বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন প্রতিবেশীদের জন্য মডেল

পিনাক রঞ্জনের মূল্যায়ন

বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যেকার সম্পর্ক এখন অন্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর জন্য নতুন মডেল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফরকালে যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশের সম্পর্ককে কৌশলগত সম্পর্কের চেয়েও বেশি বলা হয়েছে। এই সম্পর্ক এখন বন্ধনে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে লেখা এক নিবন্ধে তিনি শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির সময়কালে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক নিয়ে নিজের এই অভিমত তুলে ধরেন।

পিনাক রঞ্জন নিবন্ধে বলেন, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে টানা তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই হাসিনার প্রথম ভারত সফর। অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসেছেন। এর ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে জোরালো ও বিস্তৃত হয়েছে।

এর মূলে রয়েছে ভারতীয় বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর মূলোত্পাটনে এবং কট্টরপন্থিদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার কঠোর পদক্ষেপ। দক্ষিণ এশিয়া বা অন্য অঞ্চলের জন্য এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে একটি মডেল বললে তা বাড়িয়ে বলা হবে না। তিনি তার দেশের নীতিকে পরিচালনা করছেন বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে। এর মধ্য দিয়ে তিনি এশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশকে করে তুলছেন সবচেয়ে সেরা।

প্রধানমন্ত্রী হাসিনা দিল্লি সফরকালে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্তের দিকে ইঙ্গিত করে। তিনি সরস মন্তব্য করেছেন যে, রাঁধুনীকে তিনি রান্নায় পেঁয়াজ ব্যবহার না করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। মূল্য সংবেদনশীল বাজারে, যেখানে পেঁয়াজ হলো দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি খাবারের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান, সেখানে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করায় এর দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং এতে জনগণের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ তার পেঁয়াজের মোট চাহিদার শতকরা ৩০ ভাগ মেটায় ভারতীয় সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। সেখানে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থার (স্পেশাল প্রভিশন) কথা বলেছে ভারত।

বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট পণ্য চলাচলে প্রতিবন্ধকতা রয়েই গেছে এবং তা প্রত্যাহার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ভারতীয় পণ্য চলাচলের ক্ষেত্রে। দুই দেশের মধ্যে রপ্তানি বাণিজ্য আরো বৃদ্ধি পাবে যখন একবার বিশেষ রপ্তানি অঞ্চল পূর্ণমাত্রায় চালু হবে। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সফলতা ভবিষ্যতের সমৃদ্ধির ভিত্তি রচনা করছে।

দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি খাতে সহযোগিতা, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, মানব সম্পদের উন্নয়ন ও মানুষের সঙ্গে মানের সম্পর্ক ক্রমশ বাড়ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের আধুনিকায়ন, উন্নত সড়ক, রেল ও আকাশ সংযোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে একটি বিদ্যুতের গ্রিড সংযুক্তির পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে এলপিজি আমদানির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বিষয়ক চুক্তিগুলো সীমান্তে বেড়া নির্মাণ বন্ধ করতে সহায়ক হবে। ভিসা সহজতর করার মাধ্যমে এক দেশ থেকে অন্য দেশে আসা-যাওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে ভারতীয় ভুয়া মুদ্রা পাচার, নিষিদ্ধ মাদক পাচারের মতো অপরাধ মোকাবিলা করা যাবে। সন্ত্রাসী ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধী কর্মকাণ্ড কমবে। নতুন নৌসীমানায় নজরদারি বিষয়ক চুক্তির অধীনে ভারতের দেওয়া রাডার উপকূলে মোতায়েন করার মাধ্যমে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে নজরদারি করার ক্ষেত্রে সক্ষম হবে। এতে এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ও অখণ্ডতা রক্ষা হবে।

আন্তঃসীমান্তের ছয়টি নদীর পানি বণ্টনের মতো স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে কাজ করবে যৌথ নদী কমিশন। ত্রিপুরার সাব্রুম শহরের পানীয় জলের চাহিদা মেটানোর জন্য ফেনি নদী থেকে অধিক পানি নিতে ভারতকে অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ। তিস্তার পানি বণ্টনের মুলতবি হয়ে থাকা চুক্তিটি বাস্তবায়নে আরো অনেক করতে হবে ভারতকে। কারণ, এই ইস্যুটি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারের রাজনীতিকে এখনো আন্দোলিত করছে।

বিদ্যুত্ কেন্দ্রের স্থান, এনআরসি এবং রোহিঙ্গার মতো ইস্যুতে এখনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়ে অসন্তুষ্ট এমন মহলও আছে বাংলাদেশে। ইউনেস্কে স্বীকৃত হেরিটেজ এবং বিশ্বে সবচেয়ে বড়ো ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের কাছে বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে নাগরিক সমাজ ও এনজিওগুলোর মধ্যে ক্ষোভ আছে। তারা বিদ্যুত্ উত্পাদনে কয়লা ব্যবহারেরও বিরোধিতা করেন।

যেহেতু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নেই, তাই দুই দেশ তার সাম্প্র্রতিক সফরে যেসব চুক্তি করেছে তা নিয়ে দেশের ভিতরে খুঁত ধরা হতে পারে, বিশেষ করে ফেনি নদীর পানি দেওয়া, এলপিজি সরবরাহ দেওয়া, ইলিশ সরবরাহ দেওয়া ও উপকূলে রাডার সিস্টেম স্থাপন নিয়ে। ভারতের আইআইটির সমতুল্য বাংলাদেশের বুয়েট। এসব চুক্তির সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার অপরাধে সেখানকার একজন ছাত্রকে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সদস্যরা পিটিয়ে হত্যা করেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই হত্যার খুনিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে এক্ষেত্রে এমন অনুভূতি বৃদ্ধি পাচ্ছে যে, তিনি ভারতকে অনেক বেশি দিচ্ছেন। এটা নতুন কিছু নয়। কারণ, এর অনেক আগেই বাংলাদেশের ভারত-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এমন অভিযোগ করে আসছে। শেখ হাসিনা এর আগেও এমন সমালোচনার মুখে পড়েছেন এবং তিনি জানেন, তা কীভাবে মোকাবিলা করতে হয়। দুই দেশই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে খুব বেশি মনোযোগ দিয়েছে। এতে যে গতি পেয়েছে তা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

বার্তা বাজার/এম বি ইউ

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।