জনবল সংকটে সাভারের পশু খাদ্য কারখানা

ঢাকা

।। মোঃ আল মামুন খান,সাভার প্রতিনিধি ।।

ঢাকার সাভারের বিশমাইল এলাকায় অবস্থিত প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন পশু খাদ্য কারখানা। এই প্রতিষ্ঠানটি জনবল সংকটে ভুগছে বলে জানা গেছে। তথ্য অধিকার আইনে এখানের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কার্যালয়ে অতিরিক্ত দায়িত্বরত প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা সমরেশ কুমার এর নিকট তথ্য চেয়ে তথ্য প্রাপ্তির পর অন্যান্য বিষয়ের সাথে এই অপ্রতুল জনবলের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

জাহাংগীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশমাইল গেট এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাথেই সাভার পশু খাদ্য কারখানা। প্রথম দর্শণে রঙ জ্বলা বিবর্ণ একটি ওয়্যারহাউজ দৃশ্যমান হবে দর্শকের কাছে। দীর্ঘ লোহার গেট পার হলেই একটু সামনে ডাইনে একতলা অফিস ভবন। মোট দুইটি কক্ষ। এর একটি প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার এবং অপরটি হিসাব রক্ষক কাম ক্যাশিয়ার ও অন্য স্টাফদের। তবে এই প্রতিবেদক যে কয়েকবার ওখানে গিয়েছেন, এখানের দায়িত্বরত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সমরেশ কুমারকে পান নাই। এই কর্মকর্তা সাভার কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামার এর এ,পি,ও’র চলতি দায়িত্বে থাকায় সেখানেই বসেন। পশু খাদ্য কারখানার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পদটি শূণ্য থাকাতে তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন এখানে।

সাভার কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামার এর উপ-পরিচালক মোঃ লুৎফর রহমান খান এই পশু খাদ্য কারখানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তবে এই পদটি অর্গানোভুক্ত পদ নয়। অন্য যারা বর্তমানে এখানে কর্মরত রয়েছেন তারা হলেন- মোঃ আব্দুর রাজ্জাক, হিসাব রক্ষক কাম ক্যাশিয়ার, সুনীতি রাণী হালদার, অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক, মোঃ শহীদুল আলম, অফিস সহায়ক, মোঃ শাহাদত হোসেন, অফিস সহায়ক, মোঃ মকবুল হোসেন, মালী। এছাড়া দুইজন দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে আছেন- মোঃ মাহফুজ মিয়া এবং মোঃ কবির হোসেন। আর মোঃ জামাল উদ্দিন এবং মোঃ মহব্বত হোসেন নামের দুইজন ড্রাইভার প্রেষণে অন্যত্র কর্মরত রয়েছেন।

যে সকল পদ সরকারি এই কারখানায় শূণ্য রয়েছে সেগুলি হলো- প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (১টি), ফোরম্যান (১টি), মেকানিক কাম মেশিন অপারেটর (১টি), মিল এ্যাটেনডেন্ট (১টি), নিরাপত্তা প্রহরী (২টি), পরিচ্ছন্নতা কর্মী (১টি) এবং এম.আর. শ্রমিক (৩টি) সহ মোট ১০টি পদ শূণ্য রয়েছে।

এই পদগুলি শূণ্য থাকাতে দেশের বিভিন্ন জেলা কৃত্তিম প্রজনন কেন্দ্রগুলি সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য জায়গায় প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্য রপ্তানি এবং প্রয়োজনীয় খাদ্য আমদানী করা সহ সম্পূর্ণ কর্মকান্ড ব্যহত হচ্ছে। কর্মরত অন্যান্য স্টাফদের কাছ থেকেও এই শূণ্য পদের বিড়ম্বনার নানাবিধ বিষয় জানা গেছে। মোট কথা, সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির জন্য এই পদগুলিতে দ্রুত নিয়োগ প্রদান জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তথ্য অধিকার আইনে- ২০১৬-১৭ এবং ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে বছর ভিত্তিক পশু খাদ্য আমদানীর পরিমান, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নাম ও মালামাল প্রদানের চালানকপি পেতে চাওয়া হয়েছিলো। এ প্রসংগে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ীঃ
২০১৬-১৭ অর্থ বছরে পশু খাদ্য কারখানায় প্রারম্ভিক জের ছিলো- ১. গমের ভূষিঃ ৬৪,৩০৬ কেজি, ২. আস্ত ভুট্টাঃ ১০,৩০৮ কেজি, ৩. আস্ত খেসারিঃ ৯০২ কেজি, ৪. সয়াবিন মিলঃ ৪,৮০৯ কেজি, ৫. লবণঃ ১,২৭২ কেজি সহ সর্বমোট প্রারম্ভিক জের = ৮১,৫৯৭ কেজি।

এই অর্থ বছরে অনুমোদিত ঠিকাদারের মাধ্যমে মোট খাদ্য আমদানী/সরবরাহ প্রাপ্তির পরিমান ৫২,৪০৬ কেজি। এর ভিতরে- ঠিকাদার মেসার্স বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স এর মাধ্যমে ৪ বারে মোট ২১,৬৫১ কেজি গমের ভূষি, একই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মোট ৫ বারে ১৯,৬১৬ কেজি আস্ত ভুট্টা, মোট ২ বারে ৯,১৩৯ কেজি আস্ত খেসারী এবং ১বারে ২০০০ কেজি সয়াবিন মিল আমদানী করা হয়েছে।

একইভাবে ২০১৭-১৮অর্থ বছরে মোট ১,১৯,০৩৪ কেজি পশু খাদ্য আমদানীকরা হয় মোট ৪টি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। মেসার্স বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স ১৭ বারে মোট ৮৩,৫০৩ কেজি গমের ভূসি, মেসার্স তুষার এন্টারপ্রাইজ মোট ৪ বারে ২০,৫৩১ কেজি আস্ত ভুট্টা, মেসার্স নাবিল পরিবহন মোট ৩ বারে ১২,০০০ কেজি আস্ত খেসারী এবং মেসার্স শিখা এন্টারপ্রাইজ ১বারে ১,০০০ সয়াবিন মিল ও ২বারে ২,০০০ কেজি সাধারণ লবণ সরবরাহ করে।

২০১৬-১৭ সালে সাভারের পশু খাদ্য কারখানা থেকে খাদ্য প্রক্রিয়া জাত করে দেশের মোট ১৩টি জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রে মোট ৯৫,০০০ কেজি, মহিষ উন্নয়ন খামার, সন্তোষ, টাংগাইলে ৬,০০০ কেজি, ভি,টি,আই, ময়মনসিংহে ২,০০০ কেজি, কোয়ালিটি কন্ট্রোল অফ ভেকসিন এন্ড ড্রাগস শাখা, এল,আর,আই, মহাখালীতে ৫,০০০ কেজি, এ্যানিমেল রিয়ারিং শাখা, এল,আর,আই, মহাখালীতে ১,৫০০ কেজি, বি আর আর আই, গাজীপুরে ১২,০০০ কেজি, মোঃ আক্কাছ আলী, বি আর আর আই, গাজীপুরে ৪০ কেজি এবং পুলিশ সুপার, সাতক্ষীরা কে ৪০০ কেজি সহ উক্ত অর্থ বছরে সর্বমোট ১,২১,৯৪০ কেজি খাদ্য রপ্তানি/সরবরাহ করা হয়।

আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশের মোট ১৩টি জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রে মোট ৮২,৪০০ কেজি, ভি,টি,আই, ময়মনসিংহে ৪,০০০ কেজি, কোয়ালিটি কন্ট্রোল অফ ভেকসিন এন্ড ড্রাগস শাখা, এল,আর,আই, মহাখালীতে ৬,৫০০ কেজি, এ্যানিমেল রিয়ারিং শাখা, এল,আর,আই, মহাখালীতে ২,০০০ কেজি, বি,আর,আর,আই গাজীপুরে ১৪,০০০ কেজি এবং মোঃ সিরাজুল ইসলাম, চানগাও, সাভার কে ১৬০ কেজি সহ সর্বমোট ১,০৯,০৬০ কেজি খাদ্য প্রক্রিয়া জাত করে রপ্তানী/ সরবরাহ করা হয়।

২০১৬-১৭ সালে মেসার্স বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স, খসরুবাগান, বাজার বাসস্ট্যান্ড, সাভার, ঢাকা-এই একটি মাত্র ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান খাদ্য সরবরাহ করেছে। এসময় ২৯.০৪.২০১৬ ইং তারিখে দৈনিক কালের কন্ঠে এবং ২৮.০৪.২০১৬ ইং তারিখে The News Today পত্রিকায় খাদ্য সরবরাহের টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিলো।

অন্যদিকে, ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে মেসার্স বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স, মেসার্স নাবিল পরিবহন, মেসার্স শিখা এন্টারপ্রাইজ এবং মেসার্স তুষার এন্টারপ্রাইজ – এই চারটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান খাদ্য সরবরাহ করেছে। দৈনিক কালের কন্ঠ পত্রিকায় গত ১৩.০৪.২০১৭ ইং তারিখে এবং The News Today পত্রিকায় একই তারিখে এতদসংক্রান্ত টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিলো।

প্রসংগত, গো-খাদ্য উপকরণ গ্রহণ কমিটির (পদাধিকার বলে যিনি যখন কর্মরত থাকেন) সদস্যগণ হলেন- ১. সহকারী পরিচালক (প্রশাসন), কেন্দ্রীয় গো প্রজনন ও দুগ্ধ খামার, সাভার, ঢাকা, ২. ডেইরী অফিসার, কেন্দ্রীয় গো প্রজনন ও দুগ্ধ খামার, সাভার, ঢাকা, ৩. সহকারী পরিচালক (ফডার), কেন্দ্রীয় গো প্রজনন ও দুগ্ধ খামার, সাভার, ঢাকা এবং ৪. প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, পশু খাদ্য কারখানা, সাভার, ঢাকা।

এই প্রতিবেদকের তথ্য প্রাপ্তির দিন (০২.০২.২০১৯ ইং) পশু খাদ্য কারখানা, সাভার এ মজুদ গো খাদ্য উপকরণের পরিমাণ ছিলো- ১. গমের ভূষিঃ ১০,৫৬৫ কেজি, ২. আস্ত ভুট্টাঃ ৩,৮১৭ কেজি, ৩. আস্ত খেসারীঃ ৩,৮৪৯ কেজি, ৪. সয়াবিন মিলঃ ৪,২৯৩ কেজি এবং ৫. লবণঃ ৪৪১ কেজি সহ সর্বমোট ২২,৯৬৫ কেজি।

তবে গত দুই অর্থ বছরে গো খাদ্য সরবরাহকারী মাত্র চারটি (০৪) ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এই পশু খাদ্য কারখানায় গো খাদ্য সরবরাহ করেছেন। এদের বাইরে নতুন কোনো সরবরাহকারী দেখতে পাওয়া যায়নি।