মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন আজ বৃহস্পতিবার শক্তভাবে হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি ও যুগপৎ আন্দোলনে থাকা মিত্ররা। শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের গ্রেপ্তারের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান পরিস্থিতিতে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা এদিন কতটা জোরালোভাবে মাঠে থেকে কর্মসূচি পালন করতে পারেন বা সরকারের আচরণ কেমন হয় অথবা পুনঃতপশিল হয় কি না—এসব কিছু দেখে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি চূড়ান্ত করতে চায় আন্দোলনে থাকা দলগুলো। ফলে আজ নতুন কর্মসূচির ঘোষণা না-ও আসতে পারে।

এর আগে বিএনপির প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ছিল, মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় বাড়ানো না হলে একঘেয়ে হয়ে যাওয়া হরতাল-অবরোধে সাময়িক বিরতি দিয়ে বিকল্প কর্মসূচিতে যাওয়া। কর্মসূচিতে বৈচিত্র্য আনতে এবং হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি ঘিরে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা যাতে স্বাভাবিক পরিবেশে রাজনীতি করতে পারেন, সেজন্য বিকল্প কর্মসূচির এ ভাবনা। লক্ষ্য নেতাকর্মীদের আতঙ্কিত অবস্থা থেকে বের করে আনা এবং আগামীর আন্দোলনের জন্য নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করা। আর মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় বাড়ানো হলে সে সময় পর্যন্ত হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি অব্যাহত রাখা।

বিএনপি ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক একাধিক নেতা বলেন, তারা বৃহস্পতিবারের হরতালের সার্বিক পরিস্থিতি দেখে পরবর্তী কর্মসূচির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। পরিস্থিতি বুঝে চলমান হরতাল-অবরোধে সাময়িক বিরতি দিয়ে বিকল্প কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে, আবার হরতাল-অবরোধের সঙ্গে নতুন করে অন্য কর্মসূচিও আসতে পারে।

বিএনপি নেতারা বলছেন, সরকারের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, তারা বিএনপিকে বাইরে রেখে ফের একতরফা নির্বাচনের পথে হাঁটছে। সে কারণে অবাধ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের সংলাপের প্রস্তাব সরকার প্রত্যাখ্যান করেছে। বিএনপির নির্বাচন করার মতো যোগ্য নেতাদের একের পর এক সাজা দেওয়া হচ্ছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মুক্তিরও কোনো লক্ষণ নেই। গ্রেপ্তার এড়াতে অন্য নেতারা আত্মগোপনে। অর্থাৎ কৌশলে বিএনপিকে নির্বাচনী মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এদিকে বিএনপিও একতরফা তপশিল প্রত্যাখ্যান করে সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। তবে সরকার শেষ পর্যন্ত একতরফা নির্বাচনের পথে হাঁটলে তা বয়কট করে বিএনপিকে ভোট ঠেকানোর আন্দোলনে নামতে হতে পারে।

একদফা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আজ ভোর ৬টায় অষ্টম দফার দেশব্যাপী ২৪ ঘণ্টা অবরোধের কর্মসূচি শেষ হয়েছে। এদিকে, আজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তৃতীয় দফায় হরতাল পালিত হবে। এর আগে গত ২৯ অক্টোবর থেকে সাত দফায় দেশব্যাপী ১৫ দিন অবরোধ এবং দুই দফায় তিন দিন হরতাল করেছে বিএনপি ও এর মিত্ররা।

বিএনপি ও যুগপৎ আন্দোলন সূত্র জানিয়েছে, মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় শেষ হলে একদফার আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে দুই পর্বে কর্মসূচি দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। কর্মসূচির প্রথম পর্ব হচ্ছে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত। দ্বিতীয় পর্ব হলো নির্বাচনের প্রচার শুরুর সময় ১৮ ডিসেম্বর থেকে ৭ জানুয়ারি ভোটের দিন পর্যন্ত।

জানা গেছে, হরতাল-অবরোধের বিকল্প হিসেবে একাধিক প্রস্তাবনা এখন আলোচনার টেবিলে রয়েছে। এর মধ্যে জনসম্পৃক্ত কর্মসূচিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশের চিন্তা রয়েছে বিএনপির। আগামী তিন সপ্তাহ এমন কর্মসূচি চলতে পারে। এই সময়ের মধ্যে যুগপতে থাকা দলগুলোর অঙ্গ সংগঠনকে নিয়ে ঢাকায় নারী সমাবেশ, যুব সমাবেশ, শ্রমিক সমাবেশ, ছাত্র সমাবেশের কথা ভাবছে বিএনপি। এর মাঝে মাঝে দু-এক দিন করে হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি আসতে পারে। এ ছাড়া বিএনপির কারাবন্দি, গুম-খুন ও নির্যাতনের শিকার নেতাকর্মীর স্বজনদের নিয়ে ঢাকা ছাড়াও সারা দেশের জেলা শহরেও পর্যায়ক্রমে মানববন্ধনের আয়োজন করা হতে পারে। সেখান থেকে জেলা ও দায়রা জজ বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হবে।

সরকার শেষ পর্যন্ত একতরফা নির্বাচনের পথে হাঁটলে তা বয়কট করে ভোট ঠেকানোর আন্দোলনে নামতে পারে বিএনপি। সেক্ষেত্রে ভোটের কয়েকদিন আগ থেকে ফের হরতাল-অবরোধের কর্মসূচিতে যেতে পারে দলটি। এর সঙ্গে অসহযোগ আন্দোলনেও নামতে পারে।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন যুগপৎ আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র গণতন্ত্র মঞ্চ। নতুন কর্মসূচি প্রসঙ্গে মঞ্চের সমন্বয়ক ও জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বলেন, আমরা দলীয় সরকারের অধীনে আসন্ন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ইতোমধ্যে প্রত্যাখ্যান করেছি। বৃহস্পতিবার (আজ) আমরা যুগপৎ ও যুগপতের বাইরে আন্দোলনরত সব রাজনৈতিক দল জাতির সামনে আবার এ বিষয়ে পরিষ্কারভাবে বলব। সরকার যে সাজানো একতরফা নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে, অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ও জোট তা প্রত্যাখ্যান করছে। তিনি বলেন, আমরা এখন জনগণকে চলমান কর্মসূচিতে আরও বেশি হারে সম্পৃক্ত করে কীভাবে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা যায়, সেই কর্মকৌশল নির্ধারণ করছি। নতুন কর্মসূচি আমরা অচিরেই ঘোষণা করব। স্বপন বলেন, জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা ভোট দিতে যাবেন না, নির্বাচনী নাটকে আপনারা অংশ নেবেন না।

গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, একদফা দাবিতে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। পুরো পরিস্থিতি আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে। সেক্ষেত্রে বৃহস্পতিবার হরতাল শেষে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা না-ও দেওয়া হতে পারে। পরদিন শুক্রবার নতুন কর্মসূচির ঘোষণা আসতে পারে।

বার্তা বাজার/জে আই