কলেজছাত্রীকে পতিতা এবং কৃষককে মাদক ব্যবসায়ী বানালেন আ’লীগ নেতা

টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলায় ধর্ষণের শিকার বিচারপ্রার্থী এক কলেজছাত্রীকে পতিতা এবং ধর্ষিতার বাবাকে মাদক ব্যবসায়ী বানিয়ে দিয়েছেন এক আওয়ামী লীগ নেতা। অভিযুক্ত এই আওয়ামী লীগ নেতার নাম মতিউর রহমান মতি।

তিনি টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলার ধুবড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। এ ঘটনা নিয়ে নাগরপুর উপজেলা জুড়ে চলছে সমালোচনার ঝড়। উপজেলার ধুবড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান মতিউর রহমান তার ইউনিয়ন পরিষদের প্যাডে ধর্ষণের শিকার কলেজছাত্রীকে দেহ ব্যবসায়ী ও তার নিরীহ কৃষক বাবাকে মাদক ব্যবসায়ী আখ্যা দিয়ে গত ৫ নভেম্বর জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং বার সমিতির কাছে প্রতিবেদন দেন তিনি।

ওই ঘটনার পর লোকলজ্জায় বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না ভুক্তভোগী কলেজছাত্রী। এই অবস্থায় কলেজে যাওয়াটাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ওই ছাত্রীর। জানা যায়, ওই কৃষকের কলেজে পড়ুয়া মেয়েকে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করত উপজেলার সারুটিয়াগাজি গ্রামের জয়ধর শেখের ছেলে জুয়েল রানা। বিয়ের প্রস্তাবও দেয় সে; কিন্তু ছাত্রীর বাবা সেই প্রস্তাবে রাজি হননি।

এতে ক্ষিপ্ত হয়ে জুয়েল রানা ২০১৮ সালের ১২ জুলাই বন্ধুদের সহযোগিতায় স্থানীয় একটি ব্রিজের কাছ থেকে ওই কলেজছাত্রীকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে।
ধর্ষক জুয়েল রানা ওই ছাত্রীকে তার আত্মীয়ের বাড়িতে তিন দিন আটকও রাখে।

কিন্তু ছাত্রী কৌশলে ওই বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে তার বাবা-মাকে ঘটনা খুলে বলে। পরে ছাত্রীর বাবা ধুবড়িয়া গ্রামের মাতব্বরদের বিষয়টি জানিয়ে এর বিচার দাবি করেন। কিন্তু ঘটনাটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী হলেও বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার জন্য তালবাহানা ও সময়ক্ষেপণ করে আসছিলেন মাতব্বররা।

এ কারণে ধর্ষিতার বাবা ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন। আসামিরা হল- উপজেলার সারুটিয়াগাজি গ্রামের জয়ধর শেখের ছেলে মো: জুয়েল রানা (২২), ধুবড়িয়া গ্রামের হায়েদ আলীর ছেলে শিপন (২৬), রিপন (২৩), উফাজ (৪২) ও একই গ্রামের বাবুল মিয়ার ছেলে রিয়াজ মিয়া (২১)।

তবে মামলা দায়ের করার পর থেকেই আসামিরা মামলা তুলে নেয়ার জন্য বাদীকে নানাভাবে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখায় বলে অভিযোগ রয়েছে। সিআইডি মামলার তদন্ত রিপোর্ট দাখিলের পর আসামিরা আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তারা এলাকার প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে সাহস পাচ্ছে না।

সম্প্রতি আসামিরা ধুবড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে ম্যানেজ করে ধর্ষণের ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়ার পথ বের করে। চেয়ারম্যান ধর্ষকদের পক্ষ নিয়ে ধর্ষণের শিকার কলেজছাত্রীকে দেহ ব্যবসায়ী ও তার পিতাকে মাদক ব্যবসায়ী আখ্যা দিয়ে আসামিদের পক্ষে প্রতিবেদন তৈরি করে জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার ও বার সমিতির কাছে জমা দেন।

মামলায় সিআইডি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- ‘কলেজছাত্রীর বাবা একজন হতদরিদ্র কৃষক। তিনি দিনমজুরের কাজ করেন। স্ত্রী ও চার কন্যাসন্তান নিয়ে জীবনযাপন করছেন। ওই কৃষকের মেয়ে এসএসসি পাস করে কলেজে লেখাপড়া করে আসছে। স্কুলে পড়ার সময় ছাত্রীর সঙ্গে জুয়েল রানার পরিচয় হয়।

জুয়েল ছাত্রীকে ভালোবাসার প্রস্তাব দিলে সে প্রত্যাখ্যান করে। এ কারণে জুয়েল এ ঘটনা ঘটায়।’ ভুক্তভোগী কলেজছাত্রীর বাবা অভিযোগ করেন, ধুবড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমার পরিবারকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছেন; যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

চেয়ারম্যান ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী আমাকে গ্রাম থেকে চলে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে এখন নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।
জানতে চাইলে ধুবড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের অভিযুক্ত চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মতিউর রহমান মতি বলেন,‘এলাকার লোকজন বলেছে- তাই প্রতিবেদন দিয়েছি।’

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল জজকোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট এস. আকবর খান বলেন,‘আদালত কর্তৃক দোষী না হওয়া পর্যন্ত কাউকে মাদক ও দেহ ব্যবসায়ী বলার এখতিয়ার কারও নেই। চেয়ারম্যান যে প্রতিবেদন দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত। এক্ষেত্রে অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যানের শাস্তি হওয়া উচিত।’

এ বিষয়ে নাগরপুর থানা পুলিশের ওসি আলম চাঁদ জানান, ভুক্তভোগী কলেজছাত্রীর বিরুদ্ধে অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান যে প্রতিবেদন দিয়েছেন তা সঠিক নয়। ওই পরিবারের নামে মাদক ও দেহ ব্যবসার বিষয়ে এলাকায় ও থানায় কোনো অভিযোগ নেই। ধর্ষণে অভিযুক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে এবং আসামিরা পলাতক আছে। মেয়েটির পরিবারের নিরাপত্তার প্রতি বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।

বার্তাবাজার/কেএ

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর