বিনা রক্তপাতে ইবির হলগুলো শিবিরমুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলাম : ড. মাহবুব

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭৫ একরের আঙ্গিনায় একটি কৌতুহলের নাম অধ্যাপক ড. মোঃ মাহবুবর রহমান। শিক্ষকতার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে দুঃসাহসিক ভূমিকা ও প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির বিরুদ্ধে কুঠারাঘাতের জন্য বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আসছেন তিনি। বর্তমানে এই অধ্যাপক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিকাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ট্রিপলি) বিভাগে অধ্যাপনার পাশাপাশি প্রগতিশীল শিক্ষক সংগঠন শাপলা ফোরামের সাধারণ সম্পাদক এবং সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে দায়িত্বরত আছেন।

এছাড়া সম্প্রতি তার তত্ত্বাবধানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসর্গ করে প্রকাশিত জ্যোতির্মান স্মরণিকা বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য বিদায়ী প্রক্টর হিসেবে বিভিন্ন বিষয়ে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মোস্তাফিজ রাকিব।

বার্তা বাজার : অধ্যাপক রহমান, আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শ্রেণির মানুষের কাছে অত্যন্ত সুপরিচিত। টানা দু’বার প্রক্টর, ছাত্র-উপদেষ্টা এবং বঙ্গবন্ধু হল প্রভোষ্টসহ নানামুখী প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। সুদূরপ্রসারী এবং সময়োপযোগী বিভিন্ন সিন্ধান্ত গ্রহণের কারণে অনেকেই আপনাকে ফাটাকেস্ট আবার কেউবা পরিশ্রমী সাহসী ডিসিশন মেকার আবার কেউ ধূর্ত মনে করেন। এবিষয়ে আপনার মতামত কি?

অধ্যাপক মাহবুব: শুধু আমি নই, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে সকলেই সবার নিকট পরিচিত। তবে হয়তবা বিভিন্নমুখী কর্মকান্ডের কারণে আমার পরিচিতিটা বেশি প্রকাশ পেয়েছে। আমি ফাটাকেস্ট বা ডিসিশন মেকার নই। কারণ প্রশাসনিক বিভিন্ন দায়িত্ব পালনকালে আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব আমি সততা, স্বচ্ছতা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করেছি মাত্র। এমনকি এসব দায়িত্ব পালনকালে আমার পরিবারকে যতটুকু সময় দেয়ার প্রয়োজন ছিল, তাও দিতে পারিনি। কার্যক্ষেত্রে প্রশাসনের অনেক দূ:সাহসিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোন বেগ পেতে হয়নি তখন রসিকতা করে আমাকে অনেকেই ফাটাকেস্ট বলে থাকেন। আর যারা অবৈধ সুবিধা নিতে গিয়ে হোচট খায় তাঁরা ধূর্ত বলেন।

বার্তা বাজার: বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে উল্লেখযোগ্য কি কি পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন। দীর্ঘ এই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা কোনগুলো?

অধ্যাপক মাহবুব: মাননীয় উপাচার্য, মাননীয় উপ-উপাচার্য, মাননীয় ট্রেজারার, আমার প্রিয় সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বপরি ইবি পরিবারের সার্বিক সহযোগিতায় ক্যাম্পাসকে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদমুক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। সেই সাথে ক্যাম্পাসকে প্রগতিশীলতা চর্চার উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এছাড়াও যেকোন শুভ/অশুভ তথ্য প্রাপ্তির একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছি, এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে আমি মনে করি। এছাড়া গত ৪টি ভর্তি পরীক্ষা সম্পূর্ণ নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতেও আমি সক্ষম হয়েছি। ক্যাম্পাসের নিজস্ব সম্পদের যথাযথ ব্যবহার ও যেকোন ধরনের দূর্নীতি সনাক্ত করতে প্রশাসনকে সক্রিয় সহযোগিতা করেছি, যা পূর্বে হয়নি বললেই চলে।

বার্তা বাজার: প্রতিক্রিয়াশীলদের আতুড়ঘর খ্যাত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের বিভিন্ন কর্মকান্ড ও আবাসিক হল থেকে নিরবেই বিতাড়িত কেন হলো?

অধ্যাপক মাহবুব: কাজটি অত সহজ ছিল না। দীর্ঘদিন হলগুলোতে কর্তৃপক্ষের কর্তৃত্ব ছিলনা। কোন রুমে কে থাকবে কি কর্মকান্ড পরিচালিত হবে? তা হলবডির নিয়ন্ত্রন থাকবে না, এটা প্রক্টর হিসেবে মেনে নিতে কষ্ট হতো। হলবডির কেউ কেউ আপত্তি তুললেও কিছু কৌশল অবলম্বন করে প্রক্টরিয়ালবডি ও পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে ২০১৭ সালের ১৪ আগষ্ট সরাসরি শিবিরের দূর্গে আঘাত হানি এবং বিনা রক্তপাতে হলসমূহ শিবিরমুক্ত করতে সমর্থ হই। ফলে হলগুলোতে হলবডির নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও কালের পরিক্রমায় অনেকেই এ সফলতার অংশীদারত্ব দাবি করেছে! কোন অপশক্তি বেশি দিন টিকে থাকতে পারে না, তা প্রমানিত। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রগতিশীল চর্চা, প্রতিটি ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শতভাগ আজ বাস্তবায়ন হচ্ছে।

বার্তা বাজার: প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রবল বাধার মুখেও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল তৈরী করার পিছনে কি অনুভূতি কাজ করেছিল?

অধ্যাপক মাহবুব: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীলদের দীর্ঘদিনের দাবী ছিল ক্যাম্পাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল স্থাপনের, যা প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতিরোধে সম্ভব হয়নি। আমি হল প্রভোস্টের দায়িত্ব নিয়ে ২০০৯ সালে চেতনা থেকে প্রবল বাধার মুখে হল সম্মুখে “বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল এবং বাংলাদেশের ম্যাপ” স্থাপন করেছি। পরবর্তীতে বর্তমান প্রশাসন ২০১৮ সালে দেশের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক সবচেয়ে বড় বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল “মুত্যুঞ্জয়ী মুজিব” স্থাপন করেছেন। কারণ বর্তমান প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এটি তারই বহিঃপ্রকাশ। এই ম্যুরাল তৈরী করায় আমি বর্তমান প্রশাসনকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।

বার্তা বাজার: ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশের ব্যাপারে যে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছিলেন ওই সময় বহিরাগতদের আবাসিক হলে থাকা ও মাদকের ঘটনা নিয়ে ব্যাপক ভাঙ্গচুর হয়েছিল সেই সম্পর্কে পাঠকের জানার বেশ আগ্রহ আছে।

অধ্যাপক মাহবুব: প্রথমেই বলেছি ক্যাম্পাসের অবস্থানগত কারনে প্রায় অসম্ভবকে ঝুঁকি নিয়ে সম্ভব করতে পেরেছিলাম। প্রয়োজন ব্যতিরেকে ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ এবং অবস্থান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছিলাম। আর মাদক, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। সে ক্ষেত্রে আমাদের বসে থাকার কোন সুযোগ নেই। আমি দাবী করে বলতে পারি আমার সময় ইবি প্রশাসনের সদিচ্ছায় ক্যাম্পাসে মাদক বিরোধী প্রতিটি অভিযান সফল হয়েছে এবং তা মুক্ত করেছি। হ্যাঁ প্রতিটি অভিযান শেষে মুখোশধারী সুবিধাভোগী একটি কুচক্রী মহল প্রতিবাদের ঝড় তুলেছিল কিন্তু তারা সততা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতার কাছে পরাজিত হতে বাধ্য হয়েছে। এক্ষেত্রে পুলিশসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, সাংবাদিক ও মাননীয় সাংসদ জনাব মাহবুব উল আলম হানিফের সরাসরি সহায়তা পেয়েছি।

বার্তা বাজার: অধ্যাপক রহমান! আপনি বললেন অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। কোন ঝুঁকিতে পড়েননি?

অধ্যাপক মাহবুব: অবশ্যই। কর্তৃপক্ষের দু:সাহসিক সিদ্ধান্তও আমার নিজস্ব কিছু দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়ন করতে করতে গিয়ে আমার এবং আমার পরিবারের উপর বারবার হুমকি এসেছে দেশবাসি তা জানেন। সারারাত সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আমার বাসা ঘিরে আমাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। ক্যাম্পাসে শিবিরমুক্তের পর হতে আমি একেরপর এক আক্রমনের শিকার হই। কিন্তু কোন অপশক্তি আমার দৃষ্টিভঙ্গি এবং কর্মতৎপরতা হতে একচুল সরাতে পারেননি। সকল ঝুঁকি মোকাবেলা করে সামনে এগিয়ে যেতে মহান সৃষ্টিকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ইবি পরিবার, ছাত্রলীগ, সাংবাদিক,আইনশৃংখলাবাহিনী ও আমার পরিবারের সাহায্য কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি।

বার্তা বাজার: অধ্যাপক রহমান, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সাবেক প্রক্টর ও ছাত্র-উপদেষ্টা হিসেবে কোন শিক্ষার্থী যদি আপনাকে প্রশ্ন করেন বর্তমানে ছাত্র উপদেষ্টা ছাত্র-ছাত্রীদের সন্ধ্যার পর আবাসিক হলে প্রবেশের ক্ষেত্রে ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহনে একসাথে যাতায়াতে যে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছেন এটি কি ধর্মীয় মূল্যোবোধের কারনে নাকি অন্য কোন বিষয় নিহিত আছে? এ ব্যাপারে আপনি কি অভিমত ব্যক্ত করবেন?

অধ্যাপক মাহবুব: ইবির অবস্থানগত বিষয়টি প্রথম বিবেচনায় নিতে হবে। সন্ধ্যার পর শিক্ষার্থীরা যেন কোন অনিরাপদ জায়গায় আড্ডা না দেয় সেটি খেয়াল রেখে ড. পরেশ চন্দ্র বর্ম্মন যর্থাথই করছেন। এখানে ধর্ম বিবেচনায় নয় বরং আমাদের সামর্থ্য অনুসারে যাতে তারা স্বাচ্ছন্দে চলাচল করতে পারে সেজন্য এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

বার্তা বাজার: অধ্যাপক রহমান! আগামী ৫ বছরের মধ্যে নিজেকে কোন জায়গায় দেখতে চান?

অধ্যাপক মাহবুব: আমার উপর যখন যে দায়িত্ব অর্পিত হয় তা আমি সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে পালন করে চলেছি। কাজের ফল কি হবে তা একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালায় নির্ধারণ করতে পারেন। তবে আমি সকলের স্নেহ এবং ভালবাসা নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই।

বার্তা বাজার: অধ্যাপক রহমান আপনাকে ধন্যবাদ।

অধ্যাপক মাহবুব: আপনাকেও ধন্যবাদ। সেই সাথে বার্তা বাজার পত্রিকার সম্মানিত সম্পাদকসহ বার্তাবাজার পরিবারের সকলের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর