গলা কাটার পর খুনিরা এলোপাতাড়ি কোপায়

রাজধানীর ধানমণ্ডিতে শিল্পপতি মনির উদ্দিনের ফ্ল্যাটে তার শাশুড়ি আফরোজা বেগম ও গৃহকর্মী দিতিকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত। এটিকে ডাকাতি হিসেবে সাজাতে হত্যাকাণ্ডের পর আলমারি ভাঙাসহ ঘরের মালামাল এলোমেলো করে ফেলে খুনিরা।

পাশাপাশি কয়েকটি মোবাইল ফোন, স্বর্ণালঙ্কারসহ মূল্যবান সামগ্রীও নিয়ে যায়। আফরোজা বেগম ও দিতিকে হত্যার সময় দুর্বৃত্তরা ফল কাটার ছুরি দিয়ে প্রথমে তাদের গলার পেছন দিক অর্থাৎ ঘাড় কেটে ফেলে এক টানে। এর পর মৃত্যু নিশ্চিত করতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাথারি কোপায়। খুনিদের টার্গেট ছিল অসুস্থ আফরোজা বেগম। আর গৃহকর্মী দিতি পরিস্থিতির শিকার। ঘটনার সাক্ষী হওয়ায় তাকেও খুন হতে হয়।

কিলিং মিশনে ভাড়াটে কিলার হিসেবে অংশ নেয় গত শুক্রবার নিয়োগপ্রাপ্ত নতুন গৃহকর্মী ছাড়াও কয়েকজন। জোড়া খুনের পর ঠা-া মাথায় ভবন থেকে বেরিয়ে যায় পাওয়া আনুমানিক ২১ বছর বয়সী ওই গৃহকর্মীসহ খুনির দল। খুনের আগেপরে নেপথ্য থেকে কলকাঠি নাড়ে নিহত আফরোজার পরিচিত কেউ। চাঞ্চল্যকর এ জোড়া খুনের সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে না পেলেও প্রাথমিকভাবে এমনটাই ধারণা করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় শিল্পপতি মনির উদ্দিনের ধানম-ি ২৮ নম্বর সড়কের ২১ নম্বর বাসার পঞ্চম তলায় খুন হন আফরোজা ও দিতি। তাদের ময়নাতদন্ত শেষে লাশ গতকাল শনিবার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। তিন সদস্যের বোর্ড গঠন করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে দুজনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। বোর্ডের প্রধান ছিলেন ঢামেক ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. সোহেল মাহমুদ। তার সঙ্গে ছিলেন প্রভাষক ডা. প্রদীপ বিশ্বাস ও কবির সোহেল।

ময়নাতদন্ত শেষে বোর্ডের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, নিহত দুজনের শরীরে ছুরিকাঘাতের একাধিক জখম রয়েছে। আফরোজা বেগমের গলা কাটা ছাড়াও পেটে, বুকে একাধিক ছুরিকাঘাত করা হয়। এর মধ্যে একটি আঘাত তার কিডনি ভেদ করে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তিনি মারা যান। গৃহকর্মী দিতিরও গলা কেটে ফেলে দুর্বৃত্তরা। এ ছাড়া শরীরে এলোপাথারি ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। তবে গলা কেটে ফেলায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয় তার।

ঢামেক ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. কবির সোহেল জানান, পরীক্ষার জন্য গৃহকর্ত্রীর ভিসেরা ও গৃহকর্মীর হাই ভেজাইনাল টিস্যুর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। মৃত্যুর আগে দিতি ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন কিনাÑ পরীক্ষার পর তা জানা যাবে।

গতকাল রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ জোড়া খুনের বিষয়ে থানায় কোনো মামলা হয়নি বলে জানান এ হত্যাকা-ের তদন্ত কর্মকর্তা ধানম-ি থানার এসআই এনামুল হক। তার ধারণা, এটি পরিকল্পিত হত্যাকা- এবং এতে ওই বাসার নতুন এক গৃহকর্মীও সম্পৃক্ত। ওই বাসার আলমারি ও ড্রয়ার ভাঙা অবস্থায় পেলেও সচরাচর ডাকাতির ঘটনার সঙ্গে এর অসামঞ্জস্যতা রয়েছে বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, শুধু ডাকাতি করার জন্য দুজনকে একইভাবে গলা কেটে হত্যা করার বিষয়টি নিয়ে গভীর তদন্ত চলছে। শিল্পপতি মনির উদ্দিনের দেহরক্ষী বাচ্চু মিয়া, বাড়ির দারোয়ান, কেয়ারটেকার, বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি, পাশ্ববর্তী পানদোকানিসহ ৭ থেকে ৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

এসআই এনামুল হক জানান, ওই বাসার সিসিটিভিতে ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজ ঘেঁটে খুনের মোটিভ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। প্রধান সন্দেহভাজন নতুন গৃহকর্মীকে গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে। তিনি গত রাতে জানান, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় হত্যা মামলা দায়েরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক মনির উদ্দিন জানান, তার শাশুড়ি আফরোজা বেগম ছিলেন লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত। পাশাপাশি ডায়াবেটিসও ছিল তার। অসুখের কারণে সারাক্ষণ তিনি ঘরেই থাকতেন। তার কোনো শত্রু আছে বলে জানা নেই। শুধু একজন নারীর (নতুন গৃহকর্মী) পক্ষে দুজনকে এভাবে কুপিয়ে হত্যা করা অসম্ভব বলে মনে করেন মনির উদ্দিন।

তিনি জানান, যদিও ওই বাসায় থাকা মোবাইল ফোন, টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার পাওয়া যাচ্ছে না, তবু শুধু চুরি-ডাকাতির জন্য এ হত্যাকা- ঘটেছে বলে মনে হয় না। দ্রুত সময়ের মধ্যে খুনিকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান তিনি।

গতকাল শনিবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ধানম-ির ১৫ নম্বর সড়কের ২১ নম্বর ওই ভবন পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদস্যরা। দলের সদস্য শরিফ আহম্মেদ বলেন, আমরা আলামত সংগ্রহ করতে এসেছি। এ ছাড়া ঘটনার বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছি।

বার্তাবাজার/কেএ

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর