১৯, এপ্রিল, ২০১৮, বৃহস্পতিবার | | ৩ শা'বান ১৪৩৯

হারিয়ে যাচ্ছে ট্যাক্সিক্যাব

আপডেট: ০৭ জানুয়ারী ২০১৮, ১১:১৭ এএম

হারিয়ে যাচ্ছে ট্যাক্সিক্যাব
বিভিন্ন অব্যবস্থাপনার কারণে রাজধানী ও চট্টগ্রামের রাস্তা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ট্যাক্সিক্যাব।  এই দশকের প্রথমার্ধে নগরের রাস্তায় প্রচুর ট্যাক্সিক্যাব দেখা গেলেও সম্প্রতি আর চোখেই পড়ে না তেমন।  মূলত ভাড়ায় বৈষম্য, পার্কিংয়ের জায়গা না থাকা, বিমানবন্দর এলাকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা, ঢাকার বাইরে যাওয়ার অনুমতি না পাওয়া এবং অ্যাপসভিত্তিক পরিবহন সার্ভিস চালু হওয়ায় বেকায়দায় পড়েছে ট্যাক্সিক্যাব পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।  এসব সমস্যা সমাধানে যোগাযোগ
মন্ত্রণালয় ও বিআরটিএ’কে চিঠি দিয়েও কোনও লাভ হয়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। 

বিআরটিএ ও ট্যাক্সিক্যাব পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সূত্রে জানা গেছে, ২০০২ সালের শেষের দিকে ট্যাক্সিক্যাব চালু হয় ঢাকায়।  প্রথম অবস্থায় কালো ও হলুদ রঙের ১১ হাজার ২৬০টি ট্যক্সিক্যাব নামানো হয়।  পরবর্তীতে আরও ৬ হাজারের মতো ট্যাক্সিক্যাব নামানোর কথা ছিল।  সেসময় আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন নামিদামি প্রতিষ্ঠান অর্থায়ন করে এতে।  কিন্তু পরবর্তীতে নানা কারণে সার্ভিসটি হারিয়ে যায়।  তবে ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে ‘তমা কনস্ট্রাকশন’ ও ‘ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসেস’ নামের দু’টি কোম্পানিকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ট্যাক্সিক্যাব নামানোর অনুমতি দেয় সরকার।  বর্তমানে রাজধানীতে তমা সার্ভিসের ২৫০টি এবং ট্রাস্টের ১৭৫টি ট্যাক্সি চলছে। ট্রাস্টের ১৭৫টি ট্যাক্সির মধ্যে প্রথমে ঢাকায় ১০০টি ও চট্টগ্রামে ৫০টি চালু করা হয়।  পরবর্তীতে ঢাকায় আরও ২৫টি এবং চট্টগ্রামের ৫০টি ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। 

এসব ট্যাক্সিক্যাবে প্রথম দুই কিলোমিটারের জন্য ৮৫ টাকা, পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারের জন্য ৩৪ টাকা, প্রতি দুই মিনিট অপেক্ষমাণ সময়ের (যানজট, যাত্রাবিরতি ও সংকেত) জন্য সাড়ে আট টাকা, ফোনে ট্যাক্সিক্যাব বুকিং দিলে বাড়তি ২০ টাকা হিসেবে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।  এছাড়া ট্যাক্সিক্যাব যেখান থেকে যাত্রা শুরু করে সেখান থেকেই মিটার চালু করা হয়।  ফলে যাত্রী ওঠার আগেই মিটারে অনেক টাকা ভাড়া ওঠায় সার্ভিসটির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন যাত্রীরা। 

বিভিন্ন সমস্যার পাশাপাশি যাত্রী সংকটের কারণে যে কোনও সময় ট্যাক্সিক্যাব সেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে তমা ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস কর্তৃপক্ষ।  সার্ভিসটি সচল রাখার জন্য বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং বিআরটিএ’র কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে। 

চলতি বছরের শুরুর দিকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়,ট্যাক্সিক্যাব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সার্ভিসটি চালু রাখা সম্ভব হবে না।  ক্রমাগত লোকসানের কারণে সেবাটি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

এছাড়াও ওই চিঠির মাধ্যমে কয়েকটি দাবি জানানো হয়েছে।  সেগুলো হলো- বিমানবন্দরে প্রবেশ ও পার্কিংয়ের অনুমতি দেওয়া,বিভিন্ন পয়েন্টে ট্যাক্সিক্যাব স্ট্যান্ডের ব্যবস্থা করা, অযথা মামলা না দেওয়া, বিদ্যমান মামলাগুলোর সুরাহা করা, অসময়ের জন্য (সকাল ও গভীর রাত) ভাড়া বাড়ানো এবং বিশেষ ক্ষেত্রে ঢাকার বাইরে যাত্রী পরিবহনের অনুমতি দেওয়া। 

প্রতিষ্ঠানটির এমন দাবির বিষয়ে বিআরটিএ’র পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. নুরুল ইসলাম কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি। 

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিএ’র কয়েকজন কর্মকর্তাবাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বিষয়টি যাত্রীদের ওপর নির্ভর করে।  যাত্রীরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী সার্ভিসে উঠেন।  যে সার্ভিসে কম টাকায় যাওয়া যায়, যাত্রীরা সেই সার্ভিসটিই বেছে নেবেন এটাই স্বাভাবিক।  ট্যাক্সিক্যাবের বর্তমান যে ভাড়া তা অন্যান্য সার্ভিসের চেয়ে একটু বেশি।  যে কারণে ট্যাক্সিক্যাবে মানুষের আগ্রহ কম।  তাছাড়া ভাড়া বাড়ার কারণে অনেক যাত্রী গাড়িতে ওঠার পরও গন্তব্যে না গিয়ে মাঝ পথেই নেমে যান।  এ অবস্থায় আবারও ভাড়া বাড়ালে জনমনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। 

কর্মকর্তারা আরও বলেন, রুট পারমিট না থাকায় ট্যাক্সিক্যাবকে ঢাকার বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া যাচ্ছে না।  এ ব্যাপারে আলোচনা সাপেক্ষে ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।  আবার অনুমতি দিলে ক্যাবগুলো মহাসড়কে দুর্ঘটনা বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়াবে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

এদিকে ভাড়া বেশি নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে কলাবাগানের বাসিন্দা কাউছার জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কয়েকবার ট্যাক্সিক্যাবে উঠেছি।  কিন্তু ভাড়া অন্যান্য সেবার তুলনায় অনেক বেশি।  জ্যামে আটকা থাকলে প্রতি মিনিটে সাড়ে আট টাকা ভাড়া দিতে হয়।  এতেই ভাড়া অনেক বেশি আসে। ’

বিআরটিএ সূত্র জানিয়েছে, ট্যাক্সিস্ট্যান্ড সমস্যার সমাধানের জন্য একাধিকবার সিটি করপোরেশন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে।  বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।  কিন্তু সমাধান হয়নি।  তাছাড়া পার্কিংয়ের দায়ে মামলা না করার জন্য অনুরোধও করা হলেও তা আমলে নেয়নি ডিএমপি।  বিমানবন্দরের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিতে সিভিল অ্যাভিয়েশনকে একাধিকবার চিঠি দিয়েও কাজ হয়নি। 

এ ব্যাপারে তমা গ্রুপের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ভুঁইয়া মানিক  বলেন, ‘লোকসান দিয়ে এখনও সার্ভিসটি চালু রেখেছি।  অনেক সমস্যা রয়েছে।  এসব সমস্যা সমাধানে মন্ত্রণালয়ে অনেকবার চিঠি দিয়েছি।  একাধিকবার কথাও বলেছি।  কিন্তু কোনও কাজ হচ্ছে না।  তাই সার্ভিসটির ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও কিছু বলা যাচ্ছে না। ’

ঢাকা মহানগর ট্যাক্সিক্যাব (লিজ) মালিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ওবায়দুল হক বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে সার্ভিসটি জনপ্রিয়তা হারিয়েছে।  ফলে মালিকরা লোকসানে পড়েছেন। ’

তিনি আরও বলেন, ‘২০০২ সালে চালু হওয়া ট্যাক্সিক্যাবগুলোর মেয়াদ ২০১৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর শেষ হয়ে গেছে।  সেসময় ট্যাক্সিক্যাবগুলো ১৯৯৮ সালের তৈরি নীতিমালা অনুযায়ী চলতো।  পরে ২০১০ সালে ‘ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস গাইড লাইন-২০১০’ নামে আরও একটি নীতিমালা তৈরি করা হয়।  কিন্তু আমাদের সঙ্গে না বসেই নীতিমালাটি তৈরি করা হয়েছে।  বাস্তবভিত্তিক নীতিমালা না হওয়ায় বর্তমানে এসব সমস্যা তৈরি হয়েছে। ’

ট্রাস্ট সার্ভিসের ট্যাক্সিচালক মহিবুর বলেন,‘আমাদের সার্ভিসটি মোটামুটি চলছে।  তবে অ্যাপসভিত্তিক সার্ভিসের কারণে আগের চেয়ে যাত্রী কমে গেছে। ’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিমাসে ১০ হাজার টাকা বেতন, প্রতিদিন ১০০ টাকা করে খোরাকি এবং তিন হাজার টাকার বেশি সার্ভিস দিলে অতিরিক্ত টাকার ৫০ শতাংশ আমাদের দেওয়া হয়।  তবে কোম্পানি আগের মতো লাভে নেই। ’

এ বিষয়ে জানতে ট্যাক্সিক্যাব সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা বিআরটিএ’র উপ-পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং-১) শফিকুজ্জামান ভুঁইয়ার ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।