২২, ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, বৃহস্পতিবার | | ৬ জমাদিউস সানি ১৪৩৯

ঘটনাক্রম: কারাগারে বন্দি খালেদার এক সপ্তাহ

আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১০:৪৮ পিএম

ঘটনাক্রম: কারাগারে বন্দি খালেদার এক সপ্তাহ



দুর্নীতির দায়ে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারে একমাত্র বন্দি হিসেবে এক সপ্তাহ পার করলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।  কারাগারে গত সাতদিনে মাত্র একবার স্বজনদের দেখা পেয়েছেন তিনি।  আরেক দফায় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পেরেছেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদসহ কয়েকজন আইনজীবী।  তবে আজ থেকে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে ব্যক্তিগত গৃহকর্মী মোছাম্মৎ ফাতেমাকে পেয়েছেন এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী। 




সন্ধ্যায় কারাগারের একটি
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, আদালতের নির্দেশনা মতো ফাতেমাকে থাকতে দেওয়া হয়েছে খালেদার সঙ্গে।  বিএনপি প্রধানও ভালো আছেন কারাগারে। 




৮ ফেব্রুয়ারি: জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সাজা দেয় বিচারিক আদালত।  রায়ের পর বিকাল সোয়া ৩টায় রাজধানীর নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় বিএনপি চেয়ারপারসনকে।  সেখানে প্রশাসনিক ভবনের নিচতলার একটি কক্ষে রাখা হয় তাকে।  সেটি একসময় সিনিয়র জেল সুপারের অফিস কক্ষ ছিল। 




খালেদা জিয়া ছাড়াও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার অন্য আসামি তার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ বাকি পাঁচজন পেয়েছেন ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড।  পাশাপাশি তাদের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা করে জরিমানাও হয়েছে। 




৯ ফেব্রুয়ারি: প্রশাসনিক ভবনে ৯ ফেব্রুয়ারি বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যান তার ভাইবোনসহ চার স্বজন।  তাদের সঙ্গে ছিল কিছু খাবার ও ফল।  তারা খালেদা জিয়ার শারীরিক খোঁজ-খবর নেন।  প্রায় দেড় ঘণ্টা স্বজনরা কারাগারে সময় কাটিয়ে বিকাল সোয়া ৫টার দিকে বেরিয়ে আসেন।  ওইদিন গিয়েছিলেন তার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার, তার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা ও তাদের ছেলে ফায়েক ইস্কান্দার এবং মেজ বোন সেলিনা ইসলাম। 




এর আগে ৯ ফেব্রুয়ারি সকালে স্বেচ্ছাসেবক দলের দুই নেতার স্ত্রী ফল নিয়ে কারাগারের সামনে গেলেও তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়।  একইদিন দুপুরে গিয়েছিলেন বিএনপির তিন নেত্রী অ্যাডভোকেট আরিফা জেসমিন, নেত্রকোনা জেলা মহিলা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক রেহানা তালুকদার ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি উম্মে কুলসুম রেখা।  তাদেরও ফিরিয়ে দিয়েছে পুলিশ। 




এরপর বিকালে সংবাদ সম্মেলনে বিদেশি গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেন, খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেওয়ার পর ডিভিশন সুবিধা দেওয়া হয়নি।  তাকে সাধারণ কয়েদির মতো রাখা হয়েছে।  তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও দেশের অন্যতম বড় একটি রাজনৈতিক দলের প্রধানকে এভাবে কারাগারে সাধারণ কয়েদির মতো রাখায় ক্ষোভ জানান মির্জা ফখরুল। 




১০ ফেব্রুয়ারি: কারাগারের প্রশাসনিক ভবনে দুই দিন রাখার পর ১০ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে সরিয়ে নেওয়া হয় ভেতরে নারী সেল এলাকার ডে কেয়ার সেন্টার ভবনের দ্বিতীয় তলায়।  যেখানে একসময় নারী বন্দিদের শিশু সন্তানরা থাকতে পারতো। 




ওইদিন খালেদা জিয়ার সময় কাটে নারী কারারক্ষীদের সঙ্গেই।  বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান পাঁচ আইনজীবী— ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, আবদুর রেজ্জাক খান, এ. জে মোহাম্মদ আলী, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও ব্যারিস্টার খন্দকার মাহবুব হোসেন।  খালেদা জিয়ার সঙ্গে আইনি ও দলীয় বিষয়ে আলোচনা করেছেন বলে কারাফটকে সাংবাদিকদের জানান তারা। 




দুপুরে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীদের সংগঠন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের আয়োজনে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ব্যারিস্টার মওদুদ।  তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে নির্জন কারাবাসে রাখা হয়েছে।  সেখানে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে না।  একটি পরিত্যক্ত ভবনে তাকে রাখা হয়েছে।  যেখানে কোনও মানুষ নেই, অন্য আসামিও নেই।  যেভাবে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদের নির্জন কারাবাসে রাখা হয়, সেভাবেই তাকে রাখা হয়েছে।  তিনবারের একজন প্রধানমন্ত্রীকে ডিভিশন না দিয়ে এভাবে কারাগারে রাখার বিষয়টি মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আইনের পরিপন্থী। ’




১১ ফেব্রুয়ারি: এদিন সকালে খালেদা জিয়াকে ডিভিশন দেওয়ার জন্য আদালতের কাছে আবেদন করেন আইনজীবী আমিনুল ইসলাম কারাগারে।  সকাল ১১টার পর ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এ শুনানি শেষে বিচারক আখতারুজ্জামান জেল কোড অনুযায়ী কারাগারে ডিভিশন দেওয়ার নির্দেশ দেন। 




১২ ফেব্রুয়ারি: এদিন খালেদা জিয়ার সঙ্গে আর কাউকে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।  অন্যান্য দিনের মতো কারাগারে নারী কারারক্ষী ও ব্যক্তিগত গৃহপরিচারিকা ফাতেমার সঙ্গে, টিভি দেখে ও পত্রিকা পড়ে তিনি সময় কাটাচ্ছেন বলে জানিয়েছে কারা সূত্র। 




১৩ ফেব্রুয়ারি: ওকালতনামাসহ কিছু কাগজপত্রে খালেদা জিয়ার স্বাক্ষর আনতে এদিন কারাগারে যান সানাউল্লাহ মিয়াসহ কয়েকজন আইনজীবী।  কিন্তু তাদের দেখা করতে দেওয়া হয়নি।  তাই তারা কাগজপত্রগুলো কারা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেন। 




১৪ ফেব্রুয়ারি:আজ বুধবার দুপুর ১টার দিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার অনুমতি চাইতে কারাফটকে যান বিএনপিপন্থী সাতজন চিকিৎসক।  কিন্তু অনুমতি না পেয়ে দুপুর আড়াইটার দিকে তারা কারাফটক ত্যাগ করেন। 




এই কারাগার থেকে অন্য কোনও স্থানে খালেদা জিয়াকে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেই বলে বুধবার দুপুরে সাংবাদিকদের জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।  কোস্টগার্ড বাহিনীর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘খালেদা জিয়াকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়েই সুন্দর পরিবেশে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছে।  তিনি সেখানে ভালো আছেন। ’




এই দিকে  মামলার রায়ের কপি ছয় দিন পরও আদালত কর্তৃপক্ষ কারান্তরীণ বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের হাতে দিতে পারেননি। 




খালেদা জিয়ার প্যানেল আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া  বলেন, ‘আজ বুধবার সকালে পুরান ঢাকার বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ আদালতের বিচারক ডা. মো. আখতারুজ্জামানের আদালতের কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানিয়েছিলেন, কপি তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে।  বিকেল ৪টা নাগাদ তা আইনজীবীদের দেওয়া যাবে। ’




‘কিন্তু বিকেলে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, এ মামলার রায়ের মূল কপি বিচারক বিকেল ৩টায় বেঞ্চ সহকারীর (পেশকার) কাছে কারেকশন করে দিয়েছেন।  এখন এ রায়ের অনুলিপি তৈরি করা হবে।  এ ছাড়া এ মামলার অন্যান্য কাগজ তৈরি হয়ে গেছে।  তাই আজকে কপি পাওয়া যায়নি।  আশা করা যায়, কাল হয়তো আমরা রায়ের কপি পাব,’ বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বলেন সানাউল্লাহ মিয়া। 




আদালত সূত্রে জানা যায়, মূল রায় ৬৩২ পৃষ্ঠা হলেও রায়ের অনুলিপি হবে ছয় হাজার পৃষ্ঠার বেশি।  ওই অনুলিপি হাতে আসার পরই জামিনের জন্য আপিল করতে পারবেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী।