২৩, ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, শুক্রবার | | ৭ জমাদিউস সানি ১৪৩৯

কী হত ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে?

আপডেট: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৯:২১ পিএম

কী হত ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে?
কোনোভাবে প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে না পেরে পরীক্ষা শুরুর সময় ইন্টারনেট বন্ধের উদ্যোগ নিয়েও সরকার সরে এসেছে, যা নিয়ে চলছে নানামুখী আলোচনা। 

অনেকেই এ বিষয়টিকে মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার মত সমাধান হিসেবে দেখছেন। 




কয়েক ঘণ্টা ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হলে তার প্রভাব কী হবে, সরকারের সংশ্লিষ্টরা তা ভেবে দেখেছেন কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে।     




শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে রোববার সকালে আধা ঘণ্টার জন্য মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখে দেশের
টেলিকম খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি।  এরপর রাত ১০টা থেকে আধা ঘণ্টা পরীক্ষামূলকভাবে দেশের সব ইন্টারনেট প্রোভাইডারের ব্যান্ডউইথ সেকেন্ড ২৫ কিলোবিটের মধ্যে সীমিত রাখা হয়।  ওই গতিতে কোনো ধরনের যোগাযোগ সম্ভব না হওয়ায় ওই আধা ঘণ্টা ইন্টারনেট কার্যত বন্ধই থাকে।  




সেই সঙ্গে এসএসসির আগামী সবগুলো পরীক্ষার শুরুতে আড়াই ঘণ্টা ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে রাখতে বলা হয় বিটিআরসির নির্দেশনায়।  কোন তারিখে কখন থেকে কখন ইন্টারনেটে গতি কম থাকবে, তার একটি তালিকাও দেওয়া হয়। 




সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সরকারের এ পদক্ষেপের সমালোচনা হলে সোমবার সকালে নতুন নির্দেশনা আসে।  সেখানে বলা হয়, আইএসপি ও মোবাইল অপারেটরদের ইন্টারনেটের গতি কমানোর বিষয়ে আগের নির্দেশনা স্থগিত থাকবে।  




 দিনে কয়েক ঘণ্টা ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে আসলে কী ঘটত?

>> শুরুতেই ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ বিঘ্নিত হত।  ওই আড়াই ঘণ্টা দেশে ইমেইল বা সোশাল মিডিয়ায় কোনো তথ্য আদানপ্রদান করা যেত না।  ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপের মত অ্যাপভিত্তিক যোগযোগের ব্যবস্থাও অচল থাকত।  তাতে সমস্যা হত বেশি তাদের, যাদের বিদেশে কথা বলা প্রয়োজন হত। 




>> বাংলাদেশে নতুন চালু হলেও রাজধানীতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে রাইড শেয়ারিং সেবা।  কিন্তু ইন্টারনেট না থাকলে উবার, পাঠাও, স্যামের মত সেবাও মিলবে না।  

>> ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি সাধারণ ব্যাংকিংও অচল হওয়ার দশা হত।  স্টক মার্কেট বন্ধ হত না, তবে লেনদেন বিঘ্নিত হত।  

>> ইন্টারনেট না থাকলে ফ্লাইট বুকিং ব্যবস্থাপনাও আটকে থাকত।  এয়ারলাইন্সগুলো ম্যানুয়ালি অপারেট করার ব্যবস্থা রাখলেও গতি স্লথ হয়ে যেত।  ট্যুর অপারেটররাও মুশকিলে পড়তেন বুকিং নিয়ে।  যাত্রীরা ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডে অনলাইনে টিকেট কিনতে পারতেন না। 

>> ইন্টারনেটভিত্তিক সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ওই সময় অচল থাকত।  অনলাইনে কেনাকাটা করা যেত না।  কলসেন্টারগুলো কাজে আসত না। 

>> আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান ও ফ্রিল্যান্সাররা ওই সময় কাজ করতে পারতেন না।  এরকম ঘটনা নিয়মিত ঘটতে থাকলে বিদেশি ক্লায়েন্ট হারাতে হত। 

>> দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা এখন ব্যবসার যোগাযোগের জন্য ব্যাপকভাবে ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল।  সকালের দিকে তাদের ব্যস্ততা থাকে সবচেয়ে বেশি।  ওই সময় ইন্টারনেট বন্ধ থাকা মানে ব্যবসা বড় ঝুঁকিতে পড়া। 

>> আইপি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি বন্ধ হয়ে যেত।  ফলে ঝুঁকিতে পড়তো এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা স্থাপনাগুলো। 

>> ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের খবর প্রকাশও বন্ধ।  যে কোনো জায়গায় থেকে যে কোনো সময় বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের খবরে চোখ রাখাও তখন আর সম্ভব হত না। 

 বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর  বলেন, ইন্টারনেট বন্ধ রাখার মত উদ্যোগ নেওয়া হলে, তাতে সাধারণ মানুষ যেমন সেবা থেকে বঞ্চিত হবে, তেমনি তথ্য প্রযুক্তিখাতে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিংয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। 

“আমরা এ বছরের  মধ্যে আইটি খাতে এক বিলিয়ন ডলার রপ্তারির টার্গেট রেখেছি, ২০২১ সাল নাগাদ ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছি।  এখন ইন্টারনেট বন্ধের কথা উঠলে সেটা কীভাবে হবে। ” 

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এখনকার বিশ্বে ২৪ ঘণ্টা ইন্টারনেট পাওয়া অনেকটা ‘অধিকারের মত’ হয়ে গেছে। 

“জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যম থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া বা বন্ধ করে দেওয়া বা স্পিড কমিয়ে দেওয়া হলে তা হবে মূল সমস্যার সমাধানে না গিয়ে অন্যদিকে মনোযোগ দেওয়ার মত ব্যাপার। ”

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “ইন্টারনেট বন্ধ করাটা প্রশ্নফাঁসের সমাধান হতে পারে না।  এটা রোগের কারণ না খুঁজে লক্ষণের চিকিৎসার মত আর কি।  ফাঁস হওয়া প্রশ্নের প্রচার বা বিস্তার ঘটে ইন্টারনেটের মাধ্যমে, তার আগে তো ফাঁস হতে হয়। ”

ইন্টারনেট নিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত হলে তা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে কঠিন করে তুলবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কলসেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং বা বাক্যর সাধারণ সম্পাদক তৌহিদ হোসেন। 




আর ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি এম এ হাকিম বলছেন, টানা কয়েক দিন ইন্টারনেট কয়েক ঘণ্টা বন্ধ রাখলে মোবাইল ফোন অপারেটররা ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়বে। 

 রোববার রাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ইন্টারনেটের বইয়ের দোকান রকমারি ডটকমের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট শাখার এক্সিকিউটিভ কাজী কাওছার সুইট বলেন, ইন্টারনেট বন্ধ থাকার সময় তাদের সঙ্গে কেউ যোগযোগ  যোগাগযোগ করতে পারেনি, বইয়ের অর্ডারও দিতে পারেনি।  

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) পরিচালক  মো. তসলিম আমিন শোভন বলেন, “আমাদের ব্যবসা অনলাইন নির্ভর, ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।  তবে সরকারের সিদ্ধান্ত হলে আমাদের না মেনে উপায় থাকে না। ”




রুটিন করে ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে কী ধরণের ক্ষতি হবে জানতে চাইলে পাঠাও এর সিইও হুসেইন ইলিয়াস বলেন, “সমস্ত সার্ভিস বন্ধ থাকবে।  ক্ষতির কথা আলাদা করে আর কি বলব, যাদের সকালে অফিস, ভার্সিটি ইত্যাদি জায়গায় যেতে হয় তারা সমস্যায় পড়বে।  রাইডারদের সমস্যাই বেশি। ”




আর বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেইঞ্জ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “পোশাকখাতে অর্ডারের ৯০ ভাগ কাজ আসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে।  যদি কয়েক দিন এভাবে ইন্টারনেট বন্ধ থাকে তাহলে বড় অংকের ক্ষতি হবে। ”




এখনকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা অনেকটাই ইন্টারনেট নির্ভর জানিয়ে ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফরান আলী বলেন, “কোনো কারণে ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে পার্সোনাল ব্যাংকিং সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।  সেক্ষেত্রে চরম গ্রাহক অসন্তুষ্টি সৃষ্টি হয়। ”




ইন্টারনেট নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের বিষয়টি মাথায় রাখার আহ্বান জানান রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান প্রধানও। 




ইন্টারনেট বন্ধ করে কিংবা গতি কমিয়ে প্রশ্নফাঁস বন্ধের পথ হবে না মন্তব্য করে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, “জঙ্গিবাদের মত অনেক অপরাধ আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এখন অনেকটাই কোনঠাসা।  শক্ত আইনি কাঠামো ও তার প্রয়োগ দিয়ে প্রশ্নফাঁসও বন্ধ করা যায়।  পৃথিবীর কোনো দেশে প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে ইন্টারনেট বন্ধ করতে হয়নি। ”