১৪, ডিসেম্বর, ২০১৮, শুক্রবার | | ৫ রবিউস সানি ১৪৪০

১০ বছরে অঢেল সম্পদের মালিক সাংসদ হাবিবর দুদকে অভিযুক্ত হয়ে এবারও নৌকার কান্ডারী

আপডেট: ডিসেম্বর ৮, ২০১৮

১০ বছরে অঢেল সম্পদের মালিক সাংসদ হাবিবর দুদকে অভিযুক্ত হয়ে এবারও নৌকার কান্ডারী

শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত ৩০ ডিসেম্বর। এ নির্বাচনকে ঘিরে সরকার দল ও বিরোধী ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা মনোনয়ন যুদ্ধে অবতীর্ণ। ঘোষিত তফশীল অনুযায়ী স্ব-স্ব প্রার্থীরা তাদের মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট রির্টাণিং কর্মকতার দপ্তরে। সাথে সংযুক্ত করেছে তার ব্যক্তি আয়-ব্যায়সহ সম্পদের হলফনামা। সেই হলফনামায় বর্ণিত তথ্যাদির আলোকে বগুড়া-৫ শেরপুর-ধুনট আসনের সরকার দলীয় আওয়ামীলীগ প্রার্থীর বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সাংসদ হাবিবর রহমানের ১০ বছর আগে নির্ভরশীলদের কাছ থেকে ধারের টাকায় নির্বাচন করেছেন। তখন তাঁর কাছে নগদ টাকা ছিল ২ লাখ ৭৭ হাজার ৪৭৫। এখন জমা টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৫১ লাখ ৫৭ হাজার ৬১১ টাকা। সাংসদ হাবিবরের বিরুদ্ধে টিআর, কাবিখা, নিয়োগ-বাণিজ্য, টেন্ডার-বাণিজ্য ও সামাজিক বনায়নসহ বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির মাধ্যমে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ভিত্তিতে দুদকে অভিযোগ হলেও বর্তমানে আবারও নৌকার কান্ডারি হয়ে এ আসনে নির্বাচনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ায় নৌকার বিজয় নিয়ে সংশয় রয়েছে সচেতনমহলে।

তথ্য অনুসন্ধানে সাংসদ হাবিব তার নিজের নামে ১০ বছর আগে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ছিল ৩৫ লাখ ৭২ হাজার টাকার। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ১৬ লাখ ৪৫ হাজর ৯৪৮ টাকা। ১০ বছর আগে তাঁর কাছে নগদ ছিল ২ লাখ ৭৭ হাজার ৪৭৫ টাকা, ব্যাংকে দেড় লাখ এবং বন্ড ও শেয়ারবাজারে ২৫ লাখ টাকা। এখন নগদ টাকার পরিমাণ ৫৪ গুণ বেড়েছে। ব্যাংকে জমা রয়েছে আরও ৬০ লাখ ২৯ হাজার ৭০৪ টাকা। বন্ড ও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ রয়েছে আরও ৪০ লাখ টাকা।

১০ বছর আগে তাঁর নিজের কোনো গাড়ি থাকায় চলাফেরা করতেন স্ত্রীর গাড়িতে। এখন ৬৬ লাখ ২৩ হাজার টাকার দামি গাড়িতে চড়েন। আগে হাবিবরের নিজ নামে কোন লাইসেন্সধারী কোনো অস্ত্র না থাকলেও এখন রয়েছে। এখন একটি বন্দুক ও পিস্তল সঙ্গে রাখেন তিনি। সাংসদ হওয়ার আগে তিনি ঢাকায় একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করলেও এখন ঢাকার অদূরে সাভারে আরও একটি ফ্ল্যাটের মালিক ।

সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) ও ক্ষমতাসীন দলের সাংসদ হাবিবর রহমানের স্ত্রী খাদিজা বেগমের সম্পদও বেড়েছে ১০ বছরে প্রায় ৫ গুণ। ১০ বছর আগে নির্ভরশীলদের নামে জনতা ব্যাংকে ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ ছিল। তবে একাদশ নির্বাচনের হলফনামায় তিনি নির্ভরশীলদের কোনো ঋণের কথা উল্লেখ করেননি।

২০১৮ ও ২০০৮ সালে বগুড়া-৫ আসনে দাখিল করা হলফনামা অনুসন্ধানে জানা গেছে সম্পদের এসব তথ্য। এবারের হলফনামায় সাংসদ হাবিবর রহমান তাঁর বর্তমান অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৩ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজার ৩১৫ টাকা উল্লেখ করেছেন। তাঁর স্ত্রী খাদিজা বেগমের অস্থাবর সম্পদ ৬৯ লাখ ৬২ হাজার ৯২৫ টাকা। হাবিবরের স্থাবর সম্পদের মধ্যে ৫০ হাজার টাকা মূল্যের ১০ বিঘা কৃষিজমি। আর এখানেও তথ্য অসঙ্গতি রেখেছে। কারণ বর্তমান বাজারে সাংসদ হাবিবরের ওই ১০ বিঘা কৃষি জমির মুল্য প্রায় কোটি টাকার উপরে। ৯৩ লাখ ৩৫ হাজার ৬৩৩ টাকা মূল্যের ঢাকার নিকুঞ্জে একটি ফ্ল্যাট এবং সাভারে বিসিএস পুলিশ অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশেনের আবাসিক এলাকায় একটি ফ্ল্যাট। তাঁর স্ত্রীর রয়েছে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৬০০ টাকা মূল্যের সাড়ে ৩ বিঘা কৃষিজমি। তবে ২০০৮ সালের হলফনামায় স্ত্রীর কোনো কৃষিজমি ছিল না।

২০০৮ সালে হাবিবরের কোনো দায়দেনা না থাকলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ৪৩ লাখ ৭ হাজার ১৯৮ টাকা দায় থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। এবারে অস্থাবর সম্পদ বিবরণীতে সাংসদ ৩ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজার ৩১৫ টাকার কথা উল্লেখ করেছেন।

এদিকে বগুড়া-৫ আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য হাবিবর রহমান, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এলাকাবাসীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এমপি পরিবারের জায়গা-জমি ও ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত রেকর্ডের অনুলিপি চেয়ে বগুড়া জেলা রেজিস্ট্রার আব্দুস সালাম প্রামাণিককে চিঠি দিয়েছে দুদক। রেজিস্ট্রার আব্দুস সালাম ওই সব তথ্য চেয়ে ১২টি উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রারদের চিঠি পাঠিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, ২০১৭ সালের ৭ জুলাই বগুড়া-৫ নির্বাচনি এলাকার জনগণের পক্ষ থেকে দুদকের কাছে অভিযোগ করা হয় এমপি হাবিবর রহমান, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান টিআর, কাবিখা, নিয়োগ-বাণিজ্য, টেন্ডার-বাণিজ্য ও সামাজিক বনায়নসহ বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির মাধ্যমে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে দুদকের প্রধান কার্যালয় অনুসন্ধান শুরু করে। প্রধান কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক নুরুল ইসলাম গত ১৯ এপ্রিল বগুড়া জেলা রেজিস্ট্রারকে চিঠি দেন। চিঠিতে বলা হয় ‘জাতীয় সংসদ সদস্য হাবিবর রহমানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন সংক্রান্ত অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা প্রয়োজন। তাই সংসদ সদস্য, তার স্ত্রী খাদিজা হাবিব, ছেলে আসিফ ইকবাল সনি ও মেয়ে ফারহানা দিবার নামে জায়গা-জমি ও ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত রেকর্ডপত্রের ছায়ালিপি জমা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাংসদ হাবিবর রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি অভিজাত বংশীয় পরিবারের সন্তান। নিজের পরিবারের অনেক কিছুই আছে। ২০০৮ সালে সাংসদ হওয়ার পর পাওয়া শুল্কমুক্ত গাড়ি বিক্রি করেই দুই কোটি টাকা পেয়েছি।’ দুদকে সম্পদ অনুসন্ধানের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করতে প্রতিপক্ষরা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে দুদকে অভিযোগ করেছে। এদিকে, এমপি ও তার পরিবারের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তদন্ত শুরু হওয়ায় তৎকালীন সময়ে অভিযোগকারীদের মাঝে স্বস্তি দেখাসহ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানানো হলেও অজ্ঞাত কারণে দুদক কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় হতাশায় ভূগছেন সচেতন এলাকাবাসী।

নির্বাচনী হলফনামায় মিথ্যা তথ্য উল্লেখ বা অসঙ্গতি থাকলেও অঢেল সম্পদের মালিক সাংসদ হাবিবর রহমান একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মজিবর রহমান মজনুকে পিছনে ফেলে এবারও নৌকা প্রতিক বাগিয়ে নিয়ে নির্বাচনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। তবে দুদকে অভিযুক্ত ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভ্যন্তরীন কোন্দল নিয়ে সাংসদ হাবিবর রহমান এবার এ আসনে নৌকা প্রতিকে নির্বাচন করে কতটা সফল হতে পারবেন এমনটাই অভিমত ব্যক্ত করেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক।