নতুন প্রাণে বাংলায় ফিরছে ঐতিহ্যবাহী ‘নৌকা বাইচ’

নদীমাতৃক বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিসহ সব আনন্দ আয়োজনেই নদী ও নৌকার সরব আনাগোনা। আর হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সংস্করণ গ্রামীন জনপদের ‘নৌকা বাইচ’ খেলা। কালের বিবর্তন ও আধুনিকায়নে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম এই খেলাটির। কয়েকযুগ আগেও নদী কেন্দ্রীক গ্রাম গুলোতে প্রতিবছর আয়োজন করা হতো ‘নৌকা বাইচ’ খেলার। তবে বর্তমানে মাঝে মধ্যে দেখা যায় এই খেলা। দীর্ঘ সময় পরে লোকায়ত বাংলার লোকসংস্কৃতির অংশ ‘নৌকা বাইচ’খেলা নতুন রুপে ফিরে এসেছে বাংলার গ্রামে গ্রামে।

চলতি বাংলা বছরের ভাদ্র-আশ্বিন মাসে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার পাঁচটি গ্রামে আয়োজন করা হয়েছে এই খেলার। এছাড়াও পাশ্ববর্তী পীরগঞ্জ, গোবিন্দগঞ্জ ও নবাবগঞ্জ উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে অনুষ্ঠিত হয়েছে এই খেলা।

এসব খেলায় ২টি থেকে ৪টি দল অংশ গ্রহণ করে। খেলা দেখতে নারী-পুরুষ ও শিশু সহ বিভিন্ন বয়সের হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত। দর্শক উপস্থিতি দেখেই বোঝা যায় যে নৌকা বাইচ বাঙ্গালীকে এখনও গভীর ভাবে আকর্ষন করে।

সর্বশেষ গত রবিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ঘোড়াঘাট উপজেলায় করতোয়া নদীর কুমারপুর ঘাটে নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুটি দল অংশগ্রহণ করে। এর আগে গত মঙ্গলবার (২০ সেপ্টেম্বর) একই স্থানে অনুষ্ঠিত হয়েছে এই খেলার। তাতে চারটি দল অংশ গ্রহণ করেছিল। ঘোড়াঘাট উপজেলায় হয়ে যাওয়া এসব নৌকা বাইচ খেলায়

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, পঙ্খিরাজ, সোনারতরী, নয়নমনি, ময়ূরপঙ্খী ও দীপরাজ সহ বিভিন্ন নামে নামকরণ করা হয় একেকটি নৌকার। একটি নৌকা নিয়ে গঠিত হয় একটি দল। নৌকা গুলিতে ৬০ থেকে ১০০ জন পর্যন্ত মাঝি নৌকার দুপাশে সাড়িবদ্ধ ভাবে বসে। সকলের শরীরে থাকে একই রকমের পোশাক। নৌকার শেষের অংশে ঢাকঢোল নিয়ে থাকেন দু’তিন জন ব্যক্তি। প্রতিযোগীতা শুরু হলে ঢাকঢোলের তালে তালে মাঝিরা বিভিন্ন সাড়ি গান গাইতে থাকে। এসময় মাঝিরা বৈঠা টানে এবং একে অন্যের আগে যাওয়ার প্রতিযোগীতায় মেতে উঠে। খেলা শেষে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জন করা দলকে দেওয়া হয় গরু ও ছাগল সহ নগদ অর্থ পুরষ্কার।

কুমারপুর ঘাটে নৌকা বাইচ খেলা দেখতে এসেছিলেন পাশ্ববর্তী পলাশবাড়ী উপজেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল শিক্ষিকা রেবেকা সুলতানা। তিনি বলেন, ‘নৌকা বাইচ এখন আর আগের মত দেখা যায় না। কয়েকবছর পর এই খেলা দেখতে ছুটে এসেছি। সাথে আমার ছোট মেয়ে এসেছে। সে কোনদিন এই খেলা দেখেনি।’ পাশ্ববর্তী আরেক উপজেলা নবাবগঞ্জ। সেখান থেকে খেলা দেখতে এসেছিলেন পঞ্চাশোর্ধ ভ্যান চালক কুদ্দুস মোল্লা।

তিনি বলেন, ‘হামিও এক সময় নৌকা বাইচ খেলিচি। হামাহেরে যুগত প্রতিবছর সব গাঁও গ্রামে এই খেলা হওছিল। এখন তো এই খেলা নিখোঁজ হয়া যাওছে।’

কুমারপুর ঘাটে খেলার আয়োজন করেছিল স্থানীয় যুবসমাজ। তাদের একজন সদস্য আলতাফ হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতেই আমরা এই খেলার আয়োজন করেছি। গত বছরও নুনদহ ঘাটে আমরা এই খেলার আয়োজন করেছিলাম। নৌকা বাইচ খেলা দেখতে আসা লোকজনের উপস্থিতি এবং তাদের আনন্দ উপভোগ আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করেছে।’

লোটাস/বার্তাবাজার/এম আই

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর