বরিশালে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ছাত্রদলের হামলার শিকার হয়েছেন দুই সাংবাদিক। বৃহস্পতিবার দুপুরে বরিশাল জজকোর্টের প্রধান ফটকের সামনে তাদের পিটিয়ে আহত করা হয়। এসময় এক সাংবাদিকের মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।

জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল রাঢ়ির নেতৃত্বে এ হামলা করা হয় বলে অভিযোগ সাংবাদিকদের। এ ঘটনায় বিচারের দাবিতে সাংবাদিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন ভুক্তভোগী সাংবাদিক ও সহকর্মীরা। আহতরা হলেন— দৈনিক ভোরের আলো পত্রিকার ফটোসাংবাদিক এন আমিন রাসেল ও দৈনিক বরিশাল মুখপত্র পত্রিকার রিপোর্টার মনিরুল ইসলাম।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার সময় ছাত্রদল নেতারা তাদের ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে আক্রমণ করে। এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করেছেন উপস্থিত সাংবাদিকরা। এতে দেখা গেছে, বরিশাল জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল রাঢ়ির নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন যুবক সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে।

তারা হলেন— বরিশাল জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল রাঢ়ি, বরিশাল মহানগর ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক ও ১০ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সহসভাপতি মো. মাসুম হাওলাদার মাসুম, মহানগর ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আলমাস, জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন ও রাজিব আহমেদ, জেলা ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসাইন, জেলা ছাত্রদলের সদস্য জুয়েল এবং তাদের সহযোগী নাইম, শাওন, জাহিদ ও শাহিনসহ আরও ৭-৮ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি।

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, আদালতের প্রধান ফটকে পুলিশের একটি গাড়ি আটকে দেয় ছাত্রদল নেতারা। তারা পুলিশের বিরুদ্ধে এক ব্যক্তিকে রক্ষার অভিযোগ তুলে পুলিশের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় সাংবাদিকরা সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে তাদের আক্রমণ করা হয়। একপর্যায়ে সাংবাদিকদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

হামলায় আহত দুই সাংবাদিক বর্তমানে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। চিকিৎসকদের মতে, এন আমিন রাসেলের হাতে ও কাঁধে গুরুতর আঘাত রয়েছে, যা তার ক্যামেরা পরিচালনায় প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে মনিরুল ইসলামের পিঠ ও মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

সাংবাদিকদের দাবি, হামলার মূল কারণ আব্বাস হাওলাদার নামে এক মামলার বাদীকে জোর করে তুলে নিতে চেয়েছিল ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। মুলাদী উপজেলার বাসিন্দা আব্বাস হাওলাদারের বাবা স্থানীয় বিএনপি নেতা আব্দুর রব হাওলাদারকে গত বছর প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এই হত্যা মামলার বাদী হিসেবে আদালতে হাজির হয়েছিলেন আব্বাস।

তিনি অভিযোগ করেন, ছাত্রদল নেতারা তাকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন এবং হামলার সময় তাকে পুলিশ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। হামলার ঘটনার পরপরই বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আনিসুর রহমান স্বপন ও সাধারণ সম্পাদক খালিদ সাইফুল্লাহ নেতৃত্বে সাংবাদিকরা বরিশাল আদালত এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন। এতে কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পরে পুলিশের আশ্বাসে সাংবাদিকরা অবরোধ তুলে নেন।

হামলার ঘটনায় ছাত্রদল নেতারা কোনো দায় স্বীকার করেননি। জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল রাঢ়ি দাবি করেন, ‘সাংবাদিকরা ফ্যাসিস্টদের সহযোগিতা করছে’ এবং তারা কোনো অন্যায় করেননি। অন্যদিকে, বিএনপির বরিশাল মহানগরের সাবেক সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট মীর জাহিদুল কবির জাহিদ বলেন, ‘এই ঘটনায় বিএনপি কোনো দায় নেবে না। তবে আমরা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সিনিয়র নেতাদের বিষয়টি জানিয়েছি।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর বরিশাল জেলার সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, ছবি ধারণ করা গণমাধ্যমকর্মীরা দায়িত্ব। কোনো গণমাধ্যমকর্মীকে তার দায়িত্ব পালনে বাঁধা দেওয়া গুরুতর অপরাধ। এতে অবাদ তথ্যপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, যা রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ ঘটনায় জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার দাবি করেন তিনি। বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মিজানুর রহমান জানান, আমরা ঘটনাস্থল থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করেছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।