২৬, এপ্রিল, ২০১৮, বৃহস্পতিবার | | ১০ শা'বান ১৪৩৯

মা-ছেলেকে ফাঁসাতেই বিউটিকে হত্যা করে তার বাবা

আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০১৮, ০৮:৪৪ পিএম

মা-ছেলেকে ফাঁসাতেই বিউটিকে হত্যা করে তার বাবা
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে আলোচিত কিশোরী বিউটি আক্তার হত্যার রহস্য উদঘাটন হয়েছে।  হত্যার দায় স্বীকার করেছেন বিউটির বাবা সায়েদ আলী।  প্রতিবেশী ময়না মিয়ার প্ররোচনায় তিনি এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। 

শনিবার সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা। 


সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ইউপি নির্বাচনে মহিলা মেম্বার পদে বাবুল মিয়ার মা কলম চান বিবির সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ময়না মিয়ার স্ত্রী আছমা
আক্তার।  নির্বাচনে আছমা পরাজিত হন।  তখন থেকেই বাবুল ও তার মায়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন ময়না মিয়া। 


গত ২১ জানুয়ারি বাবুল মিয়া প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিউটিকে বাড়ি থেকে নিয়ে যান।  অলিপুর এলাকায় একটি ঘর ভাড়া নিয়ে সেখানে ১৭ দিন তাকে আটকে রাখেন।  ৯ ফেব্রুয়ারি তাকে উদ্ধার করা হয়।  পড়ে বাবুলের সঙ্গে তাকে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয় সালিশে।  কিন্তু বাবুল তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়নি।  পরবর্তীতে ১৪ ফেব্রুয়ারি বিউটির বাবা আদালতে একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন।  ৪ মার্চ সেটি থানায় রেকর্ড করা হয়। 


এদিকে বিউটি আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে জানায়, স্বেচ্ছায় সে বাবুলের সঙ্গে গিয়েছিল এবং বিয়ে করলে মামলা তুলে নেবে।  অপরদিকে বাবুলকে কোনো অবস্থায়ই বিয়ের জন্য রাজি করানো যাচ্ছিল না।  এ সুযোগকেই চূড়ান্ত সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন ময়না মিয়া।  তিনি বিউটির বাবা সায়েদ আলীকে বুঝান বিউটিকে বাবুল নষ্ট করেছে।  তাকে বিয়ে দেয়া যাবে না।  তার জন্য অন্য দুই মেয়েকেও বিয়ে দেয়া যাবে না।  তাছাড়া বিউটিকে ভূতে ধরেছে।  সে মাঝে মাঝে মাঝেই বাড়ি থেকে চলে যায়।  তাই তাকে মেরে ফেলাই ভালো।  তাছাড়া এখন মারলে বাবুল এবং তার মায়ের ওপরই দায় যাবে।  এতে প্রলুব্ধ হয়ে ওঠেন বিউটির বাবা সায়েদ আলী।  তিনিও রাজি হয়ে যান।  এ সুযোগকেই কাজে লাগায় ময়না মিয়া। 


সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা একজনকে ভাড়া করে ১০ হাজার টাকায়।  দুই হাজার ৫০০ টাকা তাকে পরিশোধও করা হয়।  বাকি টাকা হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হওয়ার পর পরিশোধের কথা ছিল।  এর পুরো ব্যয় বহন করেন ময়না মিয়া।  ৬ মার্চ রাতে তারা ব্রাহ্মণডোরা গ্রামের বটগাছ তলায় গিয়ে প্রথমে অবস্থান নেন।  সেখান থেকে রাত আনুমানিক ১০টায় তারা লাখাই উপজেলা গুণিপুর গ্রামে বিউটির নানারবাড়ি পৌঁছান। 


বিউটির বাবা সায়েদ আলী মেয়েকে চেয়ারম্যানের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য তার নানি ফাতেমা বেগমকে জানান।  সায়েদ আলীর কথা শুনে তিনি বিউটিকে বাবার সঙ্গে পাঠিয়ে দেন।  রাত সাড়ে ১২টার দিকে তারা বিউটিকে নিয়ে গুণিপুর গ্রামের পাশে হরিণাকোণা খালের পাড়ে পৌঁছায়।  সেখানে ভাড়াটে খুনি বিউটিকে ধরে রাখে।  আর ময়না মিয়া নিজের সঙ্গে থাকা ছুরি দিয়ে ৫টি আঘাত করে।  এতে তার নাড়িভুরি বের হয়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়।  সেখান থেকে রক্ত ধুয়ে মুছে রাতেই লাশ গুণিপুর থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে হাওরে এনে ফেলে দেয়া হয়। 


হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা জানান, ঘটনার পর থেকে বিউটির বাবার আচরণ সন্দেহজনক ছিল।  প্রায়ই তিনি আনমনা হয়ে পড়তেন।  ময়না মিয়াও জিজ্ঞাসাবাদে বারবারই আনমনা হয়ে পড়েন।  একপর্যায়ে গত ৫ এপ্রিল বিউটির নানি ফাতেমা বেগমকে এনে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি বলেন- বিউটির বাবাই তাকে ওই রাতে নিয়ে এসেছিল।  এ সময় তিনি সঙ্গে ময়না মিয়াকেও দেখেন।  কিন্তু অপরজন কে ছিল তিনি দেখেননি। 


৫ এপ্রিল ময়না মিয়াকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে তিনি এক পর্যায়ে সব স্বীকার করে নেন।  শুক্রবার নিয়ে আসা হয় বিউটির বাবা সায়েদ আলীকে।  তিনিও জিজ্ঞাসাবাদে সব অকপটে স্বীকার করে নেন। 


শুক্রবার ময়না মিয়া এবং শনিবার বিউটির বাবা সায়েদ আলী হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলামের আদালতে জবানবন্দি দেন।  নিহত বিউটির নানি ফাতেমা বেগম সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দেন