জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের অপসারণের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ। এতে আট শিক্ষকসহ অন্তত ৩৫ জন আহত হয়েছেন। দায়িত্ব পালনকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের চার সাংবাদিককে মারধর করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
জাবি প্রশাসনের প্রক্টরিয়াল বডির সকল সদস্য ও আশুলিয়া থানার অর্ধশতাধিক পুলিশের সামনে ছাত্রলীগের হামলা চালালেও এক প্রকার নিরবতা পালন করতে দেখা যায় প্রশাসনকে।
হামলার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) আ.স.ম. ফিরোজ-উল-হাসান বলেন, ‘ঘটনাস্থলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। চেষ্টা করেও আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। বড় ঘটনা এড়াতে আমরা তৎপর আছি।’
এবিষয়ে সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএফএম সায়েদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন ,পরিস্থিত নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে ।( সুত্র বাংলালাইভ২৪.কম) অশুলিয়া থানার (ওসি)বলেন ,সেখানে কোন প্রকার হামলার ঘটনা ঘটে নি।
হামলায় আহতরা জাবি মেডিকেলে ও সাভারের একটি বেসরকারী মেডিকেলে চিকিৎসা নিচ্ছেন তাহলে তারা কারা এরকম প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন ,এর জবাব আমি তোমাকে দিবো না।
পরবর্তীতে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে জরুরী সিন্ডিকেট ডেকে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন। উল্লেখ, আজ মঙ্গলবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালিয়ে আন্দোলনকারীদের উপাচার্যের বাসার সামনে থেকে হঠিয়ে দেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
এতে দীর্ঘ দশদিন পর অফিসে প্রবেশ করেন উপাচার্য। তাকে আন্দোলনকারীদের কাছ থেকে ‘মুক্ত’ করায় ছাত্রলীগকে ধন্যবাদ দেন উপাচার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে সাংবাদিকদের সাথে এক সংবাদ বিজ্ঞপিতে উপাচার্য বলেন, আমার সহকর্মীসহ ছাত্রলীগের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। কারণ তারা দায়িত্ব নিয়ে এ কাজটি করেছে। এখন সুষ্ঠুভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য সবাই আমাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবেন।
ছাত্রলীগের হামলায় আহত শিক্ষকরা হলেন- নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাইদ ফেরদৌস, মীর্জা তাসলিমা সুলতানা, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইন, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার হাসান মাহমুদ, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শামীমা সুলতানা সহ আরো দুই শিক্ষক।
মারধরে আহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে- ৪৪ তম আবর্তনের সরকার ও রাজনীনিত বিভাগের মরিয়ম ছন্দা, দর্শন বিভাগের মারুফ মোজাম্মেল, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের মাহাথির মুহাম্মদ, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সাইমুম ইসলাম, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের রাকিবুল ইসলাম রনি, ৪৫তম আবর্তনের দর্শন বিভাগের রুদ্রনীল আহমেদ, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সৌমিক বাগচী, ৪৭তম আবর্তনের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাউদা, ৪৮ তম আবর্তনের ইংরেজি বিভাগের আলিফ মাহমুদ, অর্থনীতি বিভাগের উল্লাসের নাম জানা গেছে।
এছাড়া সংবাদ সংগ্রহের সময় ছাত্রলীগের হামলায় আহত সাংবাদিকরা হলেন- প্রথম আলোর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মাইদুল ইসলাম, বার্তা২৪.কমের প্রতিনিধি আজাদ, বার্তাবাজারের প্রতিনিধি ইমরান হোসাইন হিমু, বাংলালাইভ২৪.কমের প্রতিনিধি আরিফুজ্জামান উজ্জল।
জানা যায়, জাবি উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে প্রায় দুই মাস ধরে আন্দোলন করে আসছেন বিশ্ববিদ্যালয়েল শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। দুর্নীতির দায়ে তাকে পদত্যাগের আলটিমেটামের পরও তিনি পদত্যাগ না করলে আন্দোলন জোরদার হয়।
এর মধ্যেই শিক্ষামন্ত্রী আন্দোলনকারীদের সাথে আলোচনায় বসে বিষয়টি তদন্তের আহ্বান জানালে আন্দোলনকারীরা তা নাকচ করে আন্দোলন চালিয়ে যায়। সোমবার সন্ধ্যায় আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের অপসারণ দাবিতে তার বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখে।
এরপর মঙ্গলবার সকাল বারোটার দিকে উপাচার্যপন্থি শিক্ষকরা উপাচার্যকে বাসা থেকে বের করতে গেলে ব্যর্থ হয়। এরপরেই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্ররীগের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিবির মুক্ত করতে মিছিল নিয়ে আন্দোলনকারীদের উপর হামলা করে।
এসময় উপাচার্যপন্থী শিক্ষক সোহেল আহমেদ, নাসির উদ্দিন, আতিকুর রহমান, আব্দুল মান্নান চৌধুরী, নজরুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম, মাহমুদুর রহমান জনিসহ কয়েকজনকে ‘ধর ধর’, ‘জবাই কর’ ও ‘মার মার’ বলে চিৎকার করতে দেখা গেছে।
হামলায় আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। আহতদের বিশ্ববিদ্যালয় ম্যাডিকেল সেন্টারে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ২০জনকে সাভার এনাম মেডিকেল কলেজে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়।
এ ঘটনার পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জরুরী সিন্ডিকেট ডেকে অর্নিদিষ্টকারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা করা হয় এবং সাড়ে ৫টার মধ্যে সকল আবাসিক হল বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়তে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়ে আন্দোলনকারীরা।
শিক্ষকসহ প্রায় ৩০০জন মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার উপাচার্যের বাসা অবরোধ করতে গেলে সেখানে অবস্থানরত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের বাধা দেয়। তাদের বাধায় পড়ে আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের বাস ভবন সংলগ্ন সড়কে বসে অবস্থান নেয়। এসময় তারা উপাচার্যের অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান থেকে সরবেন না বলে জানান।
একই স্থানে আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। পরে আন্দেলনকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্ত্বরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস চলাচল বন্ধ করেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তারা পরিবহন চত্ত্বরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন। এছাড়া ছাত্রলীগ ও আন্দোলনকারীদের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে আবারো হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ছাত্রলীগের মারধরের বিষয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষক পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক খবির উদ্দিন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এরকম ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনা ইতিপূর্বে দেখা যায়নি। উপাচার্যপন্থী শিক্ষকদের উপস্থিতি ও প্রত্যক্ষ উষ্কানিতে ছাত্রলীগ আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে।
শিক্ষকদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা। ছাত্রলীগ যখন আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে তখন ভিসিপন্থী শিক্ষকরা তাদেরকে স্বাগত জানিয়ে হাততালি দিয়েছে।’হামলার বিষয়ে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানা বলেন, ‘আমরা শিবিরমুক্ত ক্যাম্পাস চাই। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে শিবির সংশ্লিষ্টতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল।’
তবে আন্দোলনে শিবির সম্পৃক্ততার ছাত্রলীগের অভিযোগ অস্বীকার করে আন্দোলকারীদের মুখপাত্র দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইন বলেন, ‘আন্দোলনে কোন শিবির সংশ্লিষ্টতা নেই। যেকোন শক্তিকে প্রতিহত করার জন্য শিবির ব্লেইম দেওয়াটা পুরোনো অপকৌশল।
বুয়েটের আবরারকে এভাবেই হত্যা করা হয়েছে, এখানেও একইভাবে অভিযোগ তুলে হামলা চালানো হয়েছে। উপাচার্য অপসারণ আন্দোলনের সাথে যুক্ত এমন অনেকেই আজ ছাত্রলীগের হামলায় আহত হয়েছে যারা ক্যাম্পাসে বামপন্থী রাজনীতির চিহ্নিত মুখ। তাই তাদের এসব কথা তাদের দুর্নীতি ঢাকার অপকৌশল।’
বার্তাবাজার/কেএ