সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় নির্বাচনের তপশিল বাতিল, খালেদা জিয়াসহ গ্রেপ্তার নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলনে রয়েছে বিএনপি। গত বছরের ডিসেম্বরে বিভিন্ন দল ও জোটকে সঙ্গে নিয়ে যুগপৎ কর্মসূচি পালন করছে দলটি। গত ২৮ অক্টোবর ঢাকার নয়াপল্টনের মহাসমাবেশ ঘিরে সহিংসতার জেরে শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তারের পর থেকে টানা অবরোধ ও হরতাল করছে তারা। প্রথমদিকে এই কর্মসূচির প্রভাব দেখা গেলেও বর্তমানে অনেকটাই ঢিলেঢালা হয়ে পড়েছে। দূরপাল্লার যান কম চললেও রাজধানীতে কোনো প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় কর্মসূচি বাস্তবায়নে আরও কঠোর হতে চান শীর্ষ নেতারা।

ইতোমধ্যে আগামী রোববার থেকে আরেক দফা ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। সেইসঙ্গে কর্মসূচিতে ভিন্নতা আনার কথাও ভাবছে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা। হরতাল-অবরোধের পাশাপাশি জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে চায় তারা। বিশেষ করে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা যাতে প্রকাশ্যে আসতে পারেন, সে বিষয়টি ভাবা হচ্ছে। আগামীতে কর্মসূচি সফল করতে রাজপথে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই বলে মনে করেন তারা।

এদিকে পূর্বঘোষিত একদফা এবং নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার ২৪ ঘণ্টার হরতাল কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা। এ সময় সারা দেশে মোট ৮টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা।

জানা গেছে, নির্বাচন ঠেকাতে কী ধরনের কর্মসূচি দেওয়া যেতে পারে—সে বিষয়ে গতকাল বিকেলে রাজধানীর শিশুকল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন ৩৯টি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। পরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘গত এক মাস দমন-নিপীড়ন ও গ্রেপ্তারের পথে সরকার দেশব্যাপী ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। পদত্যাগের গণদাবিকে উপেক্ষা করে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতো আরেকটি একতরফা নীলনকশার নির্বাচনের পাঁয়তারা করছে। সরকারের এই এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহযোগী হিসেবে নির্বাচন কমিশন আগামী ৭ জানুয়ারি তপশিল ঘোষণা করেছে। জনগণের ভোটের গণতান্ত্রিক অধিকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সমগ্র এই নির্বাচনের তপশিলকে আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। অবিলম্বে দাবি মেনে পদত্যাগের আহ্বান জানাই। সেইসঙ্গে সরকার ও সরকারি দলের উসকানি, সহিংসতা এড়িয়ে শান্তিপূর্ণভাবে চলমান গণআন্দোলনকে বিজয়ের পথে এগিয়ে নিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাই।’

জাতীয় পার্টির (জাফর) সভাপতি মোস্তফা জামাল হায়দারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, মাহমুদুর রহমান মান্না, শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, জোনায়েদ সাকি, শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, সুব্রত চৌধুরী, কারী আবু তাহের, সাইফুল হক, মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, খন্দকার লুতফর রহমান, হাসনাত কাইয়ূম, মুহিউদ্দিন ইকরাম, এমএন শাওন সাদেকী, মো. আবুল কাশেম, ড. মো. নেয়ামুল বশির, রাশেদ প্রধান, শাহাদাত হোসেন সেলিম, লায়ন মো. ফারুক রহমান, তাজুল ইসলাম, ফারুক হাসান, বাবুল সরদার চাখারী, নুরুল হক নূর প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক গতকাল কালবেলাকে বলেন, ‘৩৯টি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা একসঙ্গে বসে আলাপ করেছি। নিশ্চয়ই এর গুরুত্ব আছে। সামনের দিনে কর্মসূচির ধরন বদলাতে পারে। সভা-সমাবেশের পাশাপাশি ঘেরাও কর্মসূচি আসবে। ইতোমধ্যে কারাবন্দি নেতাদের স্বজনদের দিয়ে একটি সমাবেশ হয়েছে, যা বিভাগীয় পর্যায়ে করার চিন্তা আছে।’

যেমন হতে পারে আগামীর কর্মসূচি: দীর্ঘদিন ধরে লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে আসা বিএনপির কর্মসূচিগুলো বিক্ষিপ্তভাবে পালিত হচ্ছে। সিনিয়র কোনো নেতাকে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা এখনো বিক্ষিপ্তভাবে মিছিল-পিকেটিং করছেন। অন্যদিকে লাগাতার হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির প্রভাবও কমে আসছে। এ অবস্থায় কর্মসূচিতে ভিন্নতা আনতে চায় বিএনপি। তাতে আন্দোলন আরও জোরালো হবে বলে নীতিনির্ধারকদের ধারণা। আন্দোলনকে আরও গতিশীল করতে নানামুখী কৌশলের কথা ভাবছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। হরতাল-অবরোধের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে সভা-সমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এই মুহূর্তে সরকারের দমন-নিপীড়নের তথ্যচিত্র আর্ন্তজাতিক মহলে তুলে ধরার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজপথে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর কর্মসূচি আসবে। আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দিতে সরকারবিরোধী দল ও জোটগুলোকে এক মঞ্চে আনার কথাও ভাবছেন তারা।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আমাদের আন্দোলন বিজয়ের পথে ধাবিত হচ্ছে। বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। সারা দেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হামলা, মামলা ও নির্যাতন সত্ত্বেও নেতাকর্মীরা জীবন বাজি রেখে দৃঢ়তার সঙ্গে রাজপথে থেকে সর্বাত্মকভাবে কর্মসূচি সফল করছেন।’

বিএনপি নেতারা জানান, গত ১৫ নভেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তপশিল ঘোষণার পর বিএনপিসহ সরকারবিরোধী দলগুলোতে এক ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে, কোনো কোনো নেতা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। এমনকি নতুন রাজনৈতিক দলের হয়ে বিএনপি নেতাদের মনোনয়নপত্র তোলা ও জমা দিতে বাধ্য করা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষে বিভিন্ন সংস্থা বিএনপি ও বিভিন্ন দলের কিছু কিছু নেতাকে টার্গেট করে নানা প্রলোভনও দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারের সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি বলে মনে করেন তারা। প্রবল চাপ ও নানা প্রলোভন সত্ত্বেও হাতেগোনা কয়েকজন নির্বাচনে গেলেও বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ কোনো নেতা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাননি। ফলে এই বিষয়টি বিএনপির জন্য অনেকটা স্বস্তিদায়ক বলে দলটির নেতারা মনে করছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ‘গত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করতে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি করা তারই অংশ। বাস্তবতা হচ্ছে, সরকার এই ১৫ বছরে ১৫ জন দূরে থাক, বিএনপির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকেও কী তাদের দলে ভেড়াতে পেরেছে? যত চাপ বা চেষ্টাই হোক বিএনপি নেতারা দল ছেড়ে এসে নির্বাচন করবেন—এমন আশঙ্কা তাদের মধ্যে এখন আর নেই।’

২৪ ঘণ্টার হরতালের চিত্র : এদিকে হরতাল সফল করতে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশান ও উত্তরা জনপথ মোড়ে বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এ ছাড়া গুলশান, বঙ্গবাজার, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, খিলক্ষেত, মতিঝিল, খিলগাঁও পুলিশ ফাঁড়ি, সেগুনবাগিচায় বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করেছে। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ী, মুগদা, ডেমরা, পুরান ঢাকা, শাহজাহানপুর, মগবাজার, মিরপুর, বাড্ডা, তেজগাঁও এবং মোহাম্মদপুরে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় আটটি যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম বলেন, ২৯ নভেম্বর সকাল ৬টা থেকে ৩০ নভেম্বর সকাল ৬টা পর্যন্ত আটটি যানবাহনে আগুন লাগার সংবাদ পায় ফায়ার সার্ভিস। ঢাকা সিটিতে তিনটি, রাজশাহী একটি, বগুড়ায় একটি, কুমিল্লায় তিনটি যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। একটি কনটেইনার, পাঁচটি বাস ও দুটি ট্রাক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগুন নির্বাপণে ফায়ার সার্ভিসের ১১টি ইউনিট ও ৬৮ জন জনবল কাজ করেন। এ ছাড়া গত ২৮ অক্টোবর থেকে ৩০ নভেম্বর সকাল ৬টা পর্যন্ত কয়েকটি স্থাপনা ও যানবাহনসহ মোট ২৩৬টি অগ্নিসংযোগের সংবাদ পেয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

বগুড়ায় বিক্ষোভ মিছিল থেকে বাস ভাঙচুর করেছে হরতাল সমর্থকরা। এ সময় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সড়ক অবরোধ করতে গেলে পুলিশ তাদের ধাওয়া করে। সেখান থেকে আটক করা হয় দুজনকে। এর আগে বুধবার রাতে তিনটি পরিবহনে অগ্নিসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে বগুড়ার বনানী এলাকায় একটি ট্রাকে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এর পর পরই একই মহাসড়কে শহরতলীর তিনমাথা এলাকায় একটি যাত্রীবিহীন বাসে এবং দ্বিতীয় বাইপাস সড়কের জয়বাংলা এলাকায় একটি দুধ বহনকারী লরিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

যানবাহনে অগ্নিসংযোগের তথ্য নিশ্চিত করে বগুড়া সদর থানার ওসি সাইহান ওয়ালিউল্লাহ বলেন, ‘হরতালে নাশকতা ঠেকাতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মাঠে আছেন। যে দুজনকে আটক করা হয়েছে তাদের বিষয়ে তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

গাজীপুর শহরের ঝাজর এলাকায় ঢাকা বাইপাস মহাসড়কে ককটেল ফাটিয়ে দুটি কাভার্ডভ্যানে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণ আনে। অন্যদিকে সকালে কাশিমপুর থানার জিরানি বাজার এলাকায় ইতিহাস পরিবহনের একটি বাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।

গাছা থানার ওসি শাহ আলম বলেন, ‘সকালে কে বা কারা দুটি কাভার্ডভ্যানে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ ছাড়া শরীয়তপুর, সুনামগঞ্জের তাহিরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে হরতাল সমর্থকরা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেছে।

রোববার থেকে আবার অবরোধ: সরকারের পদত্যাগের একদফা, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল বাতিল ও বেগম খালেদা জিয়াসহ গ্রেপ্তারকৃত নেতাকর্মীদের মুক্তি দাবিতে নবম ধাপে আবারও ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘আগামী রোববার সকাল ৬টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি পালিত হবে। সব সমমনা দল ও জোটের নেতাকর্মীরা এই কর্মসূচি সফল করবেন।’

বার্তা বাজার/জে আই