গৃহবধূ সগিরা মোর্শেদ। ১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই বিকালে মেয়েকে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে নিয়ে রিকশাযোগে ফিরছিলেন বাড়িতে। স্কুলের সামনেই তাদের রিকশার গতি রোধ করে সগিরা মোর্শেদের স্বর্ণালঙ্কার ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে মোটরসাইকেলের দুই আরোহী। বাধা পেয়ে এক আরোহী ওই গৃহবধূর হাতে ও বুকে গুলি করে পালিয়ে যায়। পথচারীরা সগিরা মোর্শেদকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের হলেও সবাই এতদিন ধারণা করেছিলÑ এটি ছিল নিছক একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা। ওই ঘটনার ৩০ বছর পর জানা গেল ছিনতাই নয়, এটি পরিকল্পিত একটি হত্যাকা-।
৩০ বছর পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে উঠে আসে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। পারিবারিক বিরোধের জেরে মাত্র ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ভাড়াটে কিলারদের দিয়ে গৃহবধূ সগিরা মোর্শেদকে খুন করান আর কেউ নয়, তার ভাসুর ও জা। এ হত্যাকা-ে জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই।
তারা হলেন সগিরা মোর্শেদের স্বামীর ভাই ডা. হাসান আলী চৌধুরী, তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহীন, প্যান ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তা আনাস মাহমুদ রেজওয়ান ও ভাড়াটে কিলার মারুফ রেজা (বর্তমানে আবাসন ব্যবসায়ী)। গত ১০ নভেম্বর আনাস মাহমুদ, ১১ নভেম্বর ডা. হাসান আলী চৌধুরী ও তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহীন, ১৩ নভেম্বর মারুফ রেজাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই চারজনই আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
পিবিআই-প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার জানান, গৃহবধূ সগিরা মোর্শেদ হত্যাকা-ের পর তার স্বামী আব্দুছ ছালাম চৌধুরী রমনা থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় পুলিশ ও ডিবি তদন্ত করে মন্টু মিয়া নামে একজনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয়। কিন্তু সগিরা মোর্শেদকে গুলি করার সময় মোটরসাইকেলে দুজন ছিলেন, তাই একজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়ায় আদালতে নারাজি আবেদন করা হয়। এক আইনজীবী রিট করার ফলে মামলাটি দীর্ঘদিন আদালতে ঝুলে ছিল। চলতি বছর ১১ জুলাই উচ্চ আদালতের নির্দেশে মামলাটির তদন্ত শুরু করে পিবিআই।
তদন্তে নেমে হত্যাকা-ে জড়িত সন্দেহে হাসান আলী চৌধুরী, সায়েদাতুল মাহমুদা শাহীন, মারুফ রেজা, আনাস মাহমুদ ওরফে রেজওয়ানকে গ্রেপ্তার করে পিবিআইয়ের তদন্তসংশ্লিষ্টরা। চারজনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, পারিবারিক বিরোধের জেরে সগিরা মোর্শেদকে হত্যা করার জন্য তার ভাসুর হাসান আলী চৌধুরী ও জা সায়েদাতুল মাহমুদা শাহীন ২৫ হাজার টাকায় ভাড়াটে কিলার মারুফ রেজার সঙ্গে চুক্তি করেন। হত্যাকা-ের দিন সগিরা মোর্শেদ তার মেয়েকে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে নিয়ে ফিরছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী পথে মারুফ রেজা তার এক সহযোগীসহ মোটরসাইকেলে করে এসে সগিরা মোর্শেদের রিকশার গতি রোধ করে। মারুফ রেজা প্রথমে সগিরা মোর্শেদের হাতের সোনার চুড়িসহ অন্য গয়না ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেন। এ সময় সগিরা মোর্শেদ বাধা দিলে মারুফ রেজা গুলি করেন, যার একটি সগিরা মোর্শদের হাতে ও একটি বুকে লাগে। এর পর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় খুনিরা।
হত্যার কারণ সম্পর্কে পিবিআই-প্রধান বলেন, নিহত সগিরা ও গ্রেপ্তার সায়েদাতুল শাহীন সম্পর্কে জা। পারিবারিক দ্বন্দ্বে সগিরাকে শায়েস্তা জন্য মারুফ রেজাকে নিয়োগ করা হয়। সায়েদাতুলের পরিকল্পনায় যুক্ত হন তার স্বামী ডা. হাসান আলী চৌধুরী। তার রোগী ছিলেন প্যান ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তা আনাস মাহমুদ রেজওয়ান। শায়েস্তা করার কথা আনাস মাহমুদকে জানান হাসান আলী। তখন আনাস মাহমুদ হত্যা মিশন পরিচালনার দায়িত্ব দেন মারুফ রেজাকে। সে অনুযায়ী মারুফ রেজা প্রথমে ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেন; বাধা দেওয়ার পর সগিরা মোর্শেদকে গুলি করেন। এতেই তিনি মারা যান। তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিল করার জন্য আরও দুমাস সময় চাওয়া হয়েছে আদালতে। এই সময়ের মধ্যে অভিযোপত্র দাখিল করা হবে।
বার্তাবাজার/ডব্লিওএস