রেলওয়ের শাহেনশাহ শাহআলম

শাহেনশাহ শাহআলম একাধারে ঠিকাদার, ব্যবসায়ী নেতা, সমাজসেবক, স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা এবং অধ্যক্ষও। এক সময় যুবদল করতেন। ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে ভোল পাল্টিয়ে হয়ে যান চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের অনুসারী। এ সবকিছুর পেছনে তার মূল নেশা রেলের জমি দখল। কখনো নিজের নামে কখনো স্ত্রীর নামে কৌশলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের কোটি কোটি টাকার জায়গা লিজ নিয়ে হাতিয়ে নেন। এরপর স্থায়ীভাবে গেঁড়ে বসেন। প্রয়োজনে আদালতে মামলাও ঠুকে দেন।

এভাবে তিনি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রামের শাহেনশাহ বনে যান।

তিনি হচ্ছেন শাহআলম। নিজ বাড়ি কুমিল্লায়। ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) যুবলীগের সাংগঠনিক সমপাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়ার সঙ্গেও (সমপ্রতি র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার) তার মধুর সমপর্ক। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল সূত্র জানায়, রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী জোনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন সমপ্রতি র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া যুবলীগ নেতার ক্যাডার রমজান আলি ও জি কে শামীম। আর পূর্বাঞ্চল রেলে খালেদের হয়ে কাজ করতেন শাহআলম। স্থানীয়রা জানান, ২০০৯ সালের আগেও যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন শাহআলম। ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাতারাতি নগর যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের অনুসারী হয়ে উঠেন। যার হয়ে নগরীর হালিশহরে অবস্থিত বাংলাদেশ রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির মালিকানাধীন প্রায় ২৬ একর জলাশয় ৪৫ লাখ টাকার বিনিময়ে পাঁচ বছরের জন্য লিজ নেন।

পরবর্তীতে এ জলাশয়ে খামার বাড়ি গড়ে তোলেন হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর। এখানেই শেষ নয়। সিআরবি সাত রাস্তার মোড়ে স্ত্রী ইয়াসমিন আলমের নামেও জমি লিজ নিয়ে গড়ে তুলেছেন তাসফিয়া গার্ডেন নামের একটি রেস্টুরেন্ট। ওই রেস্টুরেন্ট তৃতীয় আরেকজনকে ভাড়া দিয়েছেন। আইস ফ্যাক্টরি রোড এলাকায় রেলের জমিতে গড়ে তুলেছেন স্বপ্নীল গ্রামার স্কুল। তিনি উক্ত স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ।

তাছাড়া পাহাড়িকা, উদয়ন ট্রেনের খাবার সরবরাহের ঠিকাদারও তিনি। চট্টগ্রাম পুরাতন রেলস্টেশনের হোটেল হেরিটেজও লিজ নিয়েছেন তিনি। চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে কুমিল্লা রেলস্টেশন পর্যন্ত রেলের প্রতিটি স্টেশনেই রয়েছে তার দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। রেলের ভূসমপদ বিভাগের সাবেক এক কর্মকর্তা জানান, ২০১৮ সালে নগরীর আইস ফ্যাক্টরি রোডে রেলের কাছ থেকে এক বছরের জন্য ২ দশমিক ০৩ একর জমি লিজ নেন তিনি। আইস ফ্যাক্টরি রোড ব্যবসায়ী সমিতি লি. ও চুনারগুদাম ট্রাক মালিক সমবায় সমিতি লি.- এর নামে মূল্যবান জমি এক বছরের জন্য লিজের লাইসেন্স নেন। দুটি সমিতির সভাপতি জহির আহমদ চৌধুরী ও সাধারণ সমপাদক শাহআলম।

আর ওই জমিটি খুবই মূল্যবান। ষাটের দশকে জমিটি চুনারগুদাম ট্রাক মালিক সমিতির কাছে একবার লিজ দেয়া হয়েছিল। ওই সূত্র ধরে শাহআলম যখন এ জমি লিজের জন্য আবেদন করেন তখন ভূসমপদ বিভাগ দ্বিমত করেছিল। কারণ দোহাজারী-ঘুনধুম রেললাইনের চট্টগ্রাম অংশের কাজ শুরু হলে সেই জমি প্রয়োজন হবে রেলের। ঘুনধুম লাইনের ট্রেনের প্ল্যাটফরম করতে সেই জমি প্রয়োজন হবে।

ভবিষ্যতে ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে করিডোরের সঙ্গে যুক্ত হবে চট্টগ্রাম রেলস্টেশন। ট্রান্স এশিয়ান রেল নেটওয়ার্কের আওতায় এ রেলপথ সিঙ্গাপুর, চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও কোরিয়া হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভূসমপদ বিভাগ বিরোধিতা করলেও পূর্বাঞ্চল রেলের তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক জমিটি লিজ দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এতে তার মন ভরেনি।

৩৯ লাখ ১৮০ টাকায় এক বছরের জন্য নেয়া রেলের জমিতে লিজের বরাদ্দের আশেপাশে আরো এক দশমিক ৬৮ একর জমি দখলে নিয়ে শক্ত স্থাপনায় গড়ে তুলেছেন মার্কেট। মার্কেটের প্রতিটি দোকান ১৫ লাখ, কোনোটি ২০ লাখ আবার কোনোটি ২৫ লাখ টাকায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে বিক্রয় করেছেন।

অথচ অস্থায়ী সেমিপাকা দোকান করার কথা বলে এক বছরের জন্য লিজের লাইসেন্স নিয়েছেন তিনি। এখানে কোনোরকম পাকা স্থাপনা নির্মাণ করতে পারবে না। ভবিষ্যতে রেলওয়ে বা সরকারের নিজস্ব কাজে প্রয়োজন হলে উক্ত ভূমির লাইসেন্স বাতিল করা হলে এক মাসের নোটিশে রেলভূমি খালি করে নিষ্কণ্টক দখল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য থাকবে। এক্ষেত্রে লিজগ্রহীতা কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে না।

এমনকি রেলের বিরুদ্ধে আদালতে কোনো মামলাও করতে পারবে না। নিজ খরচে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের ব্যবস্থাও লিজ গ্রহীতা করবেন। সর্বদা এ ভূমি অবৈধ দখলমুক্ত রাখতে হবে। কোনোমতেই উক্ত জমি কারো কাছে হস্তান্তর করতে পারবে না এবং নির্মিত দোকান বিক্রি করতে পারবে না।

আইস ফ্যাক্টরি রোডের জমিটি এক বছরের জন্য লিজ নেয়ার কথা (এক সনা) স্বীকার করে শাহআলম জানান, লিজের শর্ত মেনেই শাহ আমানত মার্কেট তৈরি করা হয়েছে। এত বড় মার্কেট আমার একার পক্ষে করা সম্ভব নয় বিধায় একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে মার্কেটটি নির্মাণ করা হয়েছে।

এক বছরের লিজ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি দোকান বিক্রি করা প্রসঙ্গে শাহআলম জানান, দোকান ক্রেতাদের বলে দেয়া হয়েছে জমিটি এক বছরের জন্য লিজ নেয়া হয়েছে। তারা সবকিছু জেনেশুনেই নিয়েছেন। তবে রেল সন্তুষ্ট থাকলে মেয়াদ শেষে লিজের লাইসেন্স নবায়ন করতে পারবে।

এদিকে অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ২রা সেপ্টেম্বর আইস ফ্যাক্টরি রোডের ওই মার্কেট সরজমিন পরিদর্শন করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তিন সদস্যের একটি টিম। দুদকের একজন কর্মকর্তা জানান, জায়গাটি খুবই কম মূল্যে ইজারা দেয়া হয়েছে। নিয়ম না মেনে ইজারা নিয়ে সেখানে মার্কেট গড়ে তোলা হয়েছে।

তবে কীভাবে কোন শর্তে মূল্যবান জমিটি ইজারা দেয়া হয়েছে তার তথ্য চেয়ে রেলের ভূসমপদ কর্মকর্তার কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে। গত ২৪শে অক্টোবর লিজ সংক্রান্ত সব কাগজপত্র দেয়ার কথা ছিল-কিন্তু দেয়নি। দুদক জানায়, কাগজপত্রে তাগাদা দিয়ে প্রয়োজনে রেলকে ফের চিঠি পাঠানো হবে।

-মানজমিন

বার্তাবাজার/ডব্লিওএস

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর