এমপিওভুক্তির পর তৈরি হচ্ছে কলেজ!

নেই কোন শ্রেণি কক্ষ, নেই টেবিল, বেঞ্চ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী তবুও সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাগবাটি টেকনিক্যাল এন্ড বিএম কলেজ স্থান পেয়েছে এমপিও তালিকায়।

এমন অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হওয়ায় জনমনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। এমপিও হওয়ার পর রাতের আঁধারে বাগবাটি ইউনিয়নের চর নান্দিনা গ্রামে সাইনবোর্ড বসানোসহ ইতিমধ্যে ঘর নির্মাণ ও বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরির কাজ শুরু করেছে। কাগজে-কলমে কলেজটির প্রতিষ্ঠা বেশ পূর্বে দেখানো হলেও বাস্তবে এর কোনও অস্তিত্ব ছিল না।

এদিকে ভুইফোঁড় কলেজের সাইনবোর্ড দেখে বিস্মিত হয়েছেন এলাকাবাসী। বিষয়টি ওই এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। কলেজের কার্যক্রম কীভাবে পরিচালনা করা হতো, তা স্থানীয়রা এখনও জানতে পারেনি। কাগজে-কলমে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা কার্যক্রম চললেও বাস্তবে সব চিত্রই উল্টো। এমপিওভুক্তির নীতিমালা না মেনে কীভাবে এই প্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্তির নামের তালিকায় আসে, এ প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের। এ নিয়ে সিরাজগঞ্জের শিক্ষক মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২১ নভেম্বর) সরজমিন পরিদর্শন করলে দেখা যায়, সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাগবাটি ইউনিয়নের চর নান্দিনা গ্রামে রাস্তার ধারে নতুন একটি সাইনবোর্ড ঝুলানো হয়েছে। যেখানে লেখা রয়েছে-বাগবাটি টেকনিক্যাল এন্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ।

সাইনবোর্ডের সূত্র ধরে ২০০ গজ সামনে এগিয়ে গেলে দেখা যায় ৫ থেকে ৬ জন কাঠমিস্ত্রী একটি পুরানো ভিটায় টিনের ঘর নির্মানের কাজ করছে।পতিত সেই মাঠে কলেজের কোনো ভবন, গেট বা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অস্তিত্বের দেখা মেলেনি। পরে এটা কি হচ্ছে জিজ্ঞাসা করলে শ্রমিকরা বলেন, বাগবাটি টেকনিক্যাল এন্ড বিএম কলেজ সরকারি হয়েছে তাই এই ভিটায় ঘর তোলা হচ্ছে। এটা কলেজ হবে।

এর এক পর্যায়ে মো. আব্দুর রহমান নামক এক ব্যক্তি এগিয়ে এসে বলেন, আমি কাগজ কলমে এই কলেজের কম্পিউটার শিক্ষক ১৬ বছর ধরে, এবার আমাদের কপাল খুলেছে তাই আমরা ঘর তৈরি করছি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক দৌড়ে এসে প্রতিবেদককে বলেন, আমরা সব জায়গায় টাকা দিয়ে আগে কলেজ এমপিও করেছি এখন ঘর উঠানো হয়ে গেলে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করবো। ক্লাস রুম ও শিক্ষার্থী ছাড়া কলেজ এমপিও হয় কিভাবে এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, আমাদের অধ্যক্ষ এশারত আলী একজন বিখ্যাত মানুষ। তার ব্যাগে কাগজপত্র, আর সিল থাকলেই তিনি সবকিছু করতে পারেন।

উপজেলা প্রশাসন, জেলা শিক্ষা অফিস, কারিগরি শিক্ষাবোর্ড আর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এশারত আলীর হাতের মুঠোয়। তিনি যে কোন আবেদন করলে অলৌকিকভাবে মঞ্জুর হয়ে যায়। যার জলন্ত প্রমাণ এই কলেজ (বাগবাটি টেকনিক্যাল এন্ড বিএম কলেজ)। তাহলে বোঝেন অধ্যক্ষ এশারত আলীর কি ক্ষমতা?

জনমনে প্রশ্ন কিভাবে এই প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্তি তালিকায় গেলো, সেটিই বড় প্রশ্ন। স্থানীয়রা জানায়, সদর উপজেলায় এমপিওভুক্ত হওয়ার যোগ্য বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থাকলেও সেগুলো না করে নিজস্ব জায়গা ও অবকাঠামো না থাকলেও নামসর্বস্ব ‘বাগবাটি টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ’ এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। ভুয়া প্রতিষ্ঠানের এমপিও বাতিল করে এর সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবি করেছে স্থানীয়রা।

এ বিষয়ে কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের উপ-পরিদর্শক প্রকৌশলী আব্দুল হান্নান এর সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান, কোন মাটির ভিটা বা খালি জায়গার উপর প্রতিষ্ঠান এমপিও হতে পারে না। এধরনের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে তাদের প্রতিষ্ঠানের এমপিও বাতিল হয়ে যাবে।

এদিকে বাগবাটি টেকনিক্যাল এন্ড বিএম কলেজের অধ্যক্ষ মো. এশারত আলী বলেন, কলেজের জায়গা কাগজপত্র ঠিক আছে বলেই বাগবাটি টেকনিক্যাল এন্ড বিএম কলেজটি এমপিও হয়েছে। এখন আমরা ঘর নির্মাণ করছি এক মাসের মধ্যে আমরা খালি জায়গায় কলেজ বানিয়ে ফেলবো।

তথ্যানুসন্ধানে আরও জানা যায়, বাগবাটি টেকনিক্যাল এন্ড বিএম কলেজের অধ্যক্ষ এশারত আলী কলেজে চাকুরি ও শিক্ষকদের এমপিও করে দেয়ার নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এখন তাঁর নিয়ন্ত্রিত কলেজটি এমপিও হওয়ায় ৪০টি শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে বলে ঘোষণা দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার মিশনে নেমেছেন।

সিরাজগঞ্জ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শফি উল্লাহ বলেন, এমপিওভুক্তির আবেদন সরাসরি করা হয়েছে। আবেদনের আগে বা পরে জেলা থেকে কোন খোঁজখবর নেয়ার সুযোগ ছিল না। তবে অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

বার্তাবাজার/এমকে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর