আজ শহীদ হাফেজ আবদুর রহীম এর ৩২ তম শাহাদাত বার্ষিকী

চট্টগ্রাম

আব্দুল করিম, লোহাগাড়া প্রতিনিধি: ১৯৭১ সালে ১লা মে শনিবার বিকেল দেড়টার সময় নিপীড়িত জনগণের মুখপত্র হিসেবে ঝঞ্ঝা বিক্ষুদ্ধ উত্তাল সমুদ্রের ন্যায় মে দিবসের তাৎপর্যে এক প্রতিবাদী কন্ঠস্বর নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন হাফেজ আবদুর রহীম। বাস্তবিকই তার জীবন ছিল অযুত আশার সম্ভাবনাময় সংগ্রাম মুখর। পিতার নাম হাদীয়ে জামান মুজাহিদে মিল্লাত শায়খ মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার (রহঃ) এবং মাতার নাম স্বর্ণগর্ভা মহিয়সী মনছুরা বেগম।

গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া থানার মিয়াজী পাড়া। আধো আধো বোল ফোটার সাথে সাথে মা-বাবার কাছ হতে আরবী হরফ আয়ত্ব করেন। এরপর বাড়ির অনতিদূরে আখতরাবাদ মাদ্রাসায় আবদুর রহীমকে ভর্তি করে দেন। মাত্র দু’বছরের মধ্যে কোরআনে হাফেজ বানানোর উদ্দেশ্য চুনতি হাকিমিয়া আলীয়া মাদ্রাসার হিফজুল কুরআন বিভাগে ভর্তি করালেন। ১৯৭৭-৭৮ মাত্র দু’বৎসরেই আল্লাহর কুরআনকে বক্ষে ধারন করলেন। সমাজে নেতৃত্ব দানের জন্য যোগ্য আলেম সৃষ্টির জন্য আবদুর রহীমকে পুনরায় আখতরুল উলুম মাদ্রাসায় ভর্তি করালেন। তথায় মাত্র তিন বছরে ৪টি শ্রেণীর অধ্যয়ন শেষ করলেন।

ধর্ম ও কর্মের সমন্বয়ে সুযোগ্য নাগরিক গড়ার লক্ষ্যে শায়খ মাওলানা ইসলামের প্রবেশধার বার আউলিয়ার পদভারে ধন্য চট্টগ্রামে যে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন সেই মাদ্রাসায় হাফেজ আবদুর রহীমকে ১৯৮২সালের জানুয়ারী মাসের প্রথম লগ্নে ভর্তি করালেন। কৃতিত্বের সাথে ধাপে ধাপে বীরদর্প গতিতে এগিয়ে যেতে লাগলেন সম্মুখপানে। আবদুর রহীমের মানসচক্ষে উন্মোচিত হতে থাকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নব নব দ্বার। লেখাপড়া, বক্তৃতা, বিবৃতি এক আধ্যাত্তিকজ্ঞানে স্বীয়জীবনকে গড়তে থাকে একান্ত নিভৃতে নীরবে।

১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত দাখিল পরীক্ষায় বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডে হিফজুল কোরআন বিভাগে ৭ম স্থান অধিকার করে (বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদরাসার ১ম মেধাবী ছাত্র) পিতা-মাতা সহ সব শুভানুধ্যায়ী চমৎকৃত হন। এরপর হাফেজ আবদুর রহীম ভর্তি হলেন আলিম ১ম বর্ষ অর্থাৎ একাদশ শ্রেণীতে। ১৯৮৬ সালের জুন মাসে শায়খ মাওলানা নিজেই আলিম ১ম বর্ষের উদ্ভোবনী ক্লাসে তাকে মিশকাত শরীফ থেকে পাঠ দিলেন “ইন্নামাল আমালু বিন্নিয়াত”।

হাফেজ আবদুর রহীম দৈনিক পাঠ্যসূচীর পাশাপাশি পবিত্র কুরআন ও হাদীসের আলোকে বিস্তর জিহাদী জ্ঞান অর্জন করেন যা সুবিধাবাদী সরকার কর্তৃক প্রণীত মাদ্রাসা পাঠ্যসূচীতে নেই, সাথে সাথে পশ্চিমা সাহিত্য বিশেষ করে মার্ক্সবাদ, লেনিনবাদ, মাওবাদ প্রভৃতি অধ্যয়ন করেন। তিনি প্রত্যক্ষ করলেন যে জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে বসা সামরিক জান্তা। আরও প্রত্যক্ষ করলেন যে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদের ঘোষনা করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিভাবে দুর্নীতি চলে। গরীব দুঃখীর অধিকার নিয়ে কিভাবে চলে ছিনিমিনি খেলা, রক্ষক হয়ে কিভাবে ভক্ষকের ভূমিকা পালিত হয়, গণতন্ত্রের বুলি আওড়িয়ে জনসাধারণকে ভোটদানের আহবান জানানো হয় অর্থাৎ জনতা ভোট কেন্দ্র না গেলেও জনপ্রতিনিধিরা বীরদর্পে নির্বাচিত হয়ে যায়।

তারুণ্যের চির উৎসুক দৃষ্টি দিয়ে আরও প্রত্যক্ষ করলেন যে, মজুতদারী পুঁজিপতি বা প্রাসাদের পর প্রাসাদ তৈরীতে রত আর সেই সব অট্টালিকায় বিলাস ব্যাসন সুখ সামগ্রীর সয়লাব অথচ তাদের পাশাপাশি ফুটপাত বস্তিতে পল্লী বাংলার কুঁড়ে ঘরে নিরন্ন মানুষের আহাজারিতে ভরপুর। তরুণী মেয়েরা পেঠের জ্বালা নিরাবনের জন্য সেজে গুজে বসে থাকে ষ্টেশন, ফুটপাতে, নগরীর সুরম্য বিপনী কেন্দ্রে। বিপথগামী ঐ তরুণীদের সঠিক জীবন ব্যবস্থা না করে ধনীরা তাদের নিত্যই গালি দিচ্ছে সমাজের এসব নগ্ন চিত্রের দাহনে আবদুর রহীম জ্বলতে থাকে।

হঠাৎ সেই আয়াতটি তার হৃদয়পটে ভেসে উঠে- “ তোমাদের কি হলো, তোমরা কেন আল্লাহর পথে সংগ্রাম করোনা? ঐসব নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য, যারা দুর্বল হওয়ার কারণে নির্যাতিত হয়ে আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করে বলছে- হে প্রভু! আমাদেরকে এ জালেমের দেশ থেকে বের করে নাও অথবা আমাদের জন্য একজন সাহায্যকারী পাঠাও।” তার মানস পঠে আরও ভেসে উঠে সত্যের সাধক হযরত (সাঃ) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ইসলামের সোনালী যুগের কথা। ইত্যবসরে বাংলাদেশ সমাজ জীবনে আরও একধাপ অধঃগতি ঘটল।

সুতরাং সবার অলক্ষ্যে খোলাফায়ে রাশেদীন প্রতিষ্ঠিত সেই পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজ কায়েমের লক্ষ্যে পার্থিব জীবনকে তুচ্ছ করে ঝাঁপিয়ে পড়লেন আন্দোলনে। সাথে সাথে ক্ষুরধার লিখনিতে লিখে চললেন- আল্লাহর বাণী রাসুলের বাণী- “যারা আল্লাহর পথে শাহাদাৎ বরণ করেন, তোমরা তাদেরকে মৃত বলোনা এবং তারা তাদের রবের পক্ষ থেকে রিজিক প্রাপ্ত হন।” আল্লাহর রাসুল (সাঃ) ইরশাদ করেন- “আমার ইচ্ছা হয় আমি আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে যাই, এরপর জীবিত হই, এরপর শহীদ হয়ে যাই। এরপর আবার জীবিত হই, এরপর শহীদ হয়ে যাই। শহীদের দেহ মাটিতে পঁচে যাবে না। তারা আল্লাহর এমনি প্রিয়তম যে, মাবুদ তাদেরকে অপরাধীদের সুপারিশ করার অধিকার দিয়ে সম্মান দান করবেন।

শহীদেরা তাদের বংশধর থেকে ৭০ জন গুনাহগারকে সুপারিশের মাধ্যমে বেহেশ্তগামী করবেন”। প্রকৃতপক্ষে যারা আল্লাহর জমিনে আল্লাহর হুকুমত প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে খোদাদ্রোহী শক্তি কর্তৃক নির্মমভাবে নিহত হন তারাই শহীদ। আল্লাহর বাণী- তোমরা আল্লাহর পথে সংগ্রাম কর সম্পদ ও প্রাণ দ্বারা। এই সম্পদ ও প্রাণ কোরবানী ব্যতিত অতীতেও ইসলাম কায়েম হয়নি, ভবিষ্যতেও কায়েম হবেনা। আর তা দান করতে হবে সুশৃঙ্খল ও বৈজ্ঞানিক পন্থায়। যে পন্থা হলো- জামাত বদ্ধ অবস্থায় নিয়মতান্ত্রিকভাবে নবী করীম (সাঃ) এর ন্যায় ইসলামী আন্দোলন করে যাওয়া। ইহকালীন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে পরকালীন অনন্ত সুখ উপভোগ করা যাবে।

নবী করীম (সাঃ) ও সাহাবাদের মধ্যে এ বিশ্বাস ছিল বিধায় সমগ্র পৃথিবীতে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেখা এবং বিভিন্ন এলাকায় ইসলামী হুকুমত কায়েম সম্ভব হয়েছিল। এ বিশ্বাস বক্ষে ধারন করে আবদুর রহীম বেরিয়ে যেতেন মানুষের দুয়ারে, রাজপথে, সংগ্রামী কাফেলায় সাথে সাথে দৈনিক পাঠ্যসূচীও একাগ্রচিত্তে সম্পন্ন করতেন।

১৯৮৭ সালের ১২ ফ্রেব্রুয়ারী হায়েনাদের রক্ত চোষা এক কমান্ডো হামলায় চট্টগ্রামের পটিয়া রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০ জন সহযাত্রী মারাত্মকভাবে আহত হয়। বাকি ও জাফর নামীয় দুজন শহীদও হন। ভাই হারানো ব্যাথায় আকুতি জানাতে, জালেম শাহীর জুলুমের প্রতিবাদ জানাতে এক সংগ্রামী কাফেলা এগিয়ে চলে রাজপথে। যেহেতু অন্যায়ের প্রতিবাদ জানানোর প্রথা নাগরিক অধিকার দিনটি ছিল ১৯৮৭ সালের ১৪ ফ্রেব্রুয়ারী। হাফেজ আবদুর রহীমসহ অনেক দ্বীনি ভাই আগুনের দ্বীপ জ্বালিয়ে রাজপথে বেরিয়ে পড়ে।

মনজিলে পৌঁছার দীপ্ত শপথ নিয়ে তৌহিদী পতাকা হস্তে ধারণ করে আগুনের ফুলকি ছিটিয়ে সবার অগ্রে হাফেজ আবদুর রহীম আগুয়ান। চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার মোড় অতিক্রমকালে হঠাৎ জালেম শাহীর মৃত্যুঘাতি বোমা এসে পড়ে হাফেজ আবদুর রহীমের বুকে। ৩০ পারা কুরআন বক্ষে ধারনকারী শাহাদাতের অমীয় সুধা লাভের আশায় বুক পেতে নেয় শত্রুর বোমা, মূহুর্তের মধ্যেই হাফেজ আবদুর রহীম শাহাদাতের স্বর্গীয় সুধা আবাহনে শামিল হয়ে যান হযরত হাসান, হোসাইন এবং হামযা (রঃ) এর কাফেলায়।

তৎক্ষনাৎ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত প্রতি ঘরে শুরু হয় শোকের মাতম। জাতীয় সংসদে চলে বিতর্ক। বিশ্ব ইসলামী আন্দোলন লন্ডন, আমেরিকা সহ বিভিন্ন দেশে চলে বিক্ষোভ মুসলিম দেশ সমুদ্রের শহরে বন্দরে চলে দোয়ার মাহফিল। জাতীয় সংবাদপত্র, দেশী-বিদেশী প্রচার মাধ্যম- বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, রেডিও তেহরানসহ বিশ্বের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের অন্তরে গেঁথে যায় শহীদ আবদুর রহীমের নাম।

পিতা হয়ে শরীরের অবিচ্ছেদ্য অংশ পুত্রের জানাযায় ইমামতি করা, স্বহস্তে পুত্রকে দাফন করা, কতখানি হৃদয় বিদারক তা একমাত্র ভুক্তভোগীই বলতে পারবেন। আপন সন্তানকে দ্বীনের পথে কোরবানী করে খরিদ করে নিয়েছেন বেহেশ্ত -ইহাই বড় সান্ত্বনা।