২০, নভেম্বর, ২০১৮, মঙ্গলবার | | ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

সংলাপ সফল হয় না কেন?

আপডেট: নভেম্বর ১০, ২০১৮

সংলাপ সফল হয় না কেন?

রাজনৈতিক বিরোধের মীমাংসার আশায় আরও একটি সংলাপের উদ্যোগে এলো না ফলাফল। বিভেদ মেটাতে পারেনি দুই পক্ষ। যদিও সংলাপ শুরুর আগেও সাফল্য নিয়ে ছিল সংশয়।

১৯৯৫, ২০০১, ২০০৬ সালেও যা হয়েছে, এবারও তাই হয়েছে। কখনও মধ্যস্ততা করেছেন বিদেশিরা, কখনও দেশের ভেতরেই কেউ কেউ বসিয়েছেন দুই পক্ষকে। কিন্তু ‘যেই লাউ সেই কদু’। অবস্থান ছাড়তে নারাজ দুই পক্ষ।

সংলাপে বিরোধ না মেয়ায় রাজনীতিবিদদের ছাড় না দেয়ার মানসিকতাকে দায়ী করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বলছেন, তারা একে হারজিতের খেলা মনে করেন। মনে করেন, ছাড় দিলে হেরে যাবেন এবং মাঠের রাজনীতিতে প্রভাব পড়বে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের বয়স প্রায় ৪৮ বছর হয়ে গেল। অথচ নির্বাচনী প্রক্রিয়া-পদ্ধতি আজও তৈরি করতে পারলাম না আমরা। এটা রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা’।

এই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মতে, ‘সংলাপ সফল করতে গেলে দুই পক্ষরই ছাড় দিয়ে একটি অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছতে হবে। দুই পক্ষ নিজেদের জায়গায় অনড় থাকলে সংলাপ সফল হয় না। বর্তমানে সেটাই চোখে পড়ছে’।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সেনাপ্রধান মাহবুবুর রহমান আলোচনার টেবিলে বসাকেই শুভ উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন, যদিও ফলাফল নিয়ে আছে আক্ষেপ। বলেন, ‘সংঘাতের বিপরীতে সংলাপ অবশ্যই ভালো। তবে সংলাপ হচ্ছে গিভ অ্যান্ড টেক। নিজ নিজ জায়গায় সংকল্পবদ্ধ থাকলেতো আর সংলাপ সফল হবে না। এখানে দেয়া-নেয়া র মধ্য দিয়ে সমাধান আসবে। সেটা নেই বিধায় সংলাপের মাধ্যমে সমাধান আসছে না।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ফারুক খান অবশ্য মনে করেন, অতীতে ব্যর্থ হলেও এবার সংলাপ সফল হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না এবারের সংলাপ ব্যর্থ হয়েছে। তারা সংলাপ চেয়েছে, সংলাপ হয়েছে। আমরা আগেই বলেছি যে, সংবিধানের বাইরে কোনো দাবি দাওয়া আমরা মেনে নেব না। সেটা তো আইনিভাবে সম্ভবও না। তবে তাদের যে দাবিগুলো মেনে নেয়া সম্ভব, সেগুলো তো আমরা মেনেছি। একে কি আপনি ব্যর্থ বলবেন?

এর আগেও অন্তত তিন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে প্রকাশ্য এবং পর্দার আড়ালে সংলাপ হয়েছে। কিন্তু তাতে আসেনি সমাধান। এর মধ্যে দুই বার হয়েছে বিদেশিদের মধ্যস্থতায়।

১৯৯৪ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আওয়ামী লীগ জোরাল আন্দোলনে যাওয়ার পর বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে বাংলাদেশে সমঝোতার জন্য আসেন কমনওয়েলথ মহাসচিবের দূত স্যার নিনিয়ান স্টেফান। তিনি এসে একাধিক বৈঠক করেও কোনো ফল আসেনি।

শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠান করে বিএনপি। পরে অবশ্য দাবি মেনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করে পদত্যাগ করে এবং ওই বছরের জুনে আরও একটি নির্বাচন হয়। সেখানে জিতে

সংলাপের ইতিহাসে বড় একটা জায়গা দখল করে আছে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল ও বিএনপি মহাসচিব মান্নান ভুঁইয়ার মধ্যে আলোচনা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান নিয়ে বিরোধের জেরে উত্তপ্ত পরিবেশে ২০০৬ সালের অক্টোবরের এই আলোচনাও ব্যর্থ হয়। পরে বিএনপি ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচনের পথে এগিয়ে যায়। কিন্তু ১১ দিন আগে দেশে জারি হয় জরুরি অবস্থা।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর উচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অবৈধ ঘোষণা করে। এরপর সরকার দলীয় সরকারের অধীনে ভোটের বিধান ফিরিয়ে আনে। কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সেই নির্বাচনে যেতে রাজি ছিল না বিএনপি-জামায়াত জোট। শুরু হয় সহিংস আন্দোলন।

এ অবস্থায় ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে আসেন জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। তিনি দুই দলের নেতাদেরকে নিয়ে বসে গোপনে। কিন্তু হতাশার কথা জানিয়ে দেশ ছাড়েন। বিএনপি-জামায়াত জোটের বর্জন এবং সহিংস আন্দোলনের মধ্যেই হয় নির্বাচন।