২০, অক্টোবর, ২০১৮, শনিবার | | ৯ সফর ১৪৪০

নড়াইলের রিপোর্ট যদি মানসম্মত হয় আর নিয়মিত প্রকাশ হয়, তাহলেও কিন্তু বিপদ

উজ্জ্বল রায়, নড়াইল প্রতিনিধি: আপনার রিপোর্ট যদি মানসম্মত হয় আর নিয়মিত প্রকাশ হয়, তাহলেও কিন্তু বিপদ আছে। আপনার সহকর্মী হয়ে উঠবে আপনার প্রধান শত্রু। আপনার সাফল্য দেখে সহকর্মীর গায়ে জ্বালা ধরবে। সহকর্মী আপনাকে বিভিন্নভাবে হেনস্থা করবেন। যার অন্যায় অপকর্ম নিয়ে রিপোর্ট করবেন আপনার সহকর্মী তার সঙ্গে হাত মেলাবেন। রিপোর্টটি যদি মানসম্মত হয় তাহলে ডেস্কের দায়িত্বে থাকা অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা সেটা ফেলতে পারেন না। বরং গুরুত্ব সহকারে তা প্রকাশ করেন। তাই সব সময় মানসম্মত রিপোর্ট তৈরির পর তা অফিসে প্রেরণ করতে হবে। আমি সব সময় ভাল বিষয়টিকে গ্রহণ করে মন্দ বিষয়কে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। দীর্ঘদিন সংবাদকর্মী হিসেবে কাজ করার কিছু অভিজ্ঞতা নিয়ে আজকের এই লেখা। নড়াইলের সাংবাদিকদের সভ্য সমাজের অনেকেই সাংবাদিক হিসেবে মানতে চান না। কারণ অনেকে মনে করেন, সাংবাদিকতা বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি যাদের নেই, তারা সাংবাদিক নন। অনেকে আবার জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের রিপোর্টার বা সংবাদদাতা বলে অভিহিত করেন। নিয়মিত তথ্য সংগ্রহের পর খবর তৈরি করে অফিসে প্রেরণ করাই একজন সংবাদকর্মীর কাজ। এর মধ্যে সাংবাদিক, রিপোর্টার বা সংবাদদাতার মধ্যে পার্থক্য কি তা বুঝি না। পরিচয় নিয়ে যেহেতু কথা হচ্ছে, সেহেতু প্রয়োজনে নিজেকে ‘সংবাদকর্মী’ হিসেবে পরিচয় দেয়াই শ্রেয়। সাংবাদিকতা পেশা একটি অদ্ভুত নেশা। এই নেশায় আক্রান্ত হলে আর রক্ষা নেই। প্রতিদিন একটি রিপোর্ট তৈরি না করলে নেশাগ্রস্তদের মতো আপনাকে ছটফট করতে হবে। তবে সবদিকের তথ্য সংগ্রহের পর একটি মানসম্মত রিপোর্ট তৈরি করা খুবই কষ্টের কাজ। আপনার রিপোর্ট যদি মানসম্মত হয় আর নিয়মিত প্রকাশ হয়, তাহলেও কিন্তু বিপদ আছে। আপনার সহকর্মী হয়ে উঠবে আপনার প্রধান শত্রু। আপনার সাফল্য দেখে সহকর্মীর গায়ে জ্বালা ধরবে। সহকর্মী আপনাকে বিভিন্নভাবে হেনস্থা করবেন। যার অন্যায় অপকর্ম নিয়ে রিপোর্ট করবেন আপনার সহকর্মী তার সঙ্গে হাত মেলাবেন। সেক্ষেত্রে আপনাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতে কুন্ঠাবোধ করবে না। কেবল তাই নয়, আপনার বিরুদ্ধে পত্রিকা অফিসে ভুরি ভুরি অভিযোগ দিয়ে ভাবমূর্তি নিয়ে টানাটানি করবেন। এমনকি সহকর্মীরা অডিও রেকর্ড তৈরি করে আপনাকে চাঁদাবাজ সাজিয়ে সম্পাদককে অবহিত করতে পারে যে, আপনার প্রতিনিধির কারণে পত্রিকার ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিনে যাচাই-বাছাই না করে পত্রিকার নীতিনির্ধারকরা যদি আপনার ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে সেই হাউসে কাজ না করাই ভালো। মনে রাখতে হবে, নিজের যোগ্যতা ও স্বচ্ছতা থাকলে যেখানে কাজ করবেন সেখানেই আপনার জয় জয়কার। বর্তমানে অনেকে সাংবাদিকতা পেশাকে জাহির করে চলেন। নির্মাণ কাজে অনিয়ম বা দুর্নীতির তদন্ত করতে গিয়ে ক্যামেরা আর মোটরসাইকেল নিয়ে এমন অঙ্গভঙ্গি করেন যা দেখে উপস্থিত সবাই আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। এর মানে হলো- অবিলম্বে যোগাযোগ করেন অন্যথায় ঠিকাদারের সমস্যা হয়ে যাবে। আবার যথাসময়ে যোগাযোগ না করলে আক্রোশমূলক খবর প্রকাশের পর সংশ্লিষ্টদের হেনস্থা করা হয়। এটি কিন্তু সাংবাদিকদের কাজ নয়, সাংবাদিকতা একটি ছদ্মবেশী পেশা। সাংবাদিকরা গোপনে তথ্য সংগ্রহ করবেন। এখানে কি ঘটেছে বা হচ্ছে তা খবরের কাগজে পড়ে মানুষ চমকে উঠবেন। একজন সাংবাদিককে অনুসন্ধানী হতে হয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমস্যা ও সম্ভাবনাকে প্রাধান্য দিয়ে রিপোর্ট তৈরি করতে হয়। যিনি আপনার সোর্স হবেন, তার কথা শুনেই রিপোর্ট তৈরি করা যাবে না। ঘটনার সঙ্গে সোর্সের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় জড়িত থাকতে পারে। তাই খবর শুনে তা যাচাই-বাছাই করে সঠিক তথ্য দিয়ে একটি রিপোর্ট তৈরি করতে হবে। মনে রাখতে হবে, যে পেশায় আপনি কাজ করেন না কেন আগে আপনার ব্যক্তিত্বকে প্রাধান্য দিতে হবে। কারোর কথায় রিপোর্ট করে নিজের ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দেয়া যাবে না। আপনার কোনো সহকর্মী নিজেকে হিরো জাহির করতে তার পত্রিকায় আসল ঘটনার সঙ্গে মুখরোচক মনগড়া তথ্যজুড়ে সংবাদ প্রকাশ করছে। তা দেখে আপনার হাউসে থেকে উর্ধ্বতন কেউ ফোন করে আপনার কাছে কৈফিয়ত চাইছে। আপনি বিষয়টি এড়িয়ে না গিয়ে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন। এ রকম যদি একাধিকবার ঘটে আর আপনি তাকে বোঝাতে ব্যর্থ হন বা আপনার কথায় কতৃপক্ষ সন্তুষ্ট না হয় তাহলে সে হাউসে কাজ না করাই ভালো। আগেই বলেছি, সোর্স বা হাউসের কারও উস্কানিতে রিপোর্ট লিখে নিজের ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দেবেন না। তবে অফিসের কোনো স্পেশাল অ্যাসাইনমেন্ট থাকলে গুরুত্ব সহকারে সেই দায়িত্ব পালন করুন। অফিস থেকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা কি পরিমাণ পারিশ্রমিক পান তা সংশ্লিষ্টরা ভালো জানেন। যাদের পিছুটান আছে তাদের গ্রামীণ সাংবাদিকতা পেশায় না আসা উত্তম। অবশ্য আজকাল অনেকে সাংবাদিকতা পেশাকে লাভজনক মনে করেন। নড়াইলের সাংবাদিকতা পেশায় এসে অনেকে ভালো ব্যবসা-বাণিজ্যও করছেন। তাই দিন দিন এই মহান পেশাটি সাধারণ মানুষের কাছে ঘৃণায় পরিণত হয়ে যাচ্ছে। নড়াইলের সাংবাদিকতা বিষয়ে আমার কোন উচ্চতর ডিগ্রি নেই। কাজ করতে গিয়ে রিপোর্ট লেখার কৌশল কিছুটা রপ্ত করেছি। তবে এখনও শেখার অনেক বাকি আছে। এখনও প্রায় প্রতিদিনই নতুন কিছু শিখছি। কথায় আছে, শেখার শেষ নেই। দীর্ঘদিন কাজ করতে গিয়ে এই পেশায় যতটুকু অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। তার মধ্যে ভালো ও মন্দের মিশ্রণ রয়েছে।