নারীকর্মীদের সুরক্ষায় সৌদিতে ‘মুসানেড সিস্টেম’ চালু হচ্ছে

নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এবার নারীকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ একটি আইটি প্ল্যাটফর্ম মুসানেড সিস্টেম স্থাপন করতে যাচ্ছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যকার তৃতীয় জয়েন্ট টেকনিক্যাল কমিটির সভায় সৌদি কর্তৃপক্ষ এ আশ্বাস দিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম রেজা।

সোমবার (২ ডিসেম্বর) প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান তিনি। গত ২৭ নভেম্বর রিয়াদে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সৌদি শ্রম ও সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে তৃতীয় জয়েন্ট টেকনিক্যাল কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সেলিম রেজা বলেন, ‘এই মুসানেড সিস্টেমে কর্মীদের বিস্তারিত ঠিকানা, সৌদি ও বাংলাদেশ রিক্রুটিং এজেন্সি এবং নিয়োগকর্তার পূর্ণ যোগাযোগের ঠিকানা, নারীকর্মীদের নিয়োগকর্তা পরিবর্তন-সংক্রান্ত তথ্যাদি, নারীকর্মীর আগমনের তারিখ এবং নিয়োগকর্তার কাছে হস্তান্তরের তারিখ, প্রত্যাবর্তনকারী গৃহকর্মীর এক্সিট সংক্রান্ত তথ্যাদি সন্নিবেশিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য তথ্যাদি হালনাগাদ করা হয়েছে। অবশিষ্ট তথ্যাদি হালনাগাদ কাজ চলমান রয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ সচিব বলেন, ‘বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি সাধারণ চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানান, এ বিষয়টি এখনও পরীক্ষাধীন রয়েছে। এবং আগামী জয়েন্ট টেকনিক্যাল কমিটির সভায় এ বিষযে আলোচনা হবে।

তিনি বলেন, ‘এবার সৌদি আরবের কর্তৃপক্ষকে অনেক আন্তরিক মনে হয়েছে। তারা ইতোমধ্যে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছেন। আরও নেবে বলেও জানিয়েছেন। তারা বাংলাদেশি কর্মীর ওপর নির্যাতন করায় এক দম্পতিকে হাজতে নিয়েছে। কর্মীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দিচ্ছে।

নীতিমালা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের নীতিমালায়ও কিছু পরিবর্তন না হবে। যেমন, যে সকল নারীকর্মী কাজ ত্যাগ করে পালাতক হয়েছেন, তাদেরকে পুলিশ কোনোভাবেই নিয়োগকর্তার কাছে হস্তান্তর করবে না। নারীকর্মী যতদিন কর্মরত থাকবেন ততদিন তার দায়-দায়িত্ব বাংলাদেশ ও সৌদি রিক্রুটিং এজেন্সি বহন করবে।

যে সকল নারীকর্মী প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় আছেন, তারা প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত তাদের আবাসন ও অন্যান্য দায়িত্ব রিক্রুটিং এজেন্সি বহন করবে। নারীকর্মীরা কর্মকাল পূর্ণ করলে তাদের নিরাপদে প্রত্যাবর্তনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট এজেন্সি বহন করবে এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস ও সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবে।

যদি নারীকর্মী মেয়াদ শেষে কাজ করতে চান তাহলে অবশ্যই চুক্তি নবায়ন করতে হবে এবং তা বাংলাদেশ দূতাবাস কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। চুক্তি নবায়নের পর সংশ্লিষ্ট এজেন্সি এ-সংক্রান্ত তথ্যাদি মুসানেড-এ আপলোড করবে।

ভিসা ট্রেডিং বন্ধের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ সচিব বলেন, উভয়পক্ষ ভিসা বাণিজ্য বন্ধের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। সৌদি কর্তৃপক্ষ এ ধরনের অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি আরোপ করা হবে মর্মে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলকে অবহিত করেছেন। ভিসা বাণিজ্য বন্ধের বিষয়ে উভয় দেশ একযোগে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছে। আমরা যৌথভাবে কাজ করব।

তিনি আরও বলেন, এ পর্যন্ত ভিসা ট্রেডিংসহ অন্যান্য অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িত থাকায় ১৬৪টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করে দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের অভিযোগ কেস টু কেস দেখা হবে। একই সঙ্গে, এই চেইনের সঙ্গে যারা জড়িত থাকবে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

সৌদি আরবে কর্মীদের স্বাস্থ্যবীমা নিয়ে নতুন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের বিদ্যমান স্বাস্থ্যবীমা পর্যাপ্ত নয়। অসুস্থ কর্মীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে স্বাস্থ্যবীমা করার জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষ কোস্পানি/ নিয়োগকর্তাদের বাধ্য করার উদ্যোগ গ্রহণ করবে বলে জানিয়েছেন।’

গৃহকর্মীদের ওপর নিয়োগকর্তাদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে মামলা করার কতটুকু সুযোগ সৌদি সরকার দেবে- এমন প্রশ্নের জবাবে সেলিম রেজা বলেন, ‘সৌদি শ্রম আদালতে মামলা করার পদ্ধতি আরও সহজ করার বিষয়ে দুপক্ষ একমত হয়েছে। এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোকে খুব শিগগিরই অবহিত করবে। সকল কর্মী যাতে চুক্তির কপি পেতে পারেন, সেজন্য সৌদি কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নেবে।’

তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে সৌদিতে নির্যাতনকারী এক দম্পতিকে আটক করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে একটি সমস্যাও রয়েছে, সেটা হলো আমাদের কর্মীরা মামলা বা অভিযোগ করে সেখানে থাকতে চান না। ফলে তাদের অভিযোগটি আমলে নেয়া হয় না। তারা অভিযোগ করেই দেশে চলে আসে। এছাড়া আমাদের দেশের কর্মীরা আকামা থাকা অবস্থায় চাকরি পরিবর্তনের কারণে অবৈধ হয়ে যাচ্ছেন। এজন্য সেদেশের কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে বলেছে।’

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমানে সারাবিশ্বে প্রায় এক কোটি ২০ লাক কর্মী রয়েছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ৪৭১ জন নারীকর্মী। মধ্যপ্রাচ্যের ১১টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নারীকর্মী রয়েছে সৌদি আরবে। সেখানে বর্তমানে দুই লাখ ৯৩ হাজার ৫৮৮ জন নারীকর্মী রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন কারণে দেশে ফেরত এসেছে আট হাজার ৫০৭ জন।

তারা সাধারণত থাকা ও খাওয়া সমস্যা, বাচ্চা রেখে যাওয়াসহ নানাভাবে শারীরিক নির্যাতনের কারণে দেশে ফেরত আসতে চান। এছাড়া সৌদি আরবে বাংলাদেশের সেফহোমে রয়েছে ১৪৬ জন, যারা দেশে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন। তবে সেফহোম থেকে ৩৮০ জন নারীকর্মী পুনরায় তাদের কর্মস্থলে ফিরে গেছেন।

গত ১১ মাসে সৌদি আরব থেকে ১৯ জর নারীকর্মীর মরদেহ দেশে ফেরত এসেছে। তারা শারীরিক অসুস্থতাসহ নানা কারণে মৃত্যুবরণ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক শামসুল আলম, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব জাহিদুল হোসাইনসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বার্তাবাজার/এমকে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর