কোটি টাকার দুর্নীতি করেও বহাল তবিয়তে খায়রুল

কোটি টাকার দুর্নীতি করেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন বিলুপ্ত বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশনের (বিজেসি) ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক খায়রুল আলম। বর্তমানে প্রধান কার্যালয়ের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও খুলনা অঞ্চলের দায়িত্বেও রয়েছেন।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ- তাকে যেখানেই পদায়ন করা হয়েছে, সেখানেই তিনি অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়েছেন। চট্টগ্রামের পাক্কা কুলি লাইনের ৩২০ জন ইজারাদারের কাছ থেকে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা ‘ঘুষ’ নিয়েছেন। পাশাপাশি পুকুর ভরাটের কথা বলে হাতিয়ে নিয়েছেন আরও ২২ লাখ টাকা।

এছাড়া চট্টগ্রামের মাইলবিল অঙ্গনে শহিদুল আলম চৌধুরীর কাছে ৯০ হাজার বর্গফুট জায়গা মাত্র ৬ টাকা হারে ভাড়া দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন খায়রুল আলম। নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল প্রেস হাউসের বিভিন্ন বাসাবাড়ি ভাড়া দেয়ার নামে ইজারাদারদের কাছ থেকেও লাখ লাখ টাকা উৎকোচ নিয়েছেন।

বিজেসির চেয়ারম্যানের নাম ভাঙিয়ে মাসোহারা আদায়, প্রেস হাউসের সুইপারের টাকা, তামার তার চুরি, মেহগনি গাছ বিক্রি ও মসজিদের টাকাও আত্মসাৎ করেছেন। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এসব দুর্নীতির সত্যতা মিলেছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

সূত্র আরও জানায়, ৮ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে অভিযুক্ত খায়রুল আলমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিজেসি চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠায় বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। কিন্তু অদ্যাবধি অভিযুক্ত খায়রুল আলমের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিজেসি। অভিযোগ রয়েছে, বিজেসি চেয়ারম্যানের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণেই খায়রুল আলম এখনও বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় থেকে বিজেসি চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশনের (বিলুপ্ত) চট্টগ্রাম বিজেসি রেলি প্রেস হাউস ও নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল প্রেস হাউসের বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক খায়রুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন নাসির উদ্দিন ও মনির।

অভিযোগগুলো তদন্ত করতে এ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (বস্ত্র-৩) খেনচানকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বিজেসির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক মো. খায়রুল আলমের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে।

এ অবস্থায় বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশনের কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালার প্রবিধি-৩৯ এর ‘ঙ’ অনুযায়ী খায়রুল আলমের বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিভাগীয় কার্যক্রম গ্রহণ করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে বলা হল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজেসির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) শেখ মো. শামীম ইকবাল শনিবার বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে অভিযোগের বিষয়ে জবাব চেয়ে খায়রুল আলমকে চিঠি দেয়া হয়েছে।

তার জবাবও পাওয়া গেছে এবং তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ অভিযুক্ত কর্মকর্তা খায়রুল আলমকে কোনো ধরনের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন না বলেও কাছে দাবি করেন বিজেসির চেয়ারম্যন।

তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের মাঝিরঘাটের নাসির উদ্দিন এবং নারায়ণগঞ্জের মনির চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে বিজেসির বেশ কিছু অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। নাসির উদ্দিনের অভিযোগ- খায়রুল আলম ধারাবাহিক দুর্নীতিবাজ হিসেবে পরিচিত।

খুলনা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম বিজেসির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক থাকাকালে ব্যাপক দুর্নীতি করেছেন। যার প্রতিবেদন সাবেক বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম ও সংসদীয় কমিটির সদস্য মন্নুজান সুফিয়ানের কাছে রয়েছে। খায়রুল আলম চট্টগ্রামের পাক্কা কুলিলাইনের ৩২০ জন ইজারাদারের কাছ থেকে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন।

পাশাপাশি পুকুর ভরাটের কথা বলে হাতিয়ে নিয়েছেন আরও ২২ লাখ টাকা। এছাড়া চট্টগ্রামের মাইলবিল অঙ্গনে শহিদুল আলম চৌধুরীর কাছে ৯০ হাজার বর্গফুট জায়গা মাত্র ৬ টাকা হারে ভাড়া দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। আর এসব কাজে বিজেসির চেয়ারম্যানের সরাসরি সমর্থন রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের মনিরের অভিযোগ- খায়রুল আলম নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল প্রেস হাউসের বিভিন্ন বাসাবাড়ি ভাড়া দেয়ার নামে ইজারাদারদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। আবুল কাশেমের কাছে কুলিলাইনের ৪২টি বাসা ভাড়া দিয়ে প্রতি কক্ষের জন্য ৫ হাজার করে ২ লাখের বেশি টাকা হাতিয়ে নেন।

এসব বাসায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ দেয়ার নামে ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করেন। ২নং বাংলো একজনকে ভাড়া দেয়ার নাম করে দুই লাখ টাকা নেন খায়রুল। বিষয়টি নিয়ে দেনদরবারও হয়; যা বিজেসি চেয়ারম্যান জানেন।

এবিসি গুদামের পাশে ১২০০ বর্গফুট খালি জায়গা আবু জাফর আহমেদ ও বাবুল শেখের কাছে ভাড়া দিয়ে বিজেসি চেয়ারম্যানের নামে দুই লাখ টাকা আদায় করেন। যেখানে অবৈধ অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে। এমনকি বিজেসির চেয়ারম্যানের নাম ভাঙিয়ে মাসোহারা আদায়, প্রেস হাউসের সুইপারের টাকা, তামার তার চুরি, মেহগনি গাছ বিক্রি ও মসজিদের টাকাও আত্মসাৎ করেছেন তিনি।

জানা গেছে, নাসির উদ্দিন ও মনিরের অভিযোগ আমলে নিয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। সব সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব খেনচান। প্রতিবেদনের মতামতে বলা হয়- উভয়পক্ষের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, সাক্ষীদের সাক্ষ্য এবং সরেজমিন তদন্ত ও সার্বিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিজেসির (বিলুপ্ত) ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক মো. খায়রুল আলমের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর দালিলিক প্রমাণাদি রয়েছে।

তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের বিজেসির জায়গা ও বাসা-বাড়ি লিজের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব, অধিক ভাড়া আদায়সহ নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। সার্বিক পর্যালোচনায় খায়রুল আলমের বিরুদ্ধে নাসির উদ্দিন ও মনিরের আনীত সব অভিযোগ সত্য মর্মে প্রতীয়মান হয়েছে।

অভিযুক্ত খায়রুল আলম এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমি কোনো কথা বলব না।’

এ প্রসঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তা এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (বস্ত্র) খেনচান শনিবার বলেন, ‘আমার দায়িত্ব ছিল অভিযোগগুলোর তথ্য-উপাত্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণাদির ভিত্তিতে এবং সরেজমিন ঘুরে প্রতিবেদন দেয়া। খায়রুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তথ্য-প্রমাণের আলোকে প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে।’

বার্তাবাজার/কেএ

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর