২০, নভেম্বর, ২০১৮, মঙ্গলবার | | ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

রাজনীতির মাঠে কি সফল হবেন তারা?

আপডেট: নভেম্বর ১০, ২০১৮

রাজনীতির মাঠে কি সফল হবেন তারা?

রাত পোহালেই টেস্ট শুরু। হারলে ব্যর্থতার নতুন ইতিহাস রচিত হবে। ক্রিকেটের দুর্বলতম দল জিম্বাবুয়ের কাছে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হওয়ার রেকর্ডও সৃষ্টি হবে। জিতলে হবে মুখ রক্ষা। এমন এক কঠিন সমীকরণের টেস্ট-স্বাভাবিকভাবেই মিডিয়ার ফোকাসটা ঢাকা টেস্টের ওপর থাকার কথা।

শুধু তাই নয়, অন্য সময়ও কোনো টেস্ট শুরুর আগের দিন ক্রিকেট রিপোর্টার ও লিখিয়েরা ওই ম্যাচ নিয়েই ব্যতিব্যস্ত থাকেন। এর মধ্যে আজ ১০ নভেম্বর আবার বাংলাদেশের টেস্ট অভিষেকের দেড়যুগ পূর্তি। সেটাও একটা বিষয়। তা নিয়েও দু’চার কলম লেখার তাগিদ।

কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামার আগেই মিডিয়ার দৃষ্টি চলে গেল দুই দেশবরেণ্য ক্রিকেট তারকা মাশরাফি বিন মর্তুজা ও সাকিব আল হাসানের ওপর। শনিবার দুপুরে বাংলাদেশ দলের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের প্রেস কনফারেন্স শেষ হওয়ার আধঘণ্টার মধ্যেই শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে খবর এলো, মাশরাফি আর সাকিব নৌকা প্রতীক নিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করবেন। আগামীকাল রোববার দুজন মনোনয়নপত্রও কিনবেন।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্রের বরাত দিয়েই দুই দেশবরেণ্য ক্রিকেটারের সংসদ নির্বাচনে দাঁড়ানোর খবর চাওর হয়ে গেছে। মাশরাফি ও সাকিবের ঘনিষ্ঠ সূত্র তা নিশ্চিতও করেছে। মুহূর্তের মধ্যে সে খবর সারাদেশে ছড়িয়েও পড়ল।

মাশরাফি বিন মর্তুজা আর সাকিব আল হাসান- দুজনই দেশের শীর্ষ ক্রিকেট তারকা। বল ও ব্যাট হাতে দ্যুতি ছড়িয়ে, মাঠ মাতিয়ে দেশকে অনেক সাফল্য এনে দিয়ে বার বার বহুবার শিরোনাম হয়েছেন। তবে আজ তাদের পাদপ্রদীপের আলোয় উঠে আসা যে সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে।

শুধু শিরোনাম হওয়া বলাটা বোধকরি অনেক কম বলা হলো। ওই এক খবরে মুহূর্তে গোটা দেশের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র বনে গেছেন মাশরাফি-সাকিব। আজ দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামার আগে সবার মুখে মুখে মাশরাফি আর সাকিবের নাম। তাদের নিয়েই যত কথা। নানা জল্পনা-কল্পনা, গুঞ্জনের ফানুস বাতাসে।

অন্যদিন হলে শেরেবাংলার প্রেস বক্সজুড়ে থাকতো, প্রেস মিটে বাংলাদেশ অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ কি বললেন, তা নিয়ে কি কি অ্যাঙ্গেলে রিপোর্ট হয়- এসব। কিন্তু মাশরাফি আর সাকিবের মনোনয়নপত্র কেনার খবর নিশ্চিতের পর শেরেবাংলায় উপস্থিত সাংবাদিকদের মাঝে একটি প্রশ্ন বার বার উঠলো, ‘আচ্ছা, নামের পাশে সংসদ সদস্যের তকমা এঁটে কোনো ক্রিকেটার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন কখনও? এমপি হয়ে টেস্ট, ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি খেলার নজির আছে কোনো ক্রিকেটারের? মাশরাফি আর সাকিব যদি নির্বাচনে বিজয়ী হন, তখন প্লেয়ার্স লিস্টে তাদের নামের পাশে কি এমপি লেখা হবে?’

অনেক তথ্য-উপাত্ত ও রেকর্ড নখোদর্পণে এমন এক সহযোগী সাংবাদিক বলেন, সেই প্রাচীন আমল মানে উনবিংশ শতাব্দীতে কোন ব্রিটিশ, ভারতীয় কিংবা অস্ট্রেলিয়ান খেলে থাকতে পারেন।

তবে বর্তমান শতাব্দীতে একজন মাত্র ক্রিকেটার আছেন, যিনি সংসদ সদস্য হয়েও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন।

তিনি কে? কেউ একজন বলে ফেললেন, সম্ভবত সনাথ জয়সুরিয়া এমপি হয়েও টেস্ট-ওয়ানডে খেলেছেন। রেকর্ড ঘেঁটে বের হলো- হ্যাঁ, শ্রীলঙ্কার সাবেক অধিনায়ক ও তারকা সনাথ জয়সুুরিয়া ২০১০ সালে লঙ্কান জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাতারা জেলা থেকে নির্বাচন করে রেকর্ড পরিমাণ (৭৪৩৫২) ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। গায়ে সংসদ সদস্যের তকমা আঁটার পর আরও এক বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন জয়সুরিয়া।

শুধু এমপি নির্বাচিত হওয়াই নয়, শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজা পাকশের মন্ত্রিসভায় ডাক প্রতিমন্ত্রীও হন জয়সুরিয়া। নির্বাচিত হলে মাশরাফি আর সাকিবই হবেন জয়সুরিয়ার পর প্রথম ক্রিকেটার সংসদ সদস্য।

ক্রিকেটার হিসেবে দুজনই দেশসেরা, দেশবরেণ্য, জাতীয় বীর, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের শুভেচ্ছাদূত। তাই তাদের নিয়ে এমনিতেই রাজ্যের উৎসাহ-আগ্রহ সবার। আজ দুপুরে সংসদ নির্বাচন করার খবর চাউর হওয়ার পর মাশরাফি আর সাকিবকে ঘিরে দেশবাসীর উৎসাহ আরও বেড়ে গেছে। তাদের নিয়ে নতুন নতুন কথা, কৌতূহলী প্রশ্ন-‘ আচ্ছা, মাঠের সফল তারকা মাশরাফি আর সাকিব সংসদ সদস্য হিসেবে কেমন হবেন? বল ও ব্যাট হাতে মাঠ মাতানোর পাশাপাশি কি জনপ্রতিনিধি হিসেবেও সফল হবেন তারা?’

ক্রিকেটসংশ্লিষ্ট অনেকেরই ধারণা, দুজনই জনপ্রতিনিধি হিসেবে সফল হবেন। এর মধ্যে মাশরাফি তো আগে থেকেই ‘নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন’ নামের এক জনহিতকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে এলাকায় জনসেবায় নিয়োজিত। অসহায়-দুস্থ, পীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজটি আগে থেকেই করছেন মাশরাফি।

সবাই জানে, মাশরাফির মানবতাবোধ অন্যরকম। কারও বিপদ আপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া, অসহায়, দুস্থ, দরিদ্র মানুষকে আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা করার বিষয়ে বরাবরই অনেক আন্তরিক তিনি। মাঠ ও মাঠের বাইরে সহমর্মিতা, সাহায্য ও সহযোগিতার কারণে জাতীয় দলের সতীর্থ ক্রিকেটার এবং বয়সে ছোট ক্রিকেটারদের কাছে তাই মাশরাফি সব সময় অন্যরকম নির্ভরতা।

তাকে খুব কাছ থেকে দেখা জাতীয় দলের প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদিন নান্নুর ধারণা, একজন সত্যিকার ও আদর্শ জনপ্রতিনিধি হওয়ার সম্ভাব্য সব গুণাবলিই মাশরাফির মাঝে বিদ্যমান। তার আচার-আচরণ ও মানবতাবোধ অনেক জাগ্রত। সব শ্রেণির সাথে মেলামেশার এক দারুণ ক্ষমতা আছে তার। বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করায় তার জুড়ি মেলা ভার।

মাশরাফি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়ন ও জনকল্যাণে ব্রত হবেন- এমন আশা ব্যক্ত করে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক নান্নু বলেন, ‘আমার মনে হয় মাশরাফি জাতীয় সংসদ সদস্য হলে ভালো করবে। সফল হবে।

এলাকার মানুষের উন্নয়নে ব্রত হবে। কারণ তার মধ্যে এমনিতেই একটা সাহায্য-সহযোগিতা করার ইচ্ছা বেশি। ছোট পরিসরে হলেও চেনাজানা ও আপনজন কারও বিপদ, আপদ ও প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর কাজটি সে সময়ই আন্তরিকতার সাথে করে।

প্রচুর অর্থ সাহায্য দেয়। এবং সেটা নীরবে-নিভৃতে। এর বাইরে মাশরাফির আরও একটি গুণ আছে, তা হলো সে সবার সাথে মিশতে পারে। প্রাণ খুলে কথাবার্তাও বলতে পারে। জনপ্রতিনিধি হতে পারলে এই সহজাত গুণটি অনেক কাজে দেবে। কাজেই আমি বিশ্বাস করি মাশরাফি এমপি হলে এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াবে। তাদের মঙ্গল ত্বরান্বিত হবে।’

ব্যক্তি জীবনে মাশরাফির মতো ওতটা খোলামেলা স্বভাবের নন সাকিব। খানিক অন্তর্মুখী। তবে খুবই সাজানো গোছানো। বুদ্ধিমান। মাঠের চৌকষ পারফরমার সাকিব ব্যক্তি জীবন ও খেলার মাঠে বেশ দক্ষ, দূরদর্শী ও কৌশলী। সাকিবের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দারুণ। নেতৃত্ব দেয়ার সহজাত বৈশিষ্ট্যও আছে বেশ।

বাংলাদেশ জাতীয় দলের বর্তমান হেড কোচ স্টিভ রোডস সাকিবকেই কৌশলগত দিক থেকে ‘সেরা অধিনায়ক’ বলে অভিহিত করেছেন। কাজেই ধারণা করা হচ্ছে তীক্ষ্ম বুদ্ধি, অনুভব ও উপলব্ধি দিয়ে সাকিবও নিজ এলাকায় কার কি প্রয়োজন, তা জেনে বুঝেই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড স্থির করতে পারবেন।

মোদ্দা কথা, জনপ্রতিনিধি হিসেবে সাকিব ও মাশরাফির সফল হওয়ার সম্ভাবনা প্রচুর। তবে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দুই জনপ্রিয় ও শীর্ষ তারকার সাফল্যের সম্ভাবনায় একটি কাঁটাও আছে।

একটি প্রশ্ন উকি ঝুঁকি দিচ্ছে অনেকের মনেই- সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে মাশরাফি আর সাকিব জাতীয় দলের অধিনায়কের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিও বনে যাবেন। তখন তারা আর শুধু ক্রিকেটার কিংবা তারকা সেলিব্রেটি থাকবেন না। জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচনী এলাকার মানুষের ওপর একটা অন্যরকম দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্যও এসে কাঁধে পড়বে। এলাকায় ঘন ঘন যাওয়া। রাস্তাঘাট, কালভার্ট নির্মাণসহ এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার দায়ও বর্তাবে।

তারা তো বছরের বড় সময় জাতীয় দল, ক্লাব, বিপিএল নিয়ে যারপরনাই ব্যস্ত। খেলোয়াড়ি জীবনের শিডিউল মানতেই হিমশিম খান। প্র্যাকটিস, দেশে-বাইরে নানা সিরিজ, সফর আর টুর্নামেন্ট খেলতে খেলতে নিজ পরিবারকেও তেমন সময় দিতে পারেন না। বছরের বড় সময় জাতীয় দল, ক্লাব, বিপিএলের ট্রেনিং শিডিউল, বিভিন্ন সিরিজ, সফর, টুর্নামেন্ট, বিশ্বকাপ-চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়। যারা নিজের সংসার ও পরিবারকে বছরের বেশির ভাগ সময় দিতে পারেন না, তারা জনপ্রতিনিধি হয়ে কতটুকু সময় নিজ এলাকার উন্নয়নে ব্যয় করতে পারবেন? নির্বাচনী এলাকায় যাওয়ার ফুরসতই বা পাবেন কতক্ষণ? এ প্রশ্ন অনেকের মনেই।

বলার অপেক্ষা রাখে না, জাতীয় সংসদ নির্বাচিত হওয়া মানে পাঁচ বছরের জন্য ক্রিকেটারের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি বনে যাওয়া। ক্রিকেটীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধির কাজকর্মও করতে হবে। এলাকার সমস্যা কি, কোথায় কি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দরকার, সেতু-কালভার্ট নির্মাণের প্রয়োজন আছে কি-না, এসব করতেও যে সময় দরকার!

সবচেয়ে বড় কথা, রাজধানীকেন্দ্রিক অন্যান্য রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিরা সময় করে সপ্তাহে অন্তত একবার এলাকায় যান। সবার খোঁজ-খবর নেয়ার চেষ্টা করেন। এবং উন্নয়নমূলক কাজকর্মও করেন। মাশরাফি আর সাকিব কি সে সময় পাবেন?

তাদের তো জাতীয় দল নিয়েও বছরের অর্ধেকের বেশি সময় পার হয়ে যায়। এর বাইরে ঘরোয়া ক্রিকেটের ব্যস্ততাও কিছু কম নয়। আজ ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, কাল বিপিএল, পরশু আইপিএল ইত্যাদি। সেগুলো খেলে এলাকায় যাওয়া পাশাপাশি জনগণের উন্নয়ন করার ফুরসত কি মিলবে?

অনেকেরই ব্যাখ্যা, এক্ষেত্রে মাশরাফির তেমন সমস্যা হবে না। কারণ, তার এমনিতেই বয়স মধ্য তিরিশ। নানা ইনজুরি ও অস্ত্রোপচারের ধকল সামলেও ক্রিকেট ক্যারিয়ার ধরে রেখেছেন।

ভাবা হচ্ছে, আগামী বছর মানে ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলেই হয়তো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানবেন। সেক্ষেত্রে ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে মাশরাফির আন্তর্জাতিক ব্যস্ততা যাবে কমে। তখন জনপ্রতিনিধি হিসেবে এলাকায় প্রচুর সময় দিতে পারবেন।

কিন্তু সাকিব কি তা পারবেন? ধারণা করা হয়, সাকিব হয়তো আরও তিন-চার বছর জাতীয় দলের হয়ে খেলবেন। কারো কারো বিশ্বাস, মাশরাফি যেমন ২০১৯ বিশ্বকাপ খেলে অবসরের কথা ভাবছেন, একইভাবে সাকিবও ২০২৩ এর বিশ্বকাপ খেলার পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানাবেন।

তাই যদি হয়, তাহলে সাকিবকে অন্তত তিন-চার বছর ক্রিকেটার, জাতীয় দলের অধিনায়ক এবং জনপ্রতিনিধি হয়ে থাকতে হবে। এ দীর্ঘ সময় ওই তিন কার্যক্রমে যথাযথ সমন্বয় ঘটানো সহজ নয়। বরং বেশ কঠিন হবে। সাকিব কি তা পারবেন? প্রশ্ন থেকেই যায়।