যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতায় আধুনিকায়ন এবং আরও নানাবিধ সমস্যার কারণে বিলুপ্ত হচ্ছে নিত্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রী ও কৃষিযন্ত্র। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এই সামগ্রীগুলোর সাথে জড়িত ব্যবসায়ী এবং তাদের কারখানায় কর্মরত কামারশিল্পের কর্মচারীরা। সামগ্রিক অবস্থা এমন যে বংশানুক্রমে চলে আসা দীর্ঘদিনের এই ব্যবসা বন্ধ করে দেবার উপক্রম সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের। ফলে আমাদের গ্রামবাংলার নিত্যপ্রয়োজনীয় এবং একাধারে দেশীয় সংস্কৃতির বাহক এই শিল্পটির বিলুপ্তি কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
প্রসঙ্গত, আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি আবিস্কারের ফলে ইতোমধ্যে আমরা হারিয়েছি কাঠের দোন (পানি সেচের কাজে ব্যবহৃত) ও টিনের সেউতি। যান্ত্রিক পাওয়ারটিলার ও ট্রাক্টর আসায় যেভাবে হারিয়েছি গরুর হাল, লাঙল ও জোয়াল। ধানের ছড়া থেকে ধান আলাদা করতে এখন আর গরুর মুখে ঠুসি লাগিয়ে বাড়ির উঠানে ধান মাড়াই হয়না। সে জায়গা দখল করে ধান মাড়াইয়ের যন্ত্র। আধুনিকায়ন দেশীয় ঐতিহ্যের বিনাশ ঘটিয়েছে। পাশাপাশি এই জিনিসগুলো তৈরীর সাথে সম্পৃক্ত কারিগর ও ব্যবসায়ীরাও ছিটকে গেছেন ব্যবসা থেকে।
ঢাকার ধামরাইয়ের কালামপুর বাজার। কৃষিযন্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট কামারশিল্পের নিড়ানি, খোন্তা, কোদাল, শাবল, কাচি, কুড়াল ইত্যকার জিনিসের পাশাপাশি আরও দৈনন্দিন গৃহস্থালির লোহার জিনিসপত্র তৈরীতে ধামরাইয়ের কালামপুরের কামারশিল্পীরা বিভিন্ন সমস্যায় পড়েছেন জানালেন। মূলত কয়লার অপ্রতূল সরবরাহের কারণে
আমাদের দেশীয় ঐতিহ্যেরও ধারক এই শিল্পটি ক্রমশঃ বিলুপ্তির পথে।

ধামরাইয়ের কালামপুর বাজারে দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে এই ব্যবসা করে আসছেন উপজেলার কেলিয়ার বাসিন্দা সুবল কর্মকার। ব্যবসার এখন কি অবস্থা এবিষয়ে তার কাছে জানতে চাইলে বলেন, ‘আগে ৮০০/৯০০ টাকায় যে কয়লা কিনতাম এখন সেটা ২ হাজার টাকা। আর এই সামগ্রীগুলা বানানোর জন্য মূল জিনিসটাই হলো কয়লা। দাম বাড়ায় আর সরবরাহ কম থাকায় আমরা আগের মতো এই দাও, বটি, কোদাল, কুড়াল, খোন্তা, নিড়ানি, কাচি এসব বানাতে পারছি না। কয়লার দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে। কিন্তু পাবলিকের কাছে সেই হারে বেশী দামও রাখতে পারছি না। তাই যে পরিশ্রম আর বিনিয়োগ করছি এতে সেইভাবে লাভ হয় না।’
তিনি সরকারের কাছে কয়লার দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার পাশাপাশি এই শিল্পের সাথে যারা সম্পৃক্ত তাদেরকে লোন দেবার মাধ্যমে ব্যবসাটিকে টিকিয়ে রাখার আহ্বান জানান।
দীর্ঘ ২১ বছর ধরে কালামপুর বাজারে ব্যবসা করছেন শিমুল চন্দ্র কর্মকার। তার নিজের দুইটি কারখানায় ২০ জন কর্মচারী কাজ করে। তিনি বলেন, ‘আগে যে ইটভাটাগুলি ছিল যাদেরকে বাংলা ভাটা বলে, সরকার সেগুলি উঠিয়ে দিয়ে হাওয়া ভাটা করার নির্দেশ দেয়ায়ই মূলত বর্তমানে আমাদের কয়লার সংকট। আমাদের অধিকাংশ কয়লা আসতোই ওই বাংলা ভাটা থেকে। যেহেতু এসব জিনিসপত্র কারখানায় বানাবার মূল উপাদান কয়লা, এর অভাবেই বর্তমানে এই শিল্প ধ্বংসের পথে।’
তিনি আরও জানান, সরকার যদি হাওয়া ভাটার পাশাপাশি কিছু বাংলা ভাটাও রাখে, তাহলে সেগুলোর থেকে আসা কয়লায় আমাদের চাহিদা মেটে, দামও কম থাকে এবং সবমিলিয়ে এই কামারশিল্পটিকে আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারি।
এসময় তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘ আমার নিজেরই দুইটা কারখানা আছে যেখানে ২০ জন কারিগর কাজ করে।বর্তমানে তাদের বেতন দিতেই হিমশিম খাচ্ছি, এই ব্যবসা টিকায়ে রাখবো কিভাবে?’
দেশীয় ঐতিহ্যের ধারক কামার শিল্পীদের হাতে বানানো এসব নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী যাতে বিলুপ্ত না হয় তার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ধামরাইয়ের কালামপুর বাজারের কামারশিল্পীরা।
বার্তাবাজার/ডব্লিওএস