ট্রেন চলছে। ছোট্ট শিশু আদিবা আক্তার সোহা ওরফে ছোঁয়ামণি তার মা নাজমা বেগমের কোলে ঘুমিয়ে ছিল। হঠাৎ বিকট শব্দ। দুমড়ে মুচড়ে যায় ট্রেন। এতে নাজমা বেগমের কোমরের নিচের অংশ আটকা পড়ে ট্রেনের ভাঙা অংশে। মাথায় লোহার আঘাত পেয়ে মায়ের বুকের ওপর কাতরাচ্ছিল ছোঁয়ামণি। মেয়ের রক্তে মায়ের বুক ভেসে যাচ্ছিল!

ছোঁয়ামণি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে মায়ের বুকেই। ওর বয়স ছিল দুই বছরের একটু বেশি। নাজমা বেগমের মতো আটকা পড়া অবস্থায় ছিলেন তাঁর স্বামী সোহেল মিয়াও। সোহেলের পাশে ছিল ছেলে নাফিজ। একদিকে স্বামী-সন্তানের চিৎকার, অন্যদিকে ছোঁয়ামণির শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ! এই দৃশ্য সহ্য করার মতো ক্ষমতা ছিল না নাজমার। তিনি বলেন, ‘ওর কপালে চুমু দেই, তার পরই হাত-পা ছেড়ে দেয় ছোঁয়ামণি।’
আজ বুধবার সকালে রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রেও (পঙ্গু হাসপাতাল) চিকিৎসাধীন থাকা নাজমা বেগম কাঁদতে কাঁদতে এসব কথা জানান।
পঙ্গু হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার সি/ডি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন স্বামী-স্ত্রী ও ছেলে। ওয়ার্ডের একটি কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, নাজমা বেগমের পাশে বসে ছিল হাত ও বুকের হাড়ে আঘাত পাওয়া একমাত্র ছেলে নাফিজ। অপর কক্ষে ছিল সোহেল মিয়া। এদের তিনজনেরই সেবা করছেন নাফিজের নানি আমেনা বেগম। একই পরিবারের মোট পাঁচজন ছিলেন ট্রেনে। আরেকজন রেনু বিবি (নাজমার খালা)। তিনি সিএমএইচে চিকিৎসাধীন আছেন।
কথা প্রসঙ্গে নাজমা বেগম ফিরে যান দুঃস্বপ্নের ওই রাতে। তিনি বলেন, ‘ছোঁয়ামণি আমার কোলে ঘুমিয়ে ছিল। আমার সামনের সিটে ওর বাবা ও ভাই বসে ছিল। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পাই। এক সেকেন্ডের ভেতরেই সব উলট-পালট হয়ে যায়। আমার কোমরের নিচের অংশ আটকা পড়েছিল ট্রেনের ভাঙা অংশে। ওই ভাঙা অংশে আমার মেয়ের মাথায় আঘাত লাগে। বের হতে থাকে রক্ত। রক্তে আমার বুক ভেসে যাচ্ছিল। হঠাৎ ছোঁয়ামণি আমার কোলেই মারা যায়! সে সময় আমার সমগ্র পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। আমি কী অবস্থায় আছি না আছি সেসবের খোঁজ আমার মনে ছিল না।’
এসব কথা বলতে বলতে নাজমা বেগম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেন। কিছুক্ষণ একইভাবে কাঁদতে কাঁদতে আবারও বলতে শুরু করেন তিনি। বলেন, ‘আমার কাছের ফোন-ব্যাগ কিছুই পাচ্ছিলাম না। কিন্তু কীভাবে জানি না, আমার স্বামীর পকেটে থাকা ফোনটি দেখি আমার পাশে পড়ে আছে। ওই ফোন দিয়ে আমার মাকে কল দিলাম। তারপর আমার ভাই জামাল ও মামা শহীদ এসে আমাদেরকে উদ্ধার করেন।’
মায়ের পাশে বসা নাফিজ ছোট্ট ছোট্ট কণ্ঠে বলেন, ‘ছোঁয়ামণি আমার হাত ধরে হাঁটত। আমাকে ভাই-ভাই করে ডাকত। সারা দিন আমরা খেলা করতাম। আমাদের অনেক খেলার পুতুল আছে। আর খেলব না। ছোঁয়ামণি আমাকে ছাড়া খেলত না। আমি কেন খেলব?’
ওই সময় নাফিজা বেগম যোগ করে বলেন, ‘ওরা দুজন এক সঙ্গে সব কিছু করত। একজনকে খেতে দিলে অন্যজন খেত না। আর খেলেও অন্যজনকে ঘুম থেকে তুলে তারপর।’
ছোঁয়ামণির দাফনও দেখতে পারলেন না মা
নাজমা বেগম বলেন, ‘সেই যে আমার কোল থেকে মেয়েকে নিয়ে গেল আর দেখতে পারিনি। বুকটা ফেটে যাচ্ছে আমার। বুকে থাকা মেয়ে আমার এখন কবরে! আর আমরা তিনজনই হাসপাতালে পড়ে আছি। সৃষ্টিকর্তা আমাদের এমন পরীক্ষায় ফেলবেন, আমি এটা কখনোই ভাবিনি। আমার ছোঁয়ামণি সব সময়ই আমাকে ছুঁয়ে থাকবে এবং আছে। আমার নাফিজ বারবার আমার মেয়ের কথা বলছে। তার খুব ইচ্ছে করছে ছোঁয়ামণির সঙ্গে খেলতে।
ছোঁয়ামণির হারিয়ে যাওয়া গহনা নিয়ে মায়ের আক্ষেপ
ছোঁয়ামণির গলায় স্বর্ণের চেইন আর কানে দুল ছিল। ওই চেইন আর দুল খুঁজে পাচ্ছে না পরিবার। নাজমা বেগম বলেন, ‘ওই চেইন আর কানের দুল ছোঁয়ামণির স্মৃতি। দুল আর চেইন খুব পছন্দ করত। হবিগঞ্জের হাসপাতাল থেকে মনে হয় তার চেইন আর দুল কেউ খুলে নিয়েছে। আমার কাছ থেকে যখন তাকে নিয়ে যাওয়া হয়, তখনো ওর গলায় হার ছিল। এগুলো পেলে আমার খুব ভালো লাগবে। সারা জীবন রেখে দেব।’
‘আদুরে ডাক আর পাব কোথায়? কী হবে ছোঁয়ামণির নতুন পোশাক?’
নাজমা বেগম বলেন, ‘ছোঁয়ামণির অনেক নতুন পোশাক। নতুন পোশাক ছাড়া সে পরতে চায় না। এত এত পোশাক এখন কী হবে? এই পোশাক ঘরে থাকবে অথচ আমার মেয়ে থাকবে না। এগুলো আমি সহ্য করব কীভাবে? আমার মেয়ে ছোট্ট ছোট্ট করে সবাইকে ডাকত। এত আদুরে ডাক দিত যে, সবাই বলত, ছোঁয়ামণি ডাকলেই মন ভরে যায়!’
ছোঁয়ামনির বাবাও আছেন চিকিৎসাধীন। পেট ফুলে আছে তাঁর। সোহেল মিয়া বলেন, ‘বিশ্বাস করবেন না, আমি এখনো ঘোরে আছি। কী হওয়া কথা ছিল আর কী হলো! ভাবতেই পারিনি আমার জীবনের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটবে। গত দুই দিন শুধু ওইসব ঘটনা মাথার ভেতরে ঘুরেছে। কিচ্ছু চিন্তা করতে পারছিলাম না। কী ঘটে গেল-এই ভাবনা ছাড়া মাথায় কিছুই আসেনি। নিজেকে একদম হাবাগোবা মনে হচ্ছিল।
বার্তাবাজার/এমকে