সারা দেশে আবারও গুম শুরু হয়েছে মন্তব্য করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, দেশের তৈরি পোশাক ব্যবসা অন্য দেশের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত হচ্ছে। রোববার (১১ নভেম্বর) বিকালে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ করেন তিনি।

রিজভী বলেন, সরকার অত্যন্ত সুকৌশলে দেশের সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বড় খাত পোশাক শিল্প ধ্বংসের নীল-নকশা বাস্তবায়ন করছে। তিনি (শেখ হাসিনা) পুনরায় ’৭৪ এর মতো দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করতে চান, দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করতে চান। বাংলাদেশের মালিকরা গত শনিবার সরকারের প্ররোচনায় ১৫০টি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। ন্যায্য দাবি আদায়ের বিক্ষোভের দায়ে ১১ হাজার শ্রমিককে অভিযুক্ত করে মামলা করেছে দলদাস পুলিশ সরকারের নির্দেশে। গোটা অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। জনগণ বিশ্বাস করে রেডিম্যান্ট গার্মেন্টস ব্যবসায় এখন অন্য দেশের হাতে তুলে দিয়ে অবৈধ ক্ষমতার থাকার গ্যারান্টি চায় শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, বিরোধী দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মী শুধু নয়, পেশাজীবী, শ্রমজীবী, কর্মজীবী এমনকি গার্মেন্টস শ্রমিকরা পর্যন্ত এই ফ্যাসিস্টদের কাছে নিরাপদ নয়। বেতন-ভাতা বৃদ্ধির ন্যায্য দাবিতে আন্দোলনরত গার্মেন্টস শ্রমিকদের ওপর পুলিশ লেলিয়ে দিয়ে আজ পর্যন্ত ৪ জন শ্রমিকদের হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ লেলিয়ে দিয়ে গাজীপুরে গার্মেন্টস কর্মী আঞ্জুয়ারা মো. জামালউদ্দিনকে হত্যা করা হলো? আঞ্জুয়ারা রাষ্ট্র ক্ষমতার ভাগ চায়নি, সে শুধু স্বামী সন্তান নিয়ে একটু সুখে শান্তিতে বেঁচে থাকার দাবি করেছিল, এ জন্য তাকে জীবন দিতে হয়েছে।

রিজভী বলেন, নব্য নাতসি কায়দায় সরকার অতীতের মতো আবার নতুন করে গুমের উৎসব শুরু করেছে। প্রতিটি শহর-বন্দর জনপদে এখন সাদা পোশাকধারীদের হাঁড় হিমকরা আতঙ্ক। চারিদিকে ভয়ার্ত পরিবেশ যেন হানাদার বাহিনী আক্রমণ করেছে বাংলাদেশের বুকে। শেখ হাসিনার গুম বাহিনী ভয় দেখিয়ে মায়েরা তাদের বাচ্চাদের এখন ঘুম পাড়াচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে দেশের যে পরিবেশ, সেখানে এই কথাগুলো মনে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, চারিদিকে শুধু জমাট বাধা কান্নার পাহাড়। প্রতিদিনই সেই কান্নার পাহাড় আরো উঁচু হচ্ছে। ১৫ বছর ধরে সেই কান্নার পাহাড় থেকে চুইয়ে নামছে আর্তনাদ। আর গল গল করে উঠছে ক্রসফায়ারে লোকদের আর গুম হওয়া মানুষের অভিশাপ। রাতে-দিনে তারা (সাদা পোষাকধারীরা) কালোকাঁচ ঢাকা মাইক্রোবাসে নাতসি বাহিনীর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছোঁ মেরে তুলে নিচ্ছে গণতন্ত্রকামীদের। তাদের হাতে সাধারণ মানুষও রেহায় পাচ্ছে না। র‌্যাব-পুলিশের নামধারীরা আওয়ামী পুলিশ লীগ আন্দোলনরত বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের না পেলে তাদের পিতা-মাতা, পুত্র-সন্তান, ভাই-বোন এবং আত্মীয় স্বজনদেরও ধরে নিয়ে অদৃশ্য করে রাখছে, তুলে নিয়ে গিয়ে অস্বীকার করা হচ্ছে।

এভাবে বিনা গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, কোথাও কোথাও জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের মতো জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করছে এই নামধারী আওয়ামী পুলিশ লীগ। কোথাও কোথাও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের না পেয়ে বাথরুম থেকে পানি এনে বাসার সব বিছানায় ঢেলে দিয়েছে তারা। সারা দেশে দলদাস পুলিশ বাহিনী বিনা মামলায় বিনা ওয়ারেন্টে বা গায়েবি মামলায় পাইকারিহারে হাজার হাজার বিএনপি নেতাকর্মী গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করছে। তুলে নিয়ে গিয়ে বন্দি অবস্থায় অনেককে কোমর থেকে পায়ের তালু অবধি হাতুড়িপেটা করে অচল করে দেওয়া হচ্ছে, গুলি করে পঙ্গু করে দেওয়া হচ্ছে , যা চরম মানবতাবিরোধী, যা বাংলাদেশ স্বাক্ষরকৃত জাতিসংঘের কমিটি অ্যাগেইনস্ট টর্চার (নির্যাতন বিরোধী কমিটি-ক্যাট) এবং নিপীড়ন বিরোধী আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট টর্চার (ইউএটি) অনুযায়ী একটি গণবিরোধী ভয়াবহ অপরাধ। যা আস্তর্জাতিক আদালতে বিচার এবং কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আন্তর্জাতিকভাবে ধিকৃত এই ফ্যাসিস্ট সরকারকে অবৈধভাবে ক্ষমতায় রাখতে যারা গণতন্ত্রকামীদের গুম-খুন-গ্রেপ্তার-মিথ্যা মামলায় জড়িত করছে তাদেরকে সাবধান এবং হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্দেশে রিজভী বলেন, আপনারা ভোটের অধিকার আদায়ে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের প্রতিপক্ষ হবেন না। গণতন্ত্রকামী মানুষের জোয়ার ঠেকাতে পারবে না। যে সব সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এখন পুলিশ কর্মকর্তা হয়ে গণতন্ত্রকামীদের হুমকি দিচ্ছেন, সবাইকে গ্রেপ্তার করা হবে বলে ভয় দেখাচ্ছেন তারা গণবিরোধী অবস্থান থেকে সরে আসুন। অন্যথায় পুলিশের মর্যাদাপূর্ণ ইউনিফর্ম খুলে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে রাজপথে নামুন। দুঃশাসনে পিষ্ট প্রতিবাদী মানুষকে নিশ্চিহ্ন করতে দলীয় ও অবৈধ রাষ্ট্রশক্তির হয়ে বেপরোয়া আচরণ করবেন না। আপনারা কে কি করছেন বাংলাদেশের জনগণ সব হিসাব রাখছে। গণঅভ্যূত্থানে আপনাদেরও পরিণতি কী হবে তা জনগণ নির্ধারণ করে রাখছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ৩৬৫ জনের অধিক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বিভিন্ন মামলায় ১ হাজার ৪৮৫ জনের অধিক নেতা-কর্মী।

বার্তাবাজার/এম আই