গ্রামীণ জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা সহায়তা প্রদান করা রাষ্ট্রের একজন গ্রাম পুলিশের দায়িত্ব যেখানে অতীব গুরুত্বপূর্ণ অথচ সেই গ্রামপুলিশের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে নিজ বাড়ি ঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হচ্ছে একটি স্বর্ণকার পরিবারকে।

রাতের অন্ধকারে বাড়িতে হামলা চালানো, শিশু বাচ্চাকে হত্যার চেষ্টা, বৃদ্ধাকে পিটিয়ে পা ভেঙে দেওয়া, লাথির আঘাতে অন্তঃস্বত্তা গৃহবধূর গর্ভের ভ্রুণ নষ্ট করে দেওয়া সহ নানা অত্যাচারের অভিযোগ উঠেছে বুড়িরচর ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার) আবুল হাসেম সহ তার পরিবারের বিরুদ্ধে। এতো কিছুর পরও কোন ন্যায় বিচার না পেয়ে অনেকটা অসহায় হয়ে বাড়ি ছাড়া অবস্থায় নোয়াখালীর হাতিয়ার বুড়িরচর ইউনিয়নের উত্তর সাগরিয়া গ্রামের স্বর্ণকার অলি উদ্দিনের।

জানা যায়, বুড়িরচর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের উত্তর সাগরিয়া গ্রামে বাবা-মাকে নিয়ে বাড়িতে বসবাস করে আসছিলেন স্বর্ণকার অলি উদ্দিন। বাড়ির কিছু অংশ নিয়ে প্রতিবেশী গ্রাম পুলিশ আবুল হাসেমের সাথে তাদের বিরোধ চলে আসছিলো। এর সূত্র ধরে গত ৫ জুলাই তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে আবুল হাসেমের পরিবারের সদস্যরা এসে অলি উদ্দিনের পরিবারের ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে অলি উদ্দিনের স্ত্রী তানিয়া বেগমকে পিটিয়ে আহত করে। এতে অন্তঃস্বত্তা তানিয়ার ৫মাসের গর্ভের ভ্রুণ নষ্ট হয়ে যায়। আহত অবস্থায় তানিয়াকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পরে তানিয়া বাদি হয়ে গ্রামচৌকিদার আবুল হাসেমকে ১নং আসামী করে আরও ৫ জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পিবিআইকে তদন্ত করার নির্দেশ দেয়।

তানিয়া জানান, তিন চারজন ঘরে প্রবেশ করে রান্না ঘরের মধ্যে তাকে পিটিয়ে আহত করে। এসময় স্বামী সহ পরিবারের সদস্যরা বাজারে ছিলো। তাদের লাথিতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার গর্ভের ভ্রুণ নষ্ট হয়ে যায়। এই ঘটনায় মামলা করার পর তারা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে পুনঃরায় রাতের অন্ধকারে হামলা করছে।

প্রতিবেশী জামসেদ নামের একজন জানান, দু-একদিন পর পর রাতের আঁধারে প্রতিপক্ষরা ইট পাথর মেরে অলি উদ্দিনের বাসায় হামলা চালায়। এতে ঘরের জানালার গ্লাস ভেঙে যায়। একেকদিন ঘরের একেক পাশ থেকে এই হামলা চালানো হয়। গভীর রাতের পরিবারের সদস্যদের চিৎকারে লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। গত দুই মাস ধরে প্রায় রাতে এই হামলা চালানো হয়। ঘরে থাকা শিশুদের চিৎকারে প্রতিবেশিরাও ঘুমাতে পারে না।

অলি উদ্দিনের স্বর্ণ দোকানের কর্মচারী আব্দুর রহিম নামের আরও একজন জানান, গত সপ্তাহে রাতে দোকানের কাজ শেষ করে বাড়িতে এসে সামনের বারান্ধার খাটে ঘুমাচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ রাত ১টার সময় ঘরের বারান্দার দক্ষিন পাশের জানালায় ইট মেরে ভাঙচুর করা হয়। মুহূর্তে গ্লাসের টুকরো গুলো খাটের উপর এসে পড়ে। কোন মতে দৌড়ে প্রাণে রক্ষা পান তিনি। পরে তার চিৎকারে পরিবারের সদস্যরা এসে বাতি জালিয়ে একজনকে পালিয়ে যেতে দেখেন।

অলি উদ্দিনের বৃদ্ধ পিতা মোস্তাফিজ জানান, রাতে ঘুমানো যায় না। প্রায় রাতে তারা ইট পাথর মারে ঘরের দরজা জানালায়। এসময় ভয়ে ঘরে থাকা শিশুরা জ্ঞান হারানোর মত অবস্থা হয়। এসব বিষয়ে চেয়ারম্যান মেম্বার ও থানায় অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাওয়া যায় নি। গ্রামচৌকিদার হওয়ায় তার সাথে থানা পুলিশ ও চেয়ারম্যান মেম্বারদের শখ্যতা ভালো।

তিনি আরও জানান, গত তিন মাস আগে পারিবারিক কলহের সময় তার স্ত্রী বাধা দিতে গেলে তাকে ধাক্কা দিয়ে পেলে দেয়। এতে তার বামপায়ের ঘোড়ালি ভেঙে যায়। এখন ঘরের মধ্যে লাঠি ভর দিয়ে হাটতে হয় তাকে।

স্বর্ণকার অলি উদ্দিন জানান, তাদের হামলা থেকে রেহায় পায়নি শিশুরাও। গত ১ আগষ্ট পরিবারের শিশু সন্তান তামিম (৫) অন্যদের সাথে খেলা করতে বাড়ির দরজায় গেলে চৌকিদারের মেয়ের জামাই তাকে পানিতে ফেলে দেয়। তাৎক্ষনিক অন্যরা দেখে ফেলায় তাকে পানি থেকে উদ্ধার করা হয়। এই বিষয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়। তাদের এই অত্যাচারে এখন বাড়িতে কেউ নিরাপদ নয়। গত এক সপ্তাহ ধরে স্ত্রী ও সন্তানদের শ্বশুরবাড়ীতে রেখে এসেছে বলে জানান তিনি।

তিনি আরও জানান, চৌকিদারের মেয়ের জামাই আব্দুল আলী (৩৭)। একসময় হাতিয়ার জলদস্যু মুন্সিয়া বাহিনীর সদস্য ছিল সে। তাকে দিয়ে চৌকিদার এসব অপকর্ম করান বলে অভিযোগ করেন অলি উদ্দিন।

এসব বিষয়ে গ্রাম পুলিশ আবুল হাসেম জানান, অলিদের সাথে বাড়ির অংশ নিয়ে বিরোধ আছে আমাদের। কিন্তু রাতের আধারে কে বা কারা তাদের ঘরে হামলা করে তা তার জানা নেই। এসব ঘটনায় তার পরিবারের কেউ জড়িত নয়, অন্যায়ভাবে তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দেওয়া হয়েছে।

বুড়িরচর ইউপি চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলাম বলেন, দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ দীর্ঘদিনের। রাতের আধারে হামলার বিষয়টি আমাকে জানিয়েছে অলি উদ্দিন। কিন্তু ঘটনার সাথে জড়িত কাউকে দেখতে না পারায় মীমাংসা করা যায় নি।

এসব বিষয়ে অলি উদ্দিনের স্ত্রীর দেওয়া মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (পিবিআই উপ-পরিদর্শক) নজরুল ইসলাম বলেন, তানিয়া বেগম বাদী হয়ে আদালতে একটি মামলা করে। তাতে গর্ভের ভ্রুণ নষ্ট হওয়া সহ বিভিন্ন অভিযোগ করা হয়। ইতিমধ্যে হাসপাতাল থেকে বাদীর মেডিকেল সার্টিফিকেট সহ বিভিন্ন কাগজপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্ত চলমান রয়েছে।

বার্তা বাজার/জে আই