প্রচলিত একটি কথা আছে, যদি ইউরোপ-আমেরিকার স্বাদ পেতে চান, তাহলে ঘুরে আসুন সিঙ্গাপুর। হ্যাঁ। সত্যিই তাই! ধনী দেশের চাকচিক্য আর বিলাসিতার ছোঁয়া পেতে ঘুরে আসতে পারেন রঙিন এই শহর।
যেখানে শিক্ষা, প্রযুক্তি আর ব্যবসা-বাণিজ্য মিলেমিশে বিস্ময়কর উন্নয়নে একাকার। তবে এই শহরেও রয়েছে হাজারো মানুষের নীরব কান্না। যাদের শ্রম আর ঘাঁম এই উন্নয়ন, সেই তারাই পাননি নিম্নতম কোনো সুযোগ-সুবিধা। কিংবা মাথা গুজার মতো কোনো ঠাঁই।
আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, সিঙ্গাপুরে হাজারো মানুষ রাতে রাস্তার পাশে ফুটপাতে ঘুমিয়ে রাত কাটিয়ে দেন। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের একটি জরিপে দেখা গেছে, এক হাজারেও বেশি মানুষ প্রতিনিয়ত সিঙ্গাপুরের রাস্তায় ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেন।
যাদের নেই কোনো ঘর, নেই কোনো স্বচ্ছল জীবন-যাপনের নূন্যতম সক্ষমতা। অথচ এই সিঙ্গাপুরই বিশ্বের ধনীদের তালিকায় প্রথম সারিতে স্থান পাওয়া দেশ। মালয়েশিয়াভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম ‘সেস’ এর এক প্রতিবেদনে সিঙ্গাপুরের এমন চিত্র উঠে এসেছে
নিউ স্ট্রাইটস টাইমস এর বরাত দিয়ে সেস জানিয়েছে, রাস্তায় ঘুমানো এসব মানুষের বেশিরভাগই পুরুষ। যারা দীর্ঘ ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে এমন জীবনযাপন করছেন।
আর এর প্রধান কারণ হলো-তারা কর্মহীন, অল্প বেতন চাকরি, পারিবারিক সমস্যা এবং বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে কাজ করে জীবন পরিচালনা করেন। তবে গৃহহীন এসব মানুষদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে দেশটির বহু বছরের প্রাচীন সুলতান মসজিদ।
মসজিদ কতৃপক্ষ ঘোষণা করেছে, গৃহহীন এসব মানুষের অস্থায়ীভাবে থাকার জায়গা দেবেন তারা। সিঙ্গাপুরে গৃহহীন এসব মানুষের জন্য দেশটির প্রথম কোনো মসজিদ এমন ঘোষণা দিল।
‘দ্য পাটনার্স এংগেজিং অ্যান্ড এমপাওয়ারিং স্লিপারস নেটওয়ার্ক’ (পিয়ারস) নামের একটি সংস্থা দুইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদ এবং দেশটির সোশাল ও ফ্যামেলি উন্নয়ন(এমএসএফ) মন্ত্রণালয়ের আওতায় এ কাজটি করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
দ্য স্ট্রাইটস টাইমস জানিয়েছে, সংস্থাটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে কমিউনিটির বিরাট সংখ্যক এ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করবে। যাতে গৃহহীনরা স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের দেওয়া সহযোগিতা গ্রহণ করতে পারেন।
তবে আপাতত এই সংস্থার কোনো স্বেচ্ছাসেবী কিংবা কোনো কর্মী নেই, যারা এসব গৃহহীন মানুষের সহযোগিতায় প্রতিনিয়ত সেবা দিয়ে যেতে পারেন।
মসজিদটির সঙ্গে চারটি চার্চ, একটি মন্দির এবং একটি দাতব্য সংস্থা একযোগে এসব মানুষের সেবায় এগিয়ে এসেছে। গৃহহীন এসব মানুষদের রাতে ঘুমানোর জন্য তাদের আশ্রমে(মসজিদ) স্বাগত জানান। যেখানে রাস্তায় ঘুমানো এসব মানুষগুলো রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত সেখানে ঘুমানোর সুযোগ পাবেন।
মসজিদ সুলতানের সমাজ উন্নয়ন কর্মকর্তা মুহাম্মদ আইজুদ্দিন জামালউদ্দিন জানিয়েছেন, ইবাদতের পাশাপাশি গৃহহীন এসব মানুষগুলোর সহায়তায় এগিয়ে আসা আমাদের দায়িত্ব বলে মনে করি।
তাদের থাকার জন্য মসজিদের মূল ভবন এবং প্রার্থনার জায়গা একটু দূরে এ ব্যবস্থা করা হয়েছে। মসজিদের ডান পাশে অ্যানেক্স বিল্ডিংয়ের বেজমেন্টে গৃহহীন এসব মানুষের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের এই উদ্যোগ মসজিদে প্রার্থনা করতে আসা মুসল্লিদের কোনো সমস্যা করবে না। কারণ গৃহহীন মানুষের থাকার ঘরে প্রবেশের জন্য সেখানকার অন্য আরেকটি প্রবেশদ্বার রয়েছে।
যেসব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে
গৃহহীন এসব মানুষের থাকার জন্য মসজিদের বেজমেন্টে পাঁচজনের থাকার মতো কক্ষ রয়েছে। যেখানে নতুন ফ্যান,পরিস্কার বালিশ এবং আরামদায়ক বিছানা রয়েছে। এছাড়া রুমের ভেতরে রয়েছে বোতলজাত পানির ও সুব্যবস্থা রয়েছে।
তবে এই আশ্রয়স্থল ব্যবহার করার জন্য প্রথমেই তাদের(গৃহহীন)মসজিদের নিরাপত্তা দায়িত্বে থাকা কর্মীদের নিবন্ধন করতে হবে। জাতি,ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই আশ্রয়কেন্দ্রটি শুধুমাত্র পুরুষদের জন্যই করা হয়েছে।
মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভবিষ্যতে তারা এই উদ্যোগটি আরও বিস্তৃত আকারে করার জন্য বিবেচনা করে দেখবেন। আপাতত মসজিদের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সেখানে গৃহহীন এসব মানুষ থাকার জন্য বেশ কয়েকরাত সুযোগ পাবেন। এর পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন সরকারি ও উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে এসব মানুষেরা যাতে নিরাপদ এবং স্থায়ী জায়গা খুঁজে পান সে ব্যবস্থা করা হবে।
বার্তাবাজার/কেএ