ভোররাতে হালকা ঠান্ডা, আর সকালের মৃদু ভাব বলে দিচ্ছে শীত আসছে। সেই সাথে ভোরের মিষ্টি রোদে মাঠের সবুজ ঘাসের গায়ে লেপ্টে থাকা শিশির বিন্দুর ঝলকানি শীতের সকালের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে সীমান্তবর্তী চুয়াডাঙ্গাবাসীকে। বিকেলগুলো এখন স্বল্পায়ু হয়ে গেছে। ৪টার পর থেকেই ছায়া ঘনিয়ে আসে প্রান্তরে। ৫টায় সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। হেমন্তের আগমনে দিন আরো ছোট হয়ে আসবে ক্রমেই।
বরাবর এ সময়টায় বৃষ্টি থাকে না। তবে কার্তিকের শুরুতেই ভোরে কুয়াশা, হালকা শীত এবং রাতে ঘন কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে। পঞ্জিকার হিসাবে এবার ১৬ অক্টোবর শুরু হয়েছে কার্তিক মাস, অর্থাৎ হেমন্তকাল। পৌষে শীতের আগমন হওয়ার কথা থাকলেও হেমন্তের শুরুতেই আগমনী বার্তা দিচ্ছে শীত। পঞ্জিকা অনুযায়ী শীতের বাকি এখনো অনেক দিন, কেবল শুরু হেমন্তকাল। অথচ হেমন্তের শুরু থেকেই প্রকৃতির পরিবর্তনে শীতের আগমনী বার্তা উঁকি দিচ্ছে। সূর্যের আলোয় দিনের বেলা তাপমাত্রা কিছুটা বেশি থাকলেও সন্ধ্যা নামতেই শীত অনুভূত হতে শুরু করেছে। সন্ধ্যায় হিমেল হাওয়ার সঙ্গে কমছে রাতের তাপমাত্রা। যেটা থাকছে সকালের সূর্য উঠার আগ পর্যন্ত। সকাল বেলা ঘন কুয়াশায় ঢাকা থাকে এ অঞ্চলের প্রকৃতি।
শীতের নির্জনতার মধ্যে নীরব অস্তিত্বের প্রকাশও সৌন্দর্য। প্রতিটি ঋতুরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। শীতের কর্মব্যস্ত দিনের সব কোলাহলকে আড়ালে করে যখন রাত গভীর থেকে গভীরতর হয়, তখনই খুঁজে পাওয়া যায় শীতের আসল রূপটি।
শীত আসে শীত যায় ডুবিয়ে কুয়াশায়। শীত উৎসব এবং এর আহার্যের সঙ্গে খেজুর রস ও গুড়ের সম্পর্ক নিবিড়। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গায় অনেকটা বাণিজ্যিকভাবে সম্পূর্ণ কেমিক্যালমুক্ত ও প্রাকৃতিক পরিবেশে খেজুর গুড়ের উৎপাদন হয়ে থাকে। বলাবাহুল্য, একমাত্র এ জেলাতেই বসে খেঁজুর গুড়ের হাট।
চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, এ বছর জেলার চার উপজেলার বিভিন্ন মাঠে ২ লাখ ৪৭ হাজার খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।
এরই মধ্যে বিস্তর মজুর যুক্ত হয়েছেন খেজুর গাছ কাটা, রস সংগ্রহ, তা জ্বাল দেয়া ও গুড় তৈরির কাজে। কার্তিক মাসের শুরু থেকে চৈত্রের শেষ পর্যন্ত এরা খেজুর গাছ কাটায় নিয়োজিত থাকেন। যেসব চাষির স্বল্পসংখ্যক খেজুর গাছ আছে, তারা নিজেরাই তা কাটেন, রস পাড়েন এবং বাড়িতে এসে জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরির কাজও সেরে নেন। শীতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রসও বাড়তে থাকে পাল¬া দিয়ে।
গ্রামীণ জনপদে শীত এলেই চায়ের দোকান ও হাটবাজারগুলোতে লোক সমাগম বাড়তে থাকে। তবে চুয়াডাঙ্গার হাতিকাটা মোড়ের চায়ের হাটে গিয়ে দেখা গেল ভিন্নচিত্র। কুয়াশা জড়ানো সকালে চায়ের দোকানে ভিড় থাকার কথা থাকলেও মূলত পড়ন্ত বিকেল থেকে সেখানে ভিড় জমতে শুরু করে।
এ প্রসঙ্গে চায়ের হাটের স্বত্বাধিকারী গাফফার মিয়া বলেন, ‘অন্য জেলার তুলনায় চুয়াডাঙ্গায় শীত কিংবা গরম, সব মৌসুমে দিনে রোদের তাপ থাকে মাত্রাতিরিক্ত। বিকেল হলে কিছুটা কমে রোদের তেজ। সন্ধ্যা থেকেই বইতে শুরু করে ঠা-া হাওয়া। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা আমাদের দোকান খোলা থাকে। তবে সন্ধ্যার পর ভিড় বাড়তে শুরু করে, চলে একটানা রাত ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত।’
এদিকে, লেপ-তোষকসহ গরম কাপড়ের দোকানগুলোতে এখনো তেমন ব্যস্ততা শুরু হয়নি। তবে এ সপ্তাহের মধ্যে কারিগরদের তোড়জোড় শুরু হবে জানিয়ে চুয়াডাঙ্গা কোর্টমোড়ের হুসাইন শীতবস্ত্র বিতানের স্বত্বাধিকারী একরামুল হক বলেন, ‘এবার একটি লেপ বানাতে ১২০০-১৮০০ টাকা এবং তোষক ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা করে খরচ নেয়া হচ্ছে। সারা দিনে ১৫-২০টি লেপ সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া আগাম ঠা-া পড়ার সম্ভাবনা থাকায় স্টকে রেডিমেট লেপ-তোষক রাখা আছে। অর্ডার ছাড়াই যেকোনো সময় তা সরবরাহ করা যাবে।
বার্তা বাজার/এম.সি