিরোধিতাসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

নোয়াখালী-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বর্তমান সংসদ সদস্য মোরশেদ আলম। সারাদেশের মতো এই আসনেও নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে গত ২৮ ডিসেম্বর ২৩ সদস্যের সমন্বয়ক টিম গঠন করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। এরমধ্যে ছয়জন কেন্দ্রের নির্দেশ অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান ভূঁইয়া মানিকের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বিনিময়ে আদর্শ বিক্রি করেছে ছাত্রলীগের গুটিকয়েক নেতাকর্মী।

অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতারা হলেন- ইমরান হোসেন কায়েস, জাহিদুল ইসলাম তুষার, আব্দুল্লাহ আল জোবায়েদ তুষার, আবু রাজ শোভন, নাজমুল হক রায়হান, এ বি এম ফজলে রাব্বি। এসব ছাত্রলীগ নেতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। নৌকা ডোবাতে ভোটের মাঠেও সক্রিয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অমান্যকারী এসব নেতা।

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে এবার নৌকা প্রতীকে লড়ছেন টানা তিনবারের সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী। তার আসনে ছাত্রলীগের সমন্বয়ক টিমের সদস্যরা নৌকার পক্ষে মাঠে থাকলেও স্থানীয় কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। এরমধ্যে তিনজনের নাম সামনে এসেছে। তারা হলেন- রূপগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মামুনুর রশীদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আসিফুল ইসলাম খোকন ও ভোলাব ইউনিয়ন সাংগঠনিক সম্পাদক বাঁধন। এসব নেতাকর্মীরা কেটলি প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহজাহান ভূঁইয়ার পক্ষে ভোটের মাঠে রয়েছেন বলে অভিযোগ।

এ ছাড়া মাদারীপুর-৩ আসনে নৌকার প্রার্থী আব্দুস সোবহান গোলাপের বিপক্ষে মাঠে রয়েছেন স্থানীয় ছাত্রলীগের একটি বড় অংশ। অভিযোগ রয়েছে মাদারীপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জাহিদ হাসান অনিক ও সাধারণ সম্পাদক বায়েজিদ হাওলাদারসহ বেশ কিছু ছাত্রলীগ নেতা ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাহমিনা বেগমের পক্ষে মাঠে কাজ করছেন।

পাশাপাশি রাজশাহী ৪ আসনে পৌর ও উপজেলা কমিটি না থাকায় মাঠ পর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে কাজ করছেন। পৌর ও উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আব্দুল মালেক নয়ন বর্তমান সংসদ সদস্য কাঁচি প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী এনামুল হকের পক্ষে এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক জহুরুল হক নৌকার প্রার্থী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদের পক্ষে কাজ করছেন। একই সঙ্গে রাজশাহী-৫ আসনে পুঠিয়া উপজেলা ও পৌর কমিটি না থাকায় দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর হয়ে কাজ করছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে দুর্গাপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শাকিল খান ও সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান রিপনের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের একটি অংশ স্বতন্ত্র প্রার্থী ওবায়দুর রহমানের ঈগল প্রতীকের হয়ে কাজ করছেন।

নওগাঁ-৪ আসনে নৌকার প্রার্থী নাহিদ মোর্শেদ বাবুর পক্ষে মাঠে নেই ছাত্রলীগের সমন্বয়ক টিমের অধিকাংশ নেতা। শুধু তাই নয়, মান্দা উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন মন্ডল নৌকায় ভোট না চেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্রহানী সুলতান মামুদ গামার পক্ষে ট্রাক প্রতীকে প্রকাশ্যে প্রচারণা চালাচ্ছেন। একই সঙ্গে ১০নং নুরুল্লাবাদ ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সুমন হোসেনও প্রক্যাশে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে মাঠে রয়েছেন। এ ছাড়া নওগাঁ-৩ আসনে নৌকার প্রার্থী সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর বিপক্ষে কাজ করছেন ছাত্রলীগের একটি অংশ। আসনটিতে ট্রাক প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী ছলিম উদ্দিন তরফদারের পক্ষে মাঠে রয়েছেন বদলগাছী উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সুমন হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হোসেনসহ আরও বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী।

লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে ট্রাক প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এ সাত্তারের পক্ষে কাজ করছেন চন্দ্রগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের সভাপতি আবু তালেব। অভিযোগ রয়েছে, বিপুল অর্থ নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি।

এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও-২ আসনে নৌকার প্রার্থী মাজাহারুল ইসলামের পক্ষে কাজ না করে ট্রাক প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী আসলাম জুয়েলের হয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন ছাত্রলীগের একটি অংশ। অভিযোগ উঠেছে হরিপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাদেকুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক শামিম রেজা ও তার অনুসারীরা ট্রাক প্রতীকের পক্ষে প্রচার-প্রচারণাসহ বিভিন্ন নির্বাচনী সভায় বক্তব্যও দিচ্ছেন।

এসব আসনে ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী নৌকার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় বিভ্রান্ত হচ্ছেন ভোটাররা, সৃষ্টি হচ্ছে সংঘাতের পরিবেশ। আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আমাদের ওপর ভরসা রাখেন বলেই নৌকার মনোয়ন দিয়েছেন। সেই হিসেবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতিটি ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে নৌকার পক্ষেই কাজ করা উচিত। কিন্তু সংগঠনটির কিছু নেতাকর্মী টাকা-পয়সাসহ বিভিন্ন লোভে নৌকার বিরোধিতা করছেন। যা অত্যন্ত লজ্জাজনক, এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান বলেন, ছাত্রলীগের কোনো সদস্য নৌকার বিরুদ্ধে কাজ করছেন—এমন কোনো বিষয় আমাদের নজরে আসেনি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্তসাপেক্ষে আমরা ব্যবস্থা নেব।

তিনি বলেন, ভোটকে উৎসবে রূপান্তর করা ও ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে আসাসহ ভোট যে গণতান্ত্রিক দায়িত্ব সেটি জনগণকে বোঝানোই আমাদের লক্ষ্য। এ জন্য সারাদেশে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কাজ করছেন।

বার্তা বাজার/জে আই