জাতীয় নির্বাচন ঘিরে জাতীয় পার্টির দুই পক্ষের টানাপোড়েনে শেষ পর্যন্ত কিছুই পেলেন না দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদের অনুসারীরা। অন্তত ৩০ জনকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া, প্রধানমন্ত্রীর মধ্যস্থতায় সংকটের সমাধান, বিরোধী দলের নেতাকে সামনে রেখে নির্বাচন ও দল পরিচালনা—এসব দাবির কোনোটাই পূরণ হয়নি। এরই মধ্যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমার সময় শেষ হওয়ায় বিজয়ের হাসি হাসছেন চেয়ারম্যান জি এম কাদেরপন্থিরা। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে দূরেই থাকতে হচ্ছে রওশন এরশাদ ও তার অনুসারীদের। তবে এখনো নিজেদের জাতীয় পার্টির মূল ধারা দাবি করে চার দিনের মধ্যে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন এই অংশের নেতারা।

জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদেরপন্থি নেতারা বলছেন, রওশন এরশাদের বয়স ও সরলতার সুযোগ নিয়ে কয়েকজন ব্যক্তি তাকে রাজনীতির ভুল পথে পরিচালনা করেছে। তাদের কারণেই জি এম কাদেরকে অনেক দিন দল পরিচালনার বাইরে থাকতে হয়েছে। এমনকি ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে দল থেকে এরশাদের ভাই কাদেরকে বাদ দেওয়ার চেষ্টাও হয়েছে। দলকে বিভক্ত করার চেষ্টাও কম হয়নি। এসবের ফল হিসেবেই এখন দলের মধ্যে তাদের (রওশনপন্থিদের) এই দুরবস্থা।

প্রায় তিন বছর ধরেই দলের নেতৃত্বে নিয়ে রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের মধ্যে কোন্দল চলছে। গত বছর পৃথক কাউন্সিলেরও ডাক দিয়েছিলেন রওশন। এসব তৎপরতায় জড়িত থাকার দায়ে বেশ কয়েকজনকে দল থেকে বহিষ্কার করেন জি এম কাদের। একপর্যায়ে সরকারের মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও রওশনের দেওয়া দাবি পূরণ না করায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকেই যায়।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে উভয়পক্ষে সমঝোতার আশা ছিল দলের শীর্ষ নেতাদের। কিন্তু কোনো সমঝোতা ছাড়াই দলীয় মনোনয়নপত্র বিতরণ করে জাপা। শেষদিন পর্যন্ত রওশনপন্থিদের কেউ তা সংগ্রহ করেননি। যদিও রওশন নিজে টেলিফোন করে তিনটি মনোনয়নপত্র রাখতে বলেছিলেন বলে জানান মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু।

অভিযোগ আছে, দলের বহিষ্কৃত নেতা ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গার পক্ষে তার মেয়ে দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে জাপা চেয়ারম্যানের বনানী কার্যালয়ে গেলে তাকে খালি হাতে ফেরত পাঠানো হয়। এরপর রওশনের ময়মনসিংহ-৪ বাদে ২৮৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে জাতীয় পার্টি।

সর্বশেষ গত শনিবার রাতে রওশনের গুলশানের বাসায় যান দেবর জি এম কাদের। সেখানে রওশন এরশাদের পক্ষ থেকে একসঙ্গে চলার ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত দেওয়া হয়। শর্তের মধ্যে ছিল—সব বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার, যোগ্য অন্তত ৩০ জনের মনোনয়ন নিশ্চিত করা, ছেলে সাদ এরশাদের জন্য রংপুর-৩ আসন ছেড়ে দেওয়া এবং তাকে সামনে রেখে নির্বাচন ও দল পরিচালনা করা। তবে রওশন ও ময়মনসিংহ জেলা জাপার সাধারণ সম্পাদক ছাড়া আর কারও জন্য আসন ছাড়তে রাজি হননি জি এম কাদের। তেমনি অন্যান্য শর্ত মানতে রাজি হননি তিনি। এতে রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের আলো একেবারেই নিভে যায়।

গত বুধবার রাতে রওশনের আসনে আবু মুসা সরকারকে প্রার্থী ঘোষণা করেন জি এম কাদের। এর পরই রওশনের বাসায় জরুরি বৈঠকে বসেন নেতারা। মধ্যরাতে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ। তেমনি তার অনুসারীরা স্বতন্ত্র নির্বাচন করবেন না বলেও জানান।

এদিকে আসন বণ্টনসহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চেয়েছিলেন রওশন। প্রধানমন্ত্রীর দিক থেকে জাপার দুই পক্ষকে এক হয়ে একক প্রার্থী তালিকা নিয়ে গণভবনে যেতে বলা হয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ কোন্দল না মেটায় তা সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেল মনোনয়নপত্র জমার প্রক্রিয়া। ফলে জাতীয় পার্টির মূলধারার রাজনীতিতে রওশনের হাতে আর কিছুই রইল না।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিরোধী দলের নেতার রাজনৈতিক সচিব ও জাতীয় পার্টির সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সদস্য সচিব গোলাম মসীহ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘বুধবার রাতে বিরোধী দলের নেতার গুলশানের বাসভবনে রওশন এরশাদের সভাপতিত্বে জাতীয় পার্টি সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় মনোনয়নে অনিয়মের কারণে জি এম কাদের ও মুজিবুল হক চুন্নুর বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করে নেতারা বলেন, রওশনের আসনে মুসাকে মনোনয়ন দেওয়া ধৃষ্টতা প্রদর্শনের শামিল।’

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘সভায় আসন্ন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ভরাডুবির এক গভীর ষড়যন্ত্রের নীল নকশার বিষয়ে জি এম কাদেরের নেতৃত্বে একটি মহলের গভীর ষড়যন্ত্রের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন রওশন এরশাদ। এমন বাস্তবতায় বিরোধী দলের নেতা নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।’

পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে গোলাম মসীহ বলেন, ‘আমাদের অবমূল্যায়ন করায় নির্বাচন বর্জন করেছি। জাপা চেয়ারম্যান ও মহাসচিব অসহযোগিতা করায় পরীক্ষিত নেতাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এই পরিস্থিতিতে আগামী চার দিনের মধ্যে নতুন সিদ্ধান্তে যাব।’

নতুন করে দল গঠন করা হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জাতীয় পার্টির সবাই আমাদের দিকে। যারা মনোনয়ন পাননি, তারাও যোগাযোগ করছেন। এমপিরা রওশন এরশাদের পক্ষে। রওশন এরশাদের জাপাই মূলধারা। সবাই ভুল বুঝে আমাদের কাছে ফিরে আসবে।’

জানতে চাইলে জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, জাতীয় পার্টি আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তি অর্জন করেছে। মানুষ আমাদের ভোট দিতে চায়। তাই আলাদাভাবে নির্বাচন করছি। রওশনকে ভুল বুঝিয়ে কিছু লোক দীর্ঘদিন ধরে করেছে। আশা করি, সেই ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের জবাব পেয়েছেন।’

বার্তা বাজার/জে আই