ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পে ১০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ গচ্চা যাচ্ছে সরকারের। প্রকল্প পরিচালকের অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থ আত্মসাতের কারণে এই টাকা গচ্চা যাচ্ছে। সম্প্রতি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মহিবুল হকের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট থেকে ভয়াবহ এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে। মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে এই তদন্ত করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে চলমান শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে প্রশাসনিক দুর্নীতি রোধে বিমান মন্ত্রণালয় এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
জানা গেছে, প্রকল্প পরিচালক ইচ্ছাকৃতভাবে বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের টাকা কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কোষাগারে জমা দেননি। নির্ধারিত সময়ে টাকা জমা না দেয়ায় তা বেড়ে গিয়ে আরও ১০০ কোটি টাকা বেশি হয়ে গেছে। এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক আমিনুল হাসিবের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করে বৃহস্পতিবার তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।
মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রকল্প পরিচালকের উদাসীনতা, গাফিলতি, অদক্ষতা, দুর্নীতি ও ব্যর্থতার কারণে সরকারের এই অর্থ গচ্চা যাবে। তদন্তকারী কর্মকর্তা তার রিপোর্টে আরও উল্লেখ করেন, আমিনুল হাসিব বিমানবন্দরের ৩৭ কোটি টাকার সীমানা প্রাচীর নির্মাণেও গুরুতর অনিয়ম করেছেন। সীমানা প্রাচীরটি দরপত্রের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী করেননি। তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণে এ প্রকল্পের কার্যক্রম এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। প্রকল্পের প্রতিটি পদে পদে মারাত্মক ত্রুটি রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, এ ঘটনায় সিভিল এভিয়েশনের প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীও দায়ী। তিনি কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারেন না। কারণ দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরের যেসব প্রকল্প চলমান আছে সেগুলোর সব ধরনের কার্যক্রম প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে পরামর্শক্রমে করা হয়ে তাকে। এজন্য তাকেও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
তদন্ত রিপোর্টে আরও বলা হয়, বেবিচকের নির্বাহী প্রকৌশলী আমিনুল হাসিবকে ২০১২ সালের ৪ আগস্ট কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের (পিডি) পরিচালক নিয়োগ করা হয়। গত মে মাসের মধ্যে এ প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের অর্থ জমা দেয়ার জন্য কথা ছিল কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকেও এ বিষয়ে তাগিদপত্র দেয়া হয় প্রকল্প পরিচালককে। কিন্তু আমিনুল হাসিব স্থানীয় ভূমি মালিক ও জেলা প্রশাসনের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এই টাকা জমা দেননি। এতে ভূমি অধিগ্রহণ মামলাটি বাতিল হয়ে যায়। আগের মামলাটি পুরাতন অধিগ্রহণ আইনের আওতায় হওয়ায় ক্ষতিপূরণ বাবদ জমির বর্তমান দামের দেড়গুণ হারে পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু মামলাটি বাতিল হওয়ায় তা এখন ২০১৭ সালের আইনের আওতায় বর্তমান দামের ৩ গুণ হারে পরিশোধ করতে হবে। এতে অধিগ্রহণের ব্যয় আরও ১০০ কোটি টাকার মতো বেড়ে যাবে বলে তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়। রিপোর্টে বলা হয়, প্রকল্প পরিচালক এই অবৈধ কাজটি করার জন্য সংশ্লিষ্ট জমির মালিক ও দালালদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ নিয়েছেন। অপরদিকে অধিগ্রহণ মামলাটি বাতিল হলেও দীর্ঘ ৪ মাসেও তিনি অধিগ্রহণের টাকা পুনরায় জমা দেয়ার জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেননি।
তদন্তে আরও বলা হয়, বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের এই টাকা সিভিল এভিয়েশনের নিজস্ব অর্থায়নে করার কথা থাকলেও প্রকল্প পিডি তা না করে সেটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠান। এতে সিভিল এভিয়েশন মন্ত্রণালয়ের স্বার্থ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়।
জানা গেছে, কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প চলাকালীন বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পটি আমিনুল হাসিবের ওপর ন্যস্ত করা হয়। ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর সরকার এই প্রকল্পটি অনুমোদন করেন। কিন্তু প্রকল্প পরিচালকের অদক্ষতা, ধীরগতি ও ব্যর্থতার কারণে গত এক বছরেও প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা সম্ভব হয়নি। আমিনুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বেবিচকের প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে বাধা দেন।
এ প্রসঙ্গে সিভিল এভিয়েশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আমিনুল হাসিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে বেবিচকের একজন কর্মকর্তা বলেন, আমিনুল হাসিবকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে তার কাছে কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে।
বার্তাবাজার/ডব্লিওএস