১৬, জুলাই, ২০১৮, সোমবার | | ৩ জ্বিলকদ ১৪৩৯

মার্কিন রক গায়িকার ইসলাম গ্রহণ

ফ্যাকাশে চামড়া, উজ্জ্বল নীল চোখ, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ও জার্মান বংশধর দারলা আবু শানব আমেরিকার ডেট্রয়েট লেকে বেড়ে ওঠেছেন। এই নারী এখন ইসলাম অনুশীলন করছেন। খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম নেওয়া দারলা আবু শানব ১৯৯০’র দশকের প্রথম দিকে একজন মুসলিম পুরুষকে বিয়ে করেন। পরে ইসলামে ধর্মান্তরিত হন। তাদের সংসারে এখন ১৩, ১৪, ১৭ এবং ২৪ বছর বয়সী চারজন ছেলে-মেয়ে রয়েছে। সাম্প্রতিক মার্কিন ইতিহাসে মুসলিমদের জন্য সবচেয়ে দুঃখজনক সময়ের আগেই আবু শানব তার নতুন ধর্ম প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন। হিজাবে কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি অন্য সবার মতোই ছিলাম এবং হঠাৎ করেই একদিন হিজাব পড়ার সিদ্ধান্ত নেই। আমার সহকর্মীরা বলেছিল, তারা আমাকে সমর্থন করে এবং আমাকে ভালোবাসে এবং তারা হিজাবকেও খুব পছন্দ করেন।’ যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ারে হামলার ১০ দিন আগে ২০০১ সালের ১ সেপ্টেম্বর আবু শানব প্রথম হিজাব পরে কাজে গিয়েছিলেন। এটি তার জন্য বিশ্বাসের চরম পরীক্ষা ছিল বলে তিনি মনে করেন। তিনি কেন ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছেন এবং কেন এটি তার জন্য একটি ইতিবাচক পছন্দ ছিল-ওই সময় মানুষের এমন প্রশ্নের কোনো জবাব তিনি দিতে পারেননি। ১১ সেপ্টেম্বর হামলার পর থেকে আমেরিকায় মুসলমানদের প্রতি নতুন করে অবিশ্বাস ছড়িয়ে পরেছিল এবং আবু-শানব তাৎক্ষণিক হানাহানির বিষয়টি অনুভব করেছিলেন। হামলা কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ঘটনার কথা মনে হলে আমি এখন আতকে উঠি। কারণ ওই সময় আমি মিশিগানে ছিলাম এবং আমার ছেলে মসজিদের ডে কেয়ারে ছিল। সেখানে গুজব ছড়ানো হয়েছিল যে লোকেরা গাড়ি থেকে বেছে বেছে মুসলিমদের নামিয়ে তাদের পিটাচ্ছে। এটা সত্য কিংবা মিথ্যা যাই ছিল না কেন-বিষয়টি তাকে অত্যন্ত আতঙ্কিত করে তুলেছিল। শানব বলেন, ‘আমার স্বামী আমাকে বলেছিল, তুমি চাইলে হিজাব খুলে ফেলতে পার। এই ভয় কাটিয়ে ওঠতে আমার ১০ বছর সময় লেগেছিল। এটা আমাদের জন্য পরীক্ষা ছিল কিনা, তা আমি জানি না।’ মনের ভেতর ভয় সত্ত্বেও তিনি তার হিজাব পরা বন্ধ রাখেননি। ডে কেয়ার থেকে তার মেয়েকে নিয়ে আসতে একটু আগেই তার কাজ শেষ করে বেরিয়ে পরতেন। এসময় গাড়ির পেছনে তিনি সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকতেন। তিনি বলেন, ‘যখন আমি আমার বিশ্বাসের কথা চিন্তা করি, তখন আমি মনে করি যে ওই মুহূর্তটি আমাকে সংজ্ঞায়িত করেছিল।’ তার কর্মক্ষেত্র, বন্ধুরা এবং তার পরিবার তাকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু কিছু উগ্রপন্থী আমেরিকান তাকে রাস্তায় অনুসরণ করত, গাড়ির জানালার কাছে এসে চিৎকার করত এবং তাকে হুমকি দিত। ধর্মান্তরের পর থেকে অনেক বছর ধরে তার এরকম অনেক ঘটনা ঘটেছিল বলে তিনি জানান। সন্তানদের নিয়ে কোনো রেস্টুরেন্টে গেলে তাদের পাশের টেবিল থেকে গালি দেওয়া হতো বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, ‘আমি ছেলে-মেয়েদের বুঝানোর চেষ্টা করতাম এই বলে যে, এটা হচ্ছে কারো পক্ষে থেকে উপহার। কারণ এটা তোমাদের সচেতন করে দিচ্ছে যে, ধর্মীয় স্বাধীনতা হচ্ছে এই ধরনের একটি উপহার।’ একজন মুসলিম হিসেবে তিনি শালীন পোশাক পরিধান করেন, প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন, মদ্যপান পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছেন এবং রমজান মাসে প্রতিটি রোজা রাখেন। তারপরেও তিনি যে খুব বেশি পরিবর্তিত হয়েছেন তা তিনি মনে করেন না। আমি আগে যেমন ছিলাম, এখনো তেমনিই রয়ে গেছি জানিয়ে তিনি বলেন, শুরুতে রোজা রাখা তার জন্য অত্যন্ত চ্যালেজ্ঞিং ছিল। যাইহোক, অন্যান্য মুসলিমদের দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন বলে জানান। আবু শানব আমেরিকার দুটি জনপ্রিয় ব্যান্ড ভোকালিস্ট ছিলেন। প্রথমে ছিলেন ‘জেসিকা’র ভোকালিস্ট পরে রক ব্যন্ড ‘কাশ্মির’ এর যোগদান করেন। আমেরিকার বিখ্যাত হোটেল ‘হলিডে ইন’ মতো হোটেলগুলোতে তিনি পারফর্ম করতেন। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্টেজ শো’তে অংশ নিতেন। পারফর্ম করতে গিয়েই তার স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় এবং তারপর বাকিটা ইতিহাস। তারা ১৯৯০ সালে বিয়ে করেন। ওই সময় তিনি ছিলেন একজন খ্রিস্টান এবং তার হবু স্বামী ছিলেন একজন মুসলিম। তিনি বলেন, ‘তিনি (স্বামী) কখনো তার ধর্ম সম্পর্কে আমাকে চাপ দেননি। তিনি বলতেন, তুমি যদি ইসলাম সম্পর্কে কোনো কিছু জানতে চাও তাহলে কেবল আমাকে কেবল প্রশ্ন করো।’ তারপর দুজনে অনেক আলাপ আলোচনার পর তিনি ইসলামে ধর্মান্তরিত হন। এখন তিনি তার অবসর সময়ে শরণার্থীদের বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দিয়ে থাকে। গত বছর তিনি ৯ সদস্যের একটি শরণার্থী পরিবারকে তিনি স্পনসর করেছিলেন। ওই পরিবারের প্রধানকে আইএস জঙ্গিরা পায়ে গুলি করেছিল। তার স্বামী একজন প্যালেস্টাইনি এবং কুয়েতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একটি অ্যারোস্পেস স্ংস্থার টেকনিকাল পরিচালক হিসাবে কাজ করছেন। তারা বর্তমানে তাদের পরিবারকে নিয়ে ডেট্রয়েটের উপশহরে বসবাস করছেন।