এম এ মালেক, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানার হাটিকুমরুল ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ৩০৬ টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। ফলে ছোটখাটো বিরোধ নিরসনে জেলা-উপজেলার আদালতে যাওয়ার সংখ্যাও কমতে শুরু করেছে। বিচার পদ্ধতি সহজ ও ভোগান্তি ছাড়া হওয়ায় উকিল মোক্তারের পরিবর্তে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ওপর আস্থা রাখছেন এলাকাবাসী।
হাটিকুমরুল ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, গ্রাম আদালতে ২০১৬ সালে ২২৩ টি মামলার মধ্যে ১৮১ টি, ২০১৭ সালে ৩৪৯ টি মামলার মধ্যে ২৫৩ টি, ২০১৮ সালে ৪২৩ টি মামলার মধ্যে ৪০১ টি ও চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ৪৪৩ টি মামলার মধ্যে ৩০৬ টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ২’শ টি মামলা বিধি-৩১, প্রাক-বিচার ও শুনানির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করেছে। এবং নিষ্পত্তিকৃত মামলা থেকে উদ্ধার হওয়া জমি মূল্যমানসহ ক্ষতিপূরণ আদায় করে বিচার প্রার্থীদের দিয়েছেন।
হাটিকুমরুল ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ও গ্রাম আদালত সহকারী মো. মানিক খান বলেন,
গ্রাম আদালত বিধিমালা অনুয়ায়ী চুরি, ঝগড়া-বিবাদ, কলহ বা মারামারি, দাঙ্গা, প্রতারণা, ভয়ভীতি দেখানো বা হুমকি দেওয়া, নারীর শ্লীলতাহানি, গচ্ছিত সম্পত্তি আত্মসাৎ করা, পাওনা টাকা আদায়, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি উদ্ধার ও পুনঃউদ্ধার, ক্ষতিপূরণ আদায় ও গবাদিপশু সংক্রান্ত জটিলতা ইত্যাদি নানাবিধ সালিশগুলো গ্রাম আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যায়।
অত্র ইউনিয়নের সেবা গৃহীতা আমডাঙ্গা গ্রামের মো. শুকুর আলী বলেন, আমার গ্রামের মো. আলতাফ হোসেনের সাথে আমার জমি নিয়ে বিরোধ চলছিলো প্রায় দু বছর ধরে। কোনোভাবেই সমস্যা সমাধান হচ্ছিলো না। পরে জানতে পারলাম ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা সম্ভব। এমন কথা শুনে অভিযোগ দেয়ার ৭ দিনের মাথায় সেটা (২১ অক্টোবর ১৯) নিষ্পত্তি করে দিয়েছে চেয়ারম্যান।
আবেদনকারী মানিক দিয়ার গ্রামের মো. মিন্টু সেখ বলেন, গ্রাম আদালত না থাকলে আমার সমস্যা সমাধান হতো না। শুনেছি আদালতে নাকি জমির মামলা শেষ হয় না। এ বিষয়ে অত্র ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হেদায়েতুল আলম বলেন, স্থানীয় সকল সমস্যার সমাধান গ্রাম আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তিযোগ্য হলেও বিধি অনুযায়ী ৭৫ হাজার টাকা মূল্যমানের উপরের বিরোধগুলো আমরা নিষ্পত্তি করতে পারি না। তবে মানুষকে গ্রাম আদালতের সুবিধা দিতে সরকারি ও বেসরকারি ভাবে ব্যাপক প্রচারণা রয়েছে।
২০১৭ সালের এপ্রিল মাস থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ইউএনডিপি এবং বাংলাদেশ সারকারের স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক বাস্তবায়নকৃত বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্পের (২য় পর্যায়) কার্যক্রম শুরু হয় এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে সহযোগিতা করছে ওয়েব ফাউন্ডেশন। এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আমার ইউনিয়নে গ্রাম আদালত সক্রিয় করণের কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি বাদী-বিবাদীর মধ্যে শান্তিপূর্ণ অবস্থান বিরাজ করছে। যা সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে একদিকে সাধারণ জনগণের যেমন সচেতনতা তৈরি হয়েছে। অপরদিকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য বিচারকগণ বিচারপ্রার্থীকে বিচারিক সেবা দিচ্ছে।
তাছাড়া আমরা উভয়পক্ষের কথা এবং সাক্ষীদের বক্তব্য শুনে বিচারিক প্যানেলে আলাপ-আলোচনা করে কাগজ দেখে সুষ্ঠু সমাধান দিই। নিজের সমস্যার কথা গুলো খুলে বলতে পেরে দ্রুত বিচার পেয়ে গ্রামের সাধারণ মানুষ এই গ্রাম আদালতের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে। শুধু তাই নয় দরিদ্র মানুষ ও অবহেলিত নারীদের সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে গ্রাম আদালত সংশিষ্ট আমি (চেয়ারম্যান) মেম্বারও সদস্যদের প্রশিক্ষণসহ নানা সহায়তা করে যাচ্ছে। এভাবে করতে পারলে যে লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করছে আশা করি সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবো।
এ বিষয়ে উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুজ্জামান এর সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান, গ্রামের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ছোট ছোট বিরোধ হলে ন্যায় বিচার পাওয়ার জন্য উচ্চ আদালতে বা থানায় না গিয়ে গ্রাম আদালতে অভিযোগ দিচ্ছে এবং অল্প খরচে ও অল্প সময়ে ন্যায় বিচার পাচ্ছে। আমরা নিয়মিতভাবে গ্রাম আদালত মনিটরিং ও পরিদর্শন করছি। গ্রাম আদালত সহকারীও প্রকল্প বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে অনেক কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্পের (২য় পর্যায়) কার্যক্রমে আমাদের প্রতি নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে, আমরা সেই মোতাবেক কাজ করছি।
বার্তাবাজার/ এইচ.আর