নাশকতার অভিযোগে বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা পুরনো মামলার বিচার চলছে দ্রুত গতিতে। গত তিন মাসে প্রায় অর্ধশত মামলায় সহস্রাধিক বিএনপি নেতাকর্মীকে সাজা দেয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবারও দুই মামলায় ২৯ জন নেতাকর্মীকে কারাদণ্ড দেয়া হয়।

এসব মামলার বড় অংশের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বাদী পুলিশের সদস্য, সাক্ষীরাও পুলিশের সদস্য। আইনজীবীরা বলছেন, পুলিশ নিজেই এসব মামলায় একটি পক্ষ। আবার দেখা যাচ্ছে সাক্ষ্যও দিচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। কোনো স্বাধীন সাক্ষী নেই। এগুলো নজিরবিহীন ঘটনা। বিচার ব্যবস্থায় নতুন সংযোজন। গত তিন মাসে বিএনপি চেয়ারপারসনের দুইজন উপদেষ্টা, একজন ভাইস চেয়ারম্যান, একজন যুগ্ম মহাসচিব, চারজন সম্পাদক ও সহ-সম্পাদক, তিনজন নির্বাহী কমিটির সদস্য, ঢাকা মহানগরের তিন শীর্ষ নেতা, যুব ও স্বেচ্ছাসেবক দলের পাঁচ শীর্ষ নেতা এবং জেলা পর্যায়ের কয়েকজন সিনিয়র নেতাকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে।

ফৌজদারি মামলার আলোচিত আইনজীবী শিশির মনির জানিয়েছেন, তিনি এ ধরনের দুটি মামলা পরিচালনা করেছেন। দুটিতেই শতভাগ সাক্ষী ছিলেন পুলিশের সদস্যরা। সুপ্রিম কোর্টের এ আইনজীবী বলেন, স্বাধীন সাক্ষী ছাড়াই মামলার বিচার কাজ শেষ করে দেয়া হচ্ছে। রায় দিয়ে দেয়া হচ্ছে। এগুলো আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।

সাবেক ছাত্রদল সভাপতি আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েলের আইনজীবী এডভোকেট ইলতুলমিশ সওদাগর এ্যানি জানিয়েছেন, জুয়েলের একটি মামলায় ১৩ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ৫ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। তারা সবাই পুলিশ সদস্য ছিলেন। আরেকটি মামলায় ২৯ জন সাক্ষীর মধ্যে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন মাত্র ৫ জন। এই পাঁচজনও পুলিশ ছিলেন। কোনো পাবলিক সাক্ষী ছিল না। এ ছাড়া আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে কোনো সাক্ষীই ঘটনাস্থলে আসামিকে দেখেছেন এমনটা বলেননি।

এসএম জাহাঙ্গীরের মামলায়ও একই দৃশ্য
২০১৩ সালের ২৬শে নভেম্বর উত্তরার আজমপুর রেলগেট এলাকায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগে যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি এসএম জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে উত্তরা পূর্ব থানায় দুটি মামলা দায়ের করে পুলিশ। একই ঘটনায় দক্ষিণ খান থানায় পুলিশ বাদী হয়ে এসএম জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলা দায়ের করে। উত্তরা পূর্ব থানার দুটি মামলায় গত ২২শে নভেম্বর ও ২৩শে নভেম্বর রায় দেয়া হয়। একটি মামলায় সাত বছর ও অপর মামলায় আড়াই বছর কারাদণ্ড দেয়া হয় এসএম জাহাঙ্গীরকে।

এসএম জাহাঙ্গীরের আইনজীবী এডভোকেট নজরুল ইসলাম বলেন, একটি মামলায় ৬ জন সাক্ষীর মধ্যে আদালতে ৩ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এরমধ্যে দু’জনই পুলিশ। এ ছাড়া অপর মামলায় ১৯ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন যার মধ্যে ১৭ জনই পুলিশ। তিনি আরও বলেন, এসএম জাহাঙ্গীরের উত্তরা পূর্ব থানার একটি মামলায় একদিনে ১৩ জন সাক্ষী এলে রাত ৯টা পর্যন্ত সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়।

দ্রুত নিষ্পত্তি, সাক্ষী সবাই পুলিশ
২০১৭ সালে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের কর্তব্য কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে রাজধানীর পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করে পুলিশ। ওই মামলায় আসামি করা হয় বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, তথ্য বিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল, যুবদল সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসানসহ আরও ৫০ জন নেতাকর্মীকে। চলতি বছরের নভেম্বরের শুরুতে মামলাটির বিচার কার্যক্রমে হঠাৎ গতি বেড়ে যায়। মামলার ২৫ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ৬ জনকে হাজির করে রাষ্ট্রপক্ষ। যে ৬ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন তারা সবাই পুলিশের সদস্য। গত ২০শে নভেম্বর মামলার রায় দেন ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক আতাউল্লাহ। রায়ে সোহেল, হেলাল, টুকু ও রাজীব আহসানসহ ২৫ জনকে আড়াই বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়। এ মামলার আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. ফারুক হোসেন বলেন, বিচারকার্য শুরুর পর মাত্র ১৫ দিনে মামলাটি নিষ্পত্তি করে রায় দেয়া হয়।

পিন্টুর মামলায়ও একই ঘটনা
২০১৮ সালে পুলিশের কাজে বাধা ও গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগে রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদল নেতা রজব আলী পিন্টুর বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে ওই থানার পুলিশ। মামলাটির রায় হয় গত ৩০শে নভেম্বর। চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সাইফুর রহমান রায়ে যুবদল নেতা পিন্টুসহ ১১ জনকে ২ বছর ৬ মাস করে কারাদণ্ড দেন। রায়ের আগে টানা ১০ কার্যদিবস মামলাটির শুনানি চলে বলে জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী এডভোকেট জিল্লুর রহমান।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ মাত্র ৫ জন সাক্ষী আদালতে হাজির করেন। আদালতে যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন তারা সবাই পুলিশ। এদিকে ২০১৩ সালে একই অভিযোগে কোতোয়ালি থানায় যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে পুলিশ। ইসহাক সরকারের মামলার আইনজীবী জিল্লুর রহমান জানান, মামলার শুনানিতে নিরপেক্ষ সাক্ষীর সাক্ষ্য আমলে নেয়া হয়নি। পুলিশের সাক্ষীর ভিত্তিতে রায় দেয়া হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, দেশে যদি আইনের শাসন থাকে তাহলে এগুলো হয় না। আমাদের দুর্ভাগ্য হলো- কোনো সরকারই আইনের শাসনের দিকে লক্ষ্য দেয় না। তাহলে উচ্চ আদালতের যে দিকনির্দেশনা আছে ৫৪ এবং ১৬৭ ধারা নিয়ে এই নির্দেশনা মানতে নিম্ন আদালত বাধ্য। ওই নির্দেশনা মানলে এসব মামলাই হতে পারে না। একটা মানুষকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ না দিয়ে কোনো প্রকারের ট্রায়ালই হতে পারে না। এটা আইনের শাসনের ব্যত্যয়। তিনি আরও বলেন, যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে তারা চেয়েছে বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুদকসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান কুক্ষিগত করে রাখতে। এর ফল ভোগ করছেন রাজনীতিবিদরা। এখন তাদের মধ্যে যদি চেতনাবোধ জাগে- তারা ক্ষমতায় এলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে।

বার্তাবাজার/এম আই