২১, অক্টোবর, ২০১৮, রোববার | | ১০ সফর ১৪৪০

ওপারে মা, এপারে শিশুর আর্তনাদ

আপডেট: অক্টোবর ৯, ২০১৮

ওপারে মা, এপারে শিশুর আর্তনাদ

আরিয়ান। বয়স তিন ছুঁই ছুঁই। মা-বাবার আদর বুঝে উঠার আগেই ওপারে চলে গেলেন মা। বাবা দিয়েছে গা ঢাকা। অবুঝ শিশুটির ঠাঁই হয়েছে নানাবাড়িতে ছোট খালার কোলে। চার দিন ধরে মা-বাবার আদরবঞ্চিত শিশুটি বলছে ‘আমার মা নেই, মা মরে গেছে’।

আরিয়ানের মা মারা গেছেন, নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে- এ নিয়ে ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। আরিয়ানের মা বিষপানে আত্মহত্যা করেছেন বলে আরিয়ানের বাবা দাবি করলেও আরিয়ানের মামা মো. সুজন খান ৭ অক্টোবর একটি হত্যা মামলা করেছেন।

মামলার বিবরণে জানা গেছে, গত ৫-৬ বছর আগে দেলদুয়ার উপজেলার কাতুলী গ্রামের আশার সাথে পাশের ভেংগুলিয়া গ্রামের মো. সাইদুর রহমানের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে আশাকে প্রায়ই শারীরিক নির্যাতন করত। বিদেশে যাওয়ার কথা বলে প্রায়ই যৌতুক দাবি করত। মরিশাস যাওয়ার সময় আশাদের বাড়ি থেকে দেড় লাখ টাকাও নেয় সাইদুর। ৮ মাস পর দেশে ফিরে আবার মালদ্বীপ যাওয়ার কথা বলে দুই লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে। আশা আর সাইদুরের ঘরে আরিয়ানের জন্ম হওয়ায় নির্যাতন সহ্য করেও সংসার করত আশা।

গত ৫ অক্টোবর সকাল ৭টা। সাইদুর ফোন করে আশার ভাই সুজনকে বলে আশা বিষপান করে আত্মহত্যা করেছে। সুজন সাইদুরের বাড়ি গিয়ে সাইদুরকে সঙ্গে নিয়ে আশাকে মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক আশাকে মৃত ঘোষণা করেন। অনেক আগেই আশার মৃত্যু হয়েছে বলেও জানান চিকিৎসক। হাসপাতাল থেকেই সাইদুর গা ঢাকা দেয়। আশার জানাজায়ও সাইদুর অনুপস্থিত ছিল।

আশার মৃতদেহ ধোয়ার সময় শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। স্থানীয় নারীরা আশার মরদেহ ধোয়ার সময় ছবি তুলে রাখেন।
মামলার এজহারে আরও উল্লেখ রয়েছে, সুজন বাদী হয়ে দেলদুয়ার থানায় হত্যা মামলা করতে চাইলে মামলা নেয়নি পুলিশ। থানায় মামলা করতে ব্যর্থ হয়ে ঘটনার দুদিন পর ৭ অক্টোবর টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে আশার স্বামী সাইদুর রহমান, সাইদুরের পিতা মো. শাজাহান মিয়া ও সাইদুরের মা সোনা ভানু এই তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ওই দিনই মামলাটি ৭ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্তের রিপোর্ট দেয়ার নির্দেশ দিয়ে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করে আদালত।

নিহত আশার ভাই সুজন খান বলেন, যৌতুকের দাবিতে আমার বোনকে প্রায়ই শারীরিক নির্যাতন করত সাইদুর। নির্যাতনের কথা মাঝেমধ্যেই পরিবারের কাছে জানাত আশা। শিশু আরিয়ানের কথা ভেবে স্বামী সংসার ছাড়েনি আশা। তার দাবি, তার বোনকে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। আশার মৃত্যুর পরই সাইদুর মালদ্বীপ চলে যাবে এমন দিন দেখেই আশাকে হত্যা করা হয়েছে বলে মনে করেন সুজন।

সুজনের দাবি, আশার শরীরের পেছনের দিকে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। যার ছবি সংগ্রহে রেখেছেন। আঘাতের চিহ্নও প্রমাণ করবে আশাকে হত্যা করা হয়েছে। সাইদুর মালদ্বীপ চলে গেলে আশা হত্যার বিচার নিয়েও সংশয় প্রকাশ করে বোনের হত্যার বিচারও দাবি করেন সুজন।

সুজন আরও বলেন, দেলদুয়ার থানায় হত্যা মামলা না নেয়ায় তিনি আদালতে মামলা করেছে। যা এখন সিআইডির তদন্তে রয়েছে।

আশার স্বামী সাইদুর রহমানের মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে প্রায়ই নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। মঙ্গলবার ফোনে আশার মৃত্যু কবে বা কীভাবে হয়েছে- জানতে চাইলে তার স্ত্রীর মৃত্যুর তারিখটি ভুলে গেছেন বলে ফোনটি বন্ধ করে দেন সাইদুর।

এদিকে সাইদুরের বাড়িতেও খোঁজ নিয়ে সাইদুরের সন্ধান পাওয়া যায়নি। স্ত্রী আশার মৃত্যুর পর থেকে সাইদুরকে এলাকায় দেখা যায়নি বলেও জানান স্থানীয়রা।

দেলদুয়ার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ.কে সাইদুল হক ভুঁইয়া বলেন, আশার মৃত্যুর পর আশার স্বজনরা থানায় এসে বলেছেন, মির্জাপুর কুমুদীনি হাসপাতালের চিকিৎসক বলেছেন- আশা বিষপানে মৃত্যুবরণ করেছে। আপাতত জিডি করে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের পর মামলা করতে আসার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত আশার স্বজনদের পক্ষ থেকে থানায় মামলা করতে কেউ আসেনি।