২৩, এপ্রিল, ২০১৮, সোমবার | | ৭ শা'বান ১৪৩৯

কে দাঁড়াবে সৈয়দ রাসেলদের পাশে?

আপডেট: ১৪ জানুয়ারী ২০১৮, ১১:৫৮ এএম

কে দাঁড়াবে সৈয়দ রাসেলদের পাশে?



জাতীয় দলে প্রবল প্রতাপের সাথে খেলেছেন একসময়।  এখনও পারফরম করেই ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে যাচ্ছেন। 

সেই সৈয়দ রাসেল গতকাল সকালে আবিষ্কার করেছেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড তার দাম ঠিক করেছে সাড়ে তিন লাখ টাকা! যেখানে বাংলাদেশে প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট খেলেও খেলোয়াড়রা ৬-৭ লাখ টাকা আয় করে, সেখানে আমাদের প্রিমিয়ার লিগে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ক্রিকেটারের এবার প্রিমিয়ার লিগে এই সাড়ে তিন লাখ টাকা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। 

সৈয়দ রাসেল তার ক্ষোভটা
প্রকাশ করেছেন।  কিন্তু প্রকাশ্যে ক্ষোভ না জানানো এরকম শত ক্রিকেটার আছেন।  যাদের প্রিমিয়ার লিগের আয় গত বছরের চেয়ে এক ধাক্কায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।  প্রিমিয়ার লিগ হচ্ছে আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটের বেশীরভাগ ক্রিকেটারের রুটিরুজির একমাত্র মাধ্যম। 

এই ক্রিকেটাররা বিপিএলে দল পান না বিদেশীদের ভিড়ে।  এই ক্রিকেটাররা মাস গেলে বিসিবি থেকেও বেতন পান না।  ফলে প্রিমিয়ার লিগের আয়টা কমে গেলে তাদের সংসারে প্রভাব পড়ে।  শুনতে মনে হয় যে, একবারে সাড়ে তিন লাখ টাকা পেলো।  কিন্তু সারা বছরে তাদের এটাই ইনকাম। 

একবার ভেবে দেখুন, দেশের সিংহভাগ শীর্ষ খেলোয়াড়ের মাসিক বেতন দাড়াচ্ছে এতে তিরিশ হাজার টাকারও কম।  এই টাকায় নিজের খাওয়া-পরা, সংসার এবং চিকিৎসার মতো ব্যয় মেটাতে হবে এবং আমরা আশা করবো তারা এরপরও সবটুকু মনপ্রাণ দিয়ে ক্রিকেট খেলবে!

এখন কথা হলো, ক্রিকেটারদের এই সংকটে তাদের পাশে দাড়াবে কে?

আদর্শ বলে, এই অবস্থায় বিসিবিরই উচিত, ক্রিকেটারদের স্বার্থ ভাবা।  কারণ, ক্রিকেট বোর্ডের কাছে সবচেয়ে বড় কথা হলো ক্রিকেটার।  কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে ক্রিকেটারের চেয়ে বোর্ডের কাছে ক্লাবের গুরুত্ব বেশী। 

বেশী বলেই তারা উন্মুক্ত দলবদল পদ্ধতি বাদ দিয়ে এভাবে আবার লটারি করে, দাম ঠিক করে দিয়ে প্রিমিয়ার লিগ করতে চাইছেন।  আমাদের দেশে বোর্ড কর্মকর্তারা অধিকাংশই আসেন ক্লাব থেকে।  তারা খেলোয়াড় তো বটেই, যে কোনো ক্রিকেটীয় ব্যাপারের চেয়ে ক্লাবের স্বার্থ বড় করে দেখতে অভ্যস্থ। 

এ অবস্থায় বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সহায় হতে পারতো খেলোয়াড়দের অ্যাসিয়েশন।  বাংলাদেশে এরকম একটা অ্যাসোসিয়েশন আছেওÑক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা কোয়াব।  তারা এই সংগঠনটি করেছিলেনই খেলোয়াড়দের স্বার্থ দেখার জন্য। 

একসময় খেলোয়াড়দের বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে এই সংগঠনটি মাঠও গরম করতো।  কিন্তু সে এখন অতীত কালের গল্প।  এখন এই সংগঠনটি যে আসলে কার স্বার্থ দেখতে পারবে, সেটাই বলা মুশকিল।   এখানেও সেই কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট বিদ্যমান। 

কোয়াবের সভাপতি হলেন নাঈমুর রহমান দূর্জয়।  তার যোগ্যতা নিয়ে কোনো সংশয় নেই।  তিনি বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক, দাপুটে সাবেক খেলোয়াড়।  তিনি সভাপতি হিসেবে এমন একটি সংগঠনের দায়িত্বে থাকাটা ভালোই ছিলো।  কিন্তু সমস্যা হলো তিনি একই সাথে বোর্ড পরিচালকও বটে।  ফলে বোর্ড বনাম খেলোয়াড় কোনো দ্বন্ধে তার পক্ষে কোনো শক্ত অবস্থা নেওয়া কঠিন। 

এরপর আছেন সংগঠনের সহসভাপতি খালেদ মাহমুদ সুজন।  তিনিও সাবেক অধিনায়ক।  কিন্তু তিনি বোর্ডের অনেক দায়িত্বে আছেন-বোর্ড পরিচালক, জাতীয় দলের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর।  ফলে তার পক্ষেও খেলোয়াড়দের পক্ষ নেওয়া সম্ভব না।  এরপর আছেন কোয়াবের সাধারণ সম্পাদক দেবব্রত পাল।  সাবেক এই প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটার এখন বিসিবির ম্যাচ রেফারি এবং অনুর্ধ্ব-১৯ দলের ম্যানেজার; মানে বিসিবির বেতনভোগী।  তার পক্ষেও ক্রিকেটারদের হয়ে নিজের চাকরিদাতাদের বিরোধিতা করা সম্ভব না। 

সোজা কথায় কোয়াব এখন বিসিবির একটা বর্ধিত অংশ ছাড়া আর কিছু নয়।  তাদের পক্ষে ক্রিকেটারদের হয়ে মাঠে নামাটা অবাস্তব একটা চিন্তা। 

অথচ অস্ট্রেলিয়ায় কিছুদিনের আগে হয়ে যাওয়া সংকটের কথা চিন্তা করুন।  সেখানে এসিএ (অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন) কীভাবে অনড় ও যুদ্ধংদেহী অবস্থানে গেলো খেলোয়াড়দের পক্ষ নিয়ে।  অ্যাশেজ বাতিলের সম্ভাবনা তৈরী হলেও এতোটুকু মাথা নোয়ানি এসিএ।  শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড়দের দাবি আদায় করে তবে শান্ত হয়েছিলো তারা। 

কেনো এটা হয়েছিলো।  কারণ, এসিএ পরিচালিত হয় এমন সব সাবেক ক্রিকেটার ও বর্তমান ক্রিকেটারদের দিয়ে যাদের ক্রিকেটারদের বাইরে আর কোনো স্বার্থ নেই।  সবচেয়ে বড় কথা, এসিএ-তে আছেন পেশাদার একজন প্রধাণ নির্বাহী।  যিনি সাবেক ক্রিকেটারও নন। 

অ্যালিস্টার নিকোলসন নামে এই ভদ্রলোক ছিলেন সাবেক ফুটবলার।  মূলত তার প্রশাসনিক ও দর কষাকষির ক্ষমতার কারণে তাকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।  তিনি ফুটবলে অবসরের পর অস্ট্রেলিয়া ফুটবল লিগ প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের দায়িত্বে ছিলেন।  সেখানে তার যে আন্দোলন ও দাবি আদায়ের অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেটাকেই কাজে লাগায় এসিএ। 

এখন কথা হলো, বাংলাদেশের কোয়াব এভাবেই থাকলে সৈয়দ রাসেলদের এই ফেসবুকে আর্তনাদই করে যেতে হবে।  তাদের পাশে কেউ দাড়াবে না।  আর কোয়াব যদি সত্যিই খেলোয়াড়দের প্রতিনিধিত্ব করা পেশাদার সংগঠন হয়ে ওঠে, তাহলে এই দলবদলের নামে তামাশাই আর হবে না। 

এখন খেলোয়াড়দেরই ঠিক করতে হবে, তারা তাদের প্রতিনিধি কিভাবে নির্ধারণ করবেন।