বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার উথলীতে নবান্ন উৎসব উপলক্ষে হয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা। শত বছরের এই মেলাকে কেন্দ্র করে আশপাশের ১৫ গ্রামের স্বজনদের মিলনমেলাও দেখা গেছে এখানে।
সোমবার (১৮ নভেম্বর) নবান্ন উৎসব ঘিরে দিনব্যাপী চলা মাছের মেলায় শিবগঞ্জসহ আশপাশের এলাকার মানুষের ভিড় জমে। এবারের মেলায় দেড় হাজার মণের বেশি মাছ বেচাকেনাও হয়েছে।
এক থেকে শুরু করে ১২ কেজি ওজনের রুই, কাতলা, চিতল, বিগহেড, কার্পসহ হরেক রকমের মাছ বিক্রি হয় মেলায়। তবে বিগত বছরের তুলনায় এবার মাছের দাম ছিল বেশি। বিশাল আকৃতির রুই-কাতলা ও চিতল মাছ ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও মাঝারি আকারের মাছ ৪২০ টাকা থেকে ৫৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। এছাড়া ২৪০ টাকা দরে বিগহেড ও সিলভার কার্প বেচাকেনা হয়।
বগুড়ার মোকামতলা-জয়পুরহাট আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশেই ইট বিছানো একটি পথ। মোড়ে দাঁড়াতেই বেশ দূর থেকে মাইকের শব্দ কানে ভেসে আসে। শুনতে পাওয়া যায় মাছ বিক্রির ডাক, ‘বড় বড় মাছ নেন, রুই-কাতলা-চিতল নেন।
বগুড়ার শিবগঞ্জের উথলীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নবান্ন উৎসব উপলক্ষে সোমবার (১৮ নভেম্বর) বসেছিল মাছ মেলা। মেলায় মাছ কেনাবেচা হয়েছে প্রচুর। দেড় কেজি থেকে শুরু করে ২০ কেজি ওজনের বাঘাইড়, বোয়াল, রুই, কাতলা, চিতল ও সিলভার কার্পসহ হরেক রকমের মাছ বিক্রি হয় মেলায়। তবে দাম ছিল বেশি। অনেক ক্রেতা দামের কারণে পছন্দের মাছ কিনতে পারেননি।
বিশাল আকৃতির বাঘাইড়, বোয়াল, রুই, কাতলা ও চিতল মাছগুলো এক হাজার থেকে ১৬০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। তবে মাঝারি আকারের মাছ ৩০০ টাকা থেকে ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। এছাড়া ২০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে ব্রিগেড ও সিলভার কার্প মাছ বেচাকেনা হয়।
স্থানীয়রা জানায়, ২০০ বছরের প্রাচীন উথলী মাছ মেলাকে কেন্দ্র করে আশপাশের ২০ গ্রামে স্বজনদের মিলনমেলায় পরিণত হয়। গ্রামের লোকজন আত্মীয়-স্বজনকে দূর-দূরান্ত থেকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসেন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পঞ্জিকা অনুসারে সোমবার পয়লা অগ্রহায়ণ হওয়ায় নবান্ন উৎসব পালন করে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর মাছের মেলা বসে উথলীতে।
তবে এটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসব হলেও উথলী, রথবাড়ি, ছোট ও বড় নারায়ণপুর, ধোন্দাকোলা, সাদুল্যাপুর, বেড়াবালা, আকনপাড়া, গরিবপুর, দেবীপুর, গুজিয়া, মেদেনীপাড়া, বাকশন, গণেশপুর, রহবল শিবগঞ্জসহ আশেপাশের ২০ গ্রামের মানুষের ঘরে ঘরে চলে উৎসবের আয়োজন। প্রতিটি বাড়িতেই মেয়ে জামাইসহ আত্মীয়-স্বজনকে আগে থেকেই নিমন্ত্রণ করা হয়। পরিবারের সবাইকে নিয়ে তারা নতুন ধানের নবান্ন উৎসবে মেতে ওঠেন। খাওয়ানো হয় বড় বড় মাছ। আর জামাইকে দেয়া হয় মাছের মাথা।
নবান্ন উপলক্ষে মাছ মেলা শুধু নয়, জমি থেকে নতুন তোলা অন্যান্য শাক-সবজির পসরাও সাজানো হয় মেলা চত্বরে। মেলায় নতুন আলু বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকা কেজি দরে। এছাড়া মিষ্টি আলু ও কেশর (ফল) প্রতি কেজি দেড়শ টাকা বিক্রি হয়েছে।
গাইবান্ধার বালাসী ঘাটে যমুনা নদীতে ধরা পড়া পাঁচটি বিশাল আকৃতির বাঘাইড় মাছ বিক্রি করতে মেলায় এসেছিলেন ব্যবসায়ী আব্দুল মতিন মিয়া। তার কাছে থাকা প্রতিটি বাঘাইড় মাছের ওজন ১২ থেকে ১৫ কেজি। প্রতি কেজি মাছের দাম চান ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা। কিন্তু ক্রেতার উৎসাহ কম। বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চারটি মাছ বিক্রি করতে পেরেছেন তিনি। ১৫ কেজি ওজনের একটি বাঘাইড় ১২ হাজার টাকা বিক্রি করেছেন মতিন।
যমুনা নদী থেকে ধরা বোয়াল মাছ এনেছিলেন ব্যবসায়ী রঞ্জন। সাড়ে ১৫ কেজির ওজনের একটি বোয়াল মাছের দাম হাঁকেন ১৫০০ টাকা কেজি হিসাবে। এর মধ্যে একটি বোয়াল বিক্রি হয় ১৩০০ টাকা কেজিতে। গত বছরের তুলনায় এবার মাছের দাম বেশি। তাই বেচাকেনা তেমন হয়নি।
মাছ বিক্রেতা কালাই উপজেলার পুনট গ্রামের লাল মিয়া বলেন, মেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে দেড় শতাধিক মাছের দোকান বসেছে। প্রত্যেক বিক্রেতা অন্তত ছয় থেকে ১০ মণ করে মাছ বিক্রি করেছেন। মেলায় মাছ সরবরাহের জন্য ২০টি আড়ত খোলা হয়। সেসব আড়ত থেকে স্থানীয় বিক্রেতারা পাইকারি দরে মাছ কিনে মেলায় খুচরা বিক্রি করেন।
বার্তা বাজার/এম.সি