১৯৭১ সালের এই দিনে স্থানীয় শান্তি কমিটির সহায়তায় বর্বর পাক হানাদারবাহিনীর সদস্যরা ঘিওর থানা সদর থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার উত্তরে তেরশ্রী এলাকায় তেরশ্রী স্টেটের সাবেক জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরী ও তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমানসহ ৪৩ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে গুলি করে, বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।
আসলে এটি কোন যুদ্ধের ঘটনা ছিল না। ছিল বিশ্বাসঘাতকতা, স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করার অপচেষ্টা। যে শিশুটি জন্মেছিল ’৭১ কিংবা আরও পরে- এই বাড়ন্ত যুবকটি কি জানে তেরশ্রী গণহত্যা দিবস কী? কেন এই নৃশংস নির্মম হত্যাকা-? মানিকগঞ্জের তেরশ্রী একটি রক্তাক্ত ইতিহাস।
স্থানীয় এক শিক্ষকের পূর্ব পরিকল্পনা এবং পাক সেনাদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগের মাধ্যেমে ২২ নভেম্বর ভোরে ঘিওর ও দৌলতপুর থানার তথাকথিত শান্তি কমিটির নেতৃবৃন্দ রাজাকার ও পাকবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে তেরশ্রী জনপদের সেনপাড়ায় কালীঘরের সামনে এসে মিটিং করে এবং তারা মাথায় ও মুখে কালো কাপড় বেঁধে সংখ্যালঘুদের পাড়ায় ঢুকে লুটপাট ও পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে মেশিনগানের গুলিবর্ষণ করে হত্যা করে। এলাকার নিরীহ লোকজন ছোটাছুটি করে পালানোর চেষ্টা করে। স্থানীয় সাবেক জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরীকে মাথায় শাল চাদর মুড়িয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।
তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমানকে বাসা থেকে ডেকে এনে তেরশ্রী বাজারে প্রকাশ্যে বুকে বেয়োনেট চার্জ করে হত্যা করে। তাদের সঙ্গে এলাকার আরও ৪১ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে গুলি করে হত্যা করে।
স্বাধীনতালাভের পর থেকেই তেরশ্রীতে ৪৩ জন শহীদের স্মরণে একটি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি ছিল তেরশ্রী এলাকার শহীদ পরিবারসহ এলাকাবাসীর। অবশেষে ২০১২ সালে ঐতিহ্যবাহী তেরশ্রীর বিস্তীর্ণ সবুজ প্রকৃতির বুকে ৩০ ফুট ও ১৭ ফুট উচ্চতার দুটি স্তম্ভ মূল বেদির ওপর দন্ডায়মান দৃষ্টিনন্দন নক্সায় নির্মিত হয় এই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ।
ঢাকা, মানিকগঞ্জ, ঘিওর, তেরশ্রী-দৌলতপুর, নাগরপুর, টাঙ্গাইল আঞ্চলিক মহাসড়কের কোলঘেঁষে তেরশ্রী হাই স্কুল ও তেরশ্রী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন তেরশ্রী বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিম পাশে বিশাল আকারে নির্মিত তেরশ্রী শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি সর্বস্তরের মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে।
প্রতিদিন যাত্রাপথে বিভিন্ন জেলা-উপজেলাসহ গ্রামীণ জনপদের মানুষ ঐতিহ্যবাহী তেরশ্রীতে এমন একটি নান্দনিক স্থাপনা দেখে মুগ্ধ হন। মাথানত হয়ে আসে শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধায়।
বার্তাবাজার/এমকে