তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তিকে যদি সঠিকভাবে কাজে লাগিয়েই এগিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকে। তবে এজন্য দক্ষ তরুণ জনশক্তি তৈরি করতে হবে আমাদের। আর দক্ষ জনশক্তি হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে হলে তরুণদের স্বত:স্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতে হবে, করতে হবে কঠোর পরিশ্রম। নয়তো বিশ্ব বাজারে পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ।
একশনএইড বাংলাদেশ আয়োজিত যুব নেতৃত্বে সামাজিক পরিবর্তন শীর্ষক ‘জাতীয় যুব সম্মেলন ২০১৯’-এ এসব কথা বলেন অতিথিরা। তারা আরো বলেন, তরুণরাও যাতে সামাজিক পরিবর্তন তথা দেশে ও বিশ্বের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে এমন ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়ার পাশাপাশি তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তরুণদের কাজে লাগাতে জাতীয় নীতিমালাও পরিবর্তন আনতে হবে।
একশনএইড বাংলাদেশ বিশ্বাস করে, তরুণরাই গড়তে পারবে নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী। সামাজিক পরিবর্তন আনতেও তরুণদেরই অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করতে হবে। তবে এর জন্য তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করাও প্রয়োজন বলে মনে করে একশনএইড বাংলাদেশ। প্রয়োজন বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে এবং দাতা সংস্থার মধ্যে সংযোগ স্থাপন।
এরই প্রেক্ষিতে ২৩ অক্টোবর ২০১৯ রাজধানীর বাংলা একাডেমীতে ‘জাতীয় যুব সম্মেলন ২০১৯’-এর আয়োজন করে একশনএইড বাংলাদেশ।
এই সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল। তিনি বলেন, সরকার তরুণদের উন্নয়নে সব সময় কাজ করছে। তাই সরকার কর্তৃক প্রশিক্ষণগুলো শহর থেকে গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে, ফলে তরুণরা দক্ষতা নিয়ে কাজে প্রবেশ করছে। গ্রাম পর্যায়েও তরুণরা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠছে। তবে প্রশিক্ষণগুলো আরো যুগোপোযোগী করা প্রয়োজন বলে মনে করেন মন্ত্রী। কারণ প্রযুক্তির হাত ধরে পৃথিবী দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। তাই বাংলাদেশ যাতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই সময়ে অন্য দেশগুলো সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে যেতে পারে এজন্য তরুণদের প্রস্তুত হতে হবে। তরুণরা যদি নিজেদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর না করে, তাহলে আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে পিছিয়ে পড়বো, বলেন মন্ত্রী।
এছাড়া, অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে বেরসকারি সংস্থা ইউনাইটেড ন্যাশনস্ ভলান্টিয়ার-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর আকতার উদ্দিন বলেন, দেশের উন্নয়নমূলক পরিবর্তনের জন্য তরুণদের শুধু যুক্ত করলেই হবে না, তাদের অবদানের স্বীকৃতি এবং সম্মান দিতে হবে। আর সমাজ তখনই পরিবর্তন হবে যখন আমরা সবাই সক্রিয়ভাবে এই পরিবর্তনের জন্য কাজ করবো। তিনি আরো বলেন, জাতীয় উন্নয়নের জন্য অবশ্যই তরুণ ভলান্টিয়ার দরকার। আমাদের পাশের দেশগুলোতে ভলান্টিয়ারদের কিভাবে কাজে লাগানো যায় সেই বিষয়ক জাতীয় নীতিমালা ও দপ্তর রয়েছে। আমাদেরও জাতীয় নীতিমালা তৈরি করতে হবে, যাতে তরুণদের কার্যকরীভাবে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো সম্ভব হয়।
ফিফা রেফারি এবং বিকেএসপি-র কোচ জয়া চাকমা বলেন, বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল তরুণদের ক্ষমতায়িত করতে হবে। আর এজন্য তরুণদেরও কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। কারণ পরিশ্রম ছাড়া কোন কিছু অর্জন করা সম্ভব না। আর তরুণদের উচিত দমে না যেয়ে, সকল বাধা উপেক্ষা করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বের সঞ্চালক এবং একশনএইড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, তরুণরা শুধু আমাদের ভবিষ্যত নয়, আমাদের বর্তমানও। অথচ তরুণদের ছোট এবং কিছু পারে না, এমন ভাবা আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে। কিন্তু এই তরুণরাই ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। আমরা অনেকেই এসডিজি অর্জনে সরকারের সঙ্গে কাজ করছি। তবে এর জন্য তরুণরা এজেন্ডা ২০৩০ সম্পর্কে কি ভাবছে তা আমাদের জানতে হবে। আর উন্নয়নের জন্য তরুণদেরও অনেক চেষ্টা ও ত্যাগ স্বীকার করতে হবে, বলেন ফারাহ্ কবির।
সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্বের বিষয় ছিল তরুণদের দক্ষতার উন্নয়নে জনসেবা। এসময় যুব অধিদপ্তরের পরিচালক এ.এন. আহাম্মেদ আলী বলেন, তরুণদের জন্য সরকারি যেসকল সুযোগ-সুবিধা রয়েছে সে সম্পর্কে সকলকে সচেতন করা প্রয়োজন। যুব উন্নয়নে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। তথ্য প্রযুক্তি থেকে শুরু করে কৃষি পর্যন্ত নানা বিষয়ে সরকার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ঋণের ব্যবস্থাও করে দিচ্ছে তরুণদের জন্য। তবে তরুণদের স্বপ্রণোদিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তরুণদের দক্ষতাও বৃদ্ধি করতে হবে।
পরবর্তীতে প্যানেল আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, সব তরুণদেরই উদ্যোক্তা হতে হবে, এটা বাস্তবসম্মত নয়। পৃথিবীর কোথাও এমন হয় না। তাই অর্থনীতিতে এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তরুণরা উপার্জনমূলক কর্মস্থানে অংশগ্রহণ করতে পারে। আর এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে তরুণদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরী শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
এছাড়াও আলোচনায় বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, ই-আরকি’র শিমু নাসের এবং জাহাজী অ্যাপ-এর কাজল আব্দুল্লাহ। তারাও তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধির উপর জোর দেন। তারা বলেন, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে তরুণদের নিজেদের উন্নয়নে কাজ করতে হবে। আর সরকারি সহায়তা পেলে তরুণরা দেশের জন্য দারুণ কিছু করতে সক্ষম বলে মনে করেন তারা।
একশনএইড বাংলাদেশ-এর ম্যানেজার নাজমুল আহসান বলেন, রাষ্ট্রীয় নীতি শুধু তৈরি করলেই হবে না, তা বাস্তবায়নও করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, নীতি বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ নেয়া হয় না। এজন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
তরুণ কর্মী, যুব সংগঠন এবং দাতাদের পারস্পরিক আলোচনা ও শিখন বিনিময়ের ক্ষেত্র সহজ করে তোলার লক্ষ্যে এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াতে যুবদের মূল চ্যালেঞ্জগুলো এবং তাদের চাহিদাগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও টেকসই কাজের সুযোগ তৈরি নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা করার একটি ক্ষেত্র তৈরি করে দিতেই এই আয়োজন।
বিগত বছরগুলোতে সামাজিক পরিবর্তনে তরুণদের সকল অর্জন ও কৃতিত্বের মূল অংশবিশেষের উপর আলোকপাত করে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনেরও আয়োজন করা হয় এই সম্মেলনে। পাশাপাশি সারাদেশ থেকে আগত যুবদের সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের পারস্পরিক কথোপকথনের সুযোগ ছিল, যেখানে তরুণরা ১লা নভেম্বর জাতীয় যুব দিবসকে সামনে রেখে তাদের চাহিদা ও তাদেরকে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলোকে নতুন করে সঙ্গায়িত করার সুযোগ পায়। এছাড়া, এই সম্মেলনের মাধ্যমে একশনএইড বাংলাদেশ তরুণদের নিয়ে যেসব কাজ করেছে সেই বিষয়ে একটি ফটোবুক-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
বার্তাবাজার/এম.কে