মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শেখ কামালের স্মৃতিচারণ করলেন মুক্তিযোদ্ধা আশু মোড়ল

আরশাদ আলী মোড়ল ওরফে আশু মোড়ল। বয়স-৮২। বাবা মৃত মোহাম্মদ মঈনুদ্দিন মোড়ল। বাড়ি সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম নারায়ণপুর গ্রামে।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানি উপজেলার চাপতি বাজার থেকে দীর্ঘপথ পরিক্রমের মধ্যে দিয়ে রাজাকার ও পাকসেনাদের চোখ এড়িয়ে শেখ কামাল ও শেখ মুজিবের ভাগ্নে ইলিয়াছকে কালিগঞ্জের তারালী ইউনিয়নের রহিমপুর গ্রামের ঠান্ডাই গাজীর বাড়িতে আসেন।

সেখানে দু’ সপ্তাহ রাখার পর নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তুলে ছুটিপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হিঙ্গলগঞ্জে পোঁছে দিয়ে একইসাথে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষন নিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার সকালে নিজ বাড়িতে তার দীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন আশু মোড়ল।

এ সময় স্মৃতিচারণা করেন রহিমপুর গ্রামের ঠান্ডাই গাজীর ভাগ্নে মহাতাবউদ্দিন ও ছেলে মোকছেদ আলী।
আশরাদ আলী মোড়ল ওরফে আশু মোড়ল বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ২০ বছর। অভাবের তাড়নায় লেখাপড়া হয়নি। খুলনা থেকে সার কিনে এনে এলাকায় বিক্রি করতেন তিনি। আনুমানিক ১৯৭১ সালের মার্চের শেষের দিকে খুলনার ফুলতলায় বন্দুকের দোকান লুট হয়।

ওই দিন খুলনার তারপুকুর শাধিমর মোড় দরবার মেডিকেলের বারন্দায় তার সঙ্গে ব্যবসায়ি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি থানার চাপতা বাজারের আব্দুর রহমান মিনুর পরিচয় হয়। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় আব্দুর রহমান তাকে ওই দিন তার বাড়িতে (মধুমতী নদীর তীর) ডেকে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থানকালে তিনি মধুমতী নদীতে পাকিস্তানি খান সেনাদের গানবোর্ট চলতে দেখেছেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে দু’দিন পর তাকে নিয়ে ওড়াকাদি ঠাকুরবাড়ি (হংসীবদ, মিহির ও সমীর তিন ভাই) কে আনা হয়।

এক সপ্তাহ পর বাড়ি যাওয়ার ইছা প্রকাশ করায় মিহির ঠাকুর ভারত যেতে ইচ্ছুক এমন দু’জনকে সঙ্গে নিয়ে যেতে বলে হাত ২০ হাজার টাকা ধরিয়ে দেন। ওইদিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাদেরকে নিয়ে তিনি আব্দুর রহমানের বাড়িতে আসেন। সেখানে যেয়ে জানতে পারেন যে তার সঙ্গে থাকা মানুষ দু’টি একজন মুক্তিযুদ্ধের আহবানকারি শেখ মুজিবুর রহমানের ছেলে শেখ কামাল হোসেন (১৮) ও শেখ মুজিবর ভাগ্নে ইলিয়াছ (২১)।

পরদিন ভার যাত্রা শুরু করে পানকার নদী পেরিয়ে চর বেয়ে হাঁটতে হাঁটতে যশোর, খুলনা ও গোপালগঞ্জের বর্ডার গাজীরহাটে আসেন। আব্দুর রহমার একজন গোড়া আওয়ামী লীগার হওয়ার সুবাদে গাজীরহাটের চেয়ারম্যান হামুর সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেয়। হামু চেয়ারম্যানের সহায়তা নিয়ে পাকসেনা ও রাজাকারদের চোখ এড়িয়ে তারা (রেলগট থেকে সুশীলগাতি হয়ে) দৌলতপুরে আসনে। সেখান থেকে গল্লামারী গণরেডিও সেন্টারের পাশ দিয়ে কৈয়া বাজারের আগের একটি পথ বেয়ে দুপুর আড়াইটার দিকে বটিয়াঘাটা এলাকার সরাফপুর পৌঁছান তারা। সেখান থেকে তারা নৌকায় পাইকগাছার উদ্দেশ্য রওনা দেন। পথিমধ্যে মাঝির পরিচিত একটি বাড়িতে যেয়ে তারা খাওয়া দাওয়া করেন। তখন মাগরিবের আযান হয়।

সেখান থেকে নৌকাযোগে পাইকগাছার কাটাখালি তিন গাঙের মুখে এলে কেয়ারগাতির মুসলিম লীগ নেতা মকবুল চেয়ারম্যানের চারজন লোক তাদেরকে নৌকা ভিড়াতে বলে। এ সময় সাতক্ষীরা ক্যাম্পে দেওয়ার কথা বলে শেখ কামাল ও ইলিয়াছের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরদিন সকালে তারা আশাশুনি খেয়াঘাট আসেন সেখান থেকে পায়ে হেঁটে চাচাতো ভাই আমুদ আলীর কালিগঞ্জের তারালী ইউনিয়নের রহিমপুর শ্বোশুর ঠান্ডাই গাজীর বাড়ি যাই।

সেখানে শেখ কামাল, আব্দুর রহমান ও ইলিয়াছকে রেখে তিনি বাড়িতে আসেন। ঠান্ডাই গাজীর বাড়ির দোতলায় তাদেরকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ১৪ দিন রাখা হয়। রহিমপুর থেকে আটটি সাইকেল হেলিকপ্টার করে লাইনম্যান হিসেবে রাঙ্গার কৌশল বাবু গাজী, মোহাম্মদ গাজী, আবুল গাজী, নূর আব্দুল বিশ্বাস ও সামছুর রহমানসহ কয়েকজনের সহায়তায় সন্ধ্যায় ছুটিপুরের ঘাট মালিক ঘড়ি মোহাম্মদের সঙ্গে মাথাপিছু ২০০ টাকা চুক্তিতে নৌকায় ইছামতী পার হয়ে তারা হাসনাবাদে আসেন।

পরদিন হাসনাবাদ বাজারে ক্যাপ্টেন নুরল হুদার বাসায় যান তারা। খবর দিয়ে টাকী থেকে ডেকে আনা হয় মেজর আব্দুল জলিলকে। পরদিন তাদের নিয়ে যাওয়া হয়ে কলকাতার দমদম পাতিপুকুর। সেখান দেখা হয় জাতীয় নেতা তাজউদ্দিন আহম্মেদ, মুনসুর আহম্মেদ, তোফায়েল আহম্মেদ ও নজরল ইসলামের। সেখান থেকে তাকে (আশু) পার্কে সার্কাসে নিয় যাওয়া হয়। ১৯৬৫ সালে আনসার ট্রেনিং থাকায় শেখ কামালের কথামত তাকেও হাওড়া থেকে ট্রেন করে বিহারের চাকুলিয়ায় ট্রেনিং এ নিয়ে যাওয়া হয়।

খন মেজর জলিল ছিলেন ৯নং সেক্টর কমান্ডার। ১৪ দিন ট্রেনিং দিয়ে সেখান থেকে কামাল, ইলিয়াসের সাথে তাকেও হাসনাবাদ ফিরিয়ে আনা হয়। সেখান থেকে কালিগঞ্জ এসে একদিন বাড়িতে রাখার পর কামাল ও ইলিয়াছকে গোপালগঞ্জ পোঁছে দিয়ে বাড়ি ফেরেনি তিনি। বাড়ি ফিরেই আবার চলে যান হাসনাবাদ টাকীতে। সেখান থেকে সহকর্মীদের সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পাকাসেনা ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে নামেন তিনি। ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর নারায়নপুরের ডাকবাংলা (ওয়াপদা অফিস) থেকে পাক সেনাদের তাড়িয়ে আব্দুল জলিলের নেতৃত্ব মুক্তিযোদ্ধারা ওই স্থান দখল নেয়। ওইদিনেই সেখানে আব্দুল জলিলের পাকিস্তানী পতাকা পুড়িয়ে লাল সবুজের পতাকা তোলেন। এসময় তার সঙ্গে দেখা হয় শেখ মুজিবর ভাই নাসিরউদ্দিনর (খোড়া) সাথে। পরদিন সোহরাওয়ার্দ্দি উদ্যানে তোলা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা।

রহিমপুরের ঠান্ডাই গাজীর ছেলে মোকছেদ গাজী ও তার চাচা মহাতাবউদ্দিন বলেন, ঠান্ডাই গাজী ১৯৯৭ সালের ২৭ নভেম্বর মারা গেছেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিলের প্রথম দিক তারা শেখ কামাল, ইলিয়াস, আব্দুর রহমানকে দেখেছেন তাদের বাড়িতে। নিরাপত্তার কারণে শেখ কামালের কাছে দেওয়া হয় তাদের লাইসন্সকৃত বন্দুক। সেখানে থাকাকালিন পিস কমিটির সভাপতি ফজলুল করিম সানা, সদস্য ইমান আলী সানা, জামাত আলী, মোহর আলী সানা, ধোনাই সানা, খোদাবক্স গাজী ও খোদাবক্স সানাসহ একটি লোকও পর্যন্ত তাদের কোনপ্রকার সমস্যা করেনি। বরং নিরাপদে কালিগঞ্জ সীমান্ত পোঁছে দিতে সহায়তা করেছেন।

মুক্তিযোদ্ধা আশু মোড়ল আরো বলেন, ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কালিগঞ্জ এসেছিলেন। নির্বাচনের জন্য তিনি সোহরাওয়ার্দি মাঠে এক মঞ্চে এক ঘণ্টা বক্তব্যে দেন। সে সময় মঞ্চে ছিলেন ডাঃ হযরত আলী,গাজী আবু সাঈদ, বেতার শিল্পী শান্তি গোপাল চক্রবর্তী, শীতলপুরে মনির আহম্মেদসহ কয়েকজন।

আশু মোড়ল আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, শেখ কামাল ও ইলিয়াছকে সাক্ষাৎ পাক হানাদারদের কালো থাবা থেকে রক্ষা করে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি। একসাথে ট্রেনিং নিয়েছেন। ১৯৬৯ এ বঙ্গবন্ধু কালিগঞ্জে এসে কালিগঞ্জবাসিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উৎসাহিত করেছেন। অথচ যারা সেই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি তাদেরই স্মরণীয় কীতি সম্পর্কে কালিগঞ্জ কোন স্মৃতিস্তম্ভ নেই। এমনকি পশ্চিম নারায়নপুর হাসপাতালের পিছনে পাকসেনারা একইসাথে ১৪জনকে, গুলি­রখালের পাশে পাঁচজনকে (পাঁচপোতা নামে পরিচিত) গুলি করে মাটিতে পুঁতে ফেলছিল। এছাড়াও ওয়াপদা ডাকবাংলার পাশে বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকজনকে গুলি করে ড্রেন দিয়ে লাশ খালে ফেলে দেওয়া হয়। স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও সংরক্ষণ করা হয়নি ওইসব গণকবরগুলো।

বার্তাবাজার/এমকে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর