ব্যাংক খাত স্থিতিশীল রাখতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেকর্ড ৩০ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা ধার বা তারল্য সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যা তার আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৩১ শতাংশ বেশি।
২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংকগুলোকে ১৩ লাখ ৮ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। খাত-সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, গত অর্থবছর ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বেশি তারল্য সংকট ছিল। ডলার সংকট থাকার কারণে ব্যাংকগুলোর কাছে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়। এতে করে ব্যাংকগুলোর হাতের টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চলে আসে। বিপুল পরিমাণ তারল্য বাংলাদেশ ব্যাংকে চলে আসার কারণে ব্যাংকগুলোতে সংকট দেখা দেয়।
তাদের সংকট কাটাতে ব্যাংকগুলো রেকর্ড তারল্য সহায়তা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়া সরকারের ব্যাংক ঋণ নেওয়ার কারণেও ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট তৈরি হয়। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সহায়তা নিয়ে চলতে হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছর রেপোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে ১৬ লাখ ৭০ হাজার ৮১১ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, তার আগের অর্থবছরে ছিল ৬ লাখ ১১ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। আর অ্যাসিউরড লিক্যুইডিটি সাপোর্ট বা এএলএসের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে ১৩ লাখ ৫৮ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। তার আগের অর্থবছর এই ধারের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৯৭ হাজার ১২৩ কোটি টাকা।
রেপো হলো– ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বল্পমেয়াদি ধার দেওয়ার উপায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ট্রেজারি বিল ও বন্ডে থাকা সিকিউরিটিজের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে ধার দিয়ে থাকে। রেপোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সব ব্যাংক ধার নিতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত ওভার নাইট একদিন, ৭, ১৪ এবং ২৮ দিনের জন্য রেপো সুবিধা প্রদান করে।
আর এএলএসের মাধ্যমে শুধু প্রাইমারি ডিলার ব্যাংক (পিডি) ধার নিতে পারে। এই ধার সর্বোচ্চ ৯০ দিনের জন্য দেওয়া হয়। জানা যায়, সরকারের বিভিন্ন সময়ের ট্রেজারি বিল-বন্ডের অকশন হয়। এই অকশন থেকে কারো ট্রেজারি বিল বন্ড কেনার আগ্রহ না থাকলে, পিডি ব্যাংকগুলোকে তা কেনার জন্য বাধ্য করা হয়। এজন্যই এসব ব্যাংকে এএলএস সুবিধা দেওয়া হয়।
শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ বলেন, গত অর্থবছর সরকার ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে অনেক বেশি টাকা নিয়েছে। সরকার ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে টাকা তোলার কারণে এটা ব্যাংক খাত থেকে নন ব্যাংকিং চ্যানেলে চলে গেছে।
যে টাকাটা আবার একটা সময় দরকার পড়ছে। সরকার ট্রেজারি বিল-বন্ডের রেট সাড়ে ১২ শতাংশ দিয়েছে। যাদের টাকা নেই তারাও কিনেছে। এটা কেনার কারণ হলো ট্রেজারি বিল-বন্ডের আওতায় আবার রেপো এএলএসের মাধ্যমে ৪ শতাংশে সুদে তারল্য সহায়তা নেওয়া যাবে। যে বছর সরকারের ব্যাংক খাত থেকে ঋণ বেশি হবে সেসব বছরে হঠাৎ করে দেখা যায় রেপো ও এএলএস’র মাধ্যমে ধার বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণেও ধারের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ ঋণ নিয়ে অনেকে অর্থ পরিশোধ করেনি। তাই ব্যাংকগুলো তারল্য চাহিদা মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার করেছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহাবুবুর রহমান বলেন, আমাদের আন্তঃব্যাংক মার্কেট খুব বেশি শক্তিশালী নয়। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানাভাবে সহায়তা করে থাকে। যেখানে আমাদের সহায়তা প্রয়োজন এক লাখ কোটি টাকার সেখানে আন্তঃব্যাংক মার্কেট মাত্র ১০ হাজার কোটি টাকার।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে পরিস্থিতির কঠোরতার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ডলার বিক্রি করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সহায়তা করেছিল। এর ফলে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তারল্যের উপর সংকোচনমূলক প্রভাব পড়তে পারে, যার ফলে রেপো লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, অনিয়মের মাধ্যমে বেশকিছু ব্যাংক থেকে ঋণ বেরিয়ে গেছে। অনিয়মের খবর প্রকাশ পেলে এসব ব্যাংকের আমানতকারীরা তাদের আমানত তুলে ফেলেন। ফলে ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে ভুগতে থাকে। এখনও সেই পরিস্থিতি চলমান। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনেক ব্যাংকের ধার করে চলতে হচ্ছে।