শেরপুরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীরাও ভুমিকা রাখছে

আমাদের দেশের শহরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নত হচ্ছে গ্রাম, গ্রামের অর্থনীতি। আর এই গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে নারীরা। গ্রাম-শহর সমানভাবে উন্নত হলেই একটা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। কেবলমাত্র শহরের উন্নয়ন দিয়ে কখনই একটা দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধশালী করা সম্ভব নয়।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে সেখানকার গ্রামীণ অর্থনীতি বেশ শক্তিশালী। আর গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষের চেয়ে নারীরাই বেশি ভূমিকা পালন করে থাকেন।

বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের ‘গ্রাম-শহর সমান উন্নতি’ নীতির কারণে অনেকেই শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন, অবদান রাখছেন দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে। তাদেরই একজন শেরপুর উপজেলার বিশালপুর ইউনিয়নের বামিহাল চৌমুহনী গ্রামের মনিরুজ্জামানের স্ত্রী সুরভি আক্তার।

সুরভি আক্তার বলেন, শিক্ষার সনদ নিয়ে চাকুরি নামের সোনার হরিণের পিছনে ছুটে চলে কান্ত প্রায় হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলাম। গত কয়েক বছর ধরে স্বামী মাছ চাষ করে কোনমত সংসার চালাচ্ছিল। এভাবে চলতেই গত ২০১৭ মাছ চাষে বড় ধরনের লোকশান গুনতে হয়। সংসার চালাতে খুব কষ্ট হয়ে যেত আমাদের পরিবারে। ছুটে আসি শেরপুর উপজেলা প্রানী সম্পদ অফিসে।

অফিসের সহযোগীতায় ও ভেটেরিনারি সার্জন পিএএ ডাঃ রায়হানের নিকট হতে গত ১ বছর পূর্বে প্রশিক্ষণ নিয়ে মাছ চাষের পাশাপাশি হাঁস ও দেশি মুরগীর খামার শুরু করি। সফলতার বিকিরণে আলোকিত হতে থাকে আমার নিজের পরিবার, আসে আর্থিক সচ্ছলতা, সাবলম্বিতা আর পরিবারে স্থাপিত হয় সিদ্ধান্ত দেয়ার অধিকার।

সরেজমিনে দেখা যায়, এখন সব মিলিয়ে ৯টি দেশি মুরগির সেড স্থাপন করেছে সে। আর এগুলো সবচেয়ে কম খরচে পরিবেশ বান্ধব টেকসই সেড। যেখানে ঘর নির্মানে খরচ হত ২-৩ লক্ষ টাকা সেখানে ৩০-৪০ হাজার টাকায় সেড স্থাপন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে খামারটিতে বিশাল সংগ্রহশালা। এখন সেখানে ২ হাজার ৫’শ টি দেশি মুরগি ও ১ হাজার হাঁস পালন করছে।

যা থেকে প্রায় প্রতিদিন ১২শ দেশি মুরগির ডিম উৎপাদন হচ্ছে। সুরভি আক্তার আরো জানান, আমার প্রতি মাসে প্রায় লক্ষাধিক টাকার মত আর্থিক আয়। আর এখন আমরা দুজন সহ খামারে আরো দুইজন মানুষের কর্মসংস্থানও হয়েছে। আমার একটি মেয়ে ইউনিভার্সিটিতে, আরেকটি মেয়ে কলেজে পড়াশোনা করছে। আমার সংসারের সম্পূর্ন খরচ চলে এই খামার থেকে।

উপজেলা প্রাণি সম্পদের কারিগরি পরামর্শে সফলতার দৃশ্যমান চিহ্ন দেখে মনটা ভরে যায় গ্রামবাসীর। বিগত ৩-৪ বছরে শেরপুর উপজেলার প্রাণিসম্পদ বিভাগের সহযোগিতায় উপজেলার সর্বস্তরে গড়ে উঠেছে গরু, ছাগল, ভেড়া, হাস ও দেশী মুরগির অনেক খামার। যেমন- ঘোলাগাড়ি কলেনী গ্রামের মজিদা এক ছাগল থেকে ৪০টি ছাগল ও ৫টি গরু, ১শ ২টি দেশি মুরগি, উচরং গ্রামের তামান্না আখিঁ ১৮টি গরু পালন করেন আধুনিক খামার স্থাপন করেছেন সেখানে ২ জনের কর্মসংস্থান, তালপুকুড়িয়ার রাজ বিথি খাতুন ২৬টি গরু, কাশিয়াবালা গ্রামের নাছিমা ৬টি গরু, লক্ষিখোলা গ্রামের তাসলিমা খাতুনের ১৪ ছাগল, চকপাথালিয়া গ্রামের নাদিরা বেগম ৬টি গরু পালন করছে এছাড়ও উপজেলায় রয়েছে প্রায় ৬০/৭০ জন নারী খামারী পালন করছে গরু, হাঁস, মুরগী ছাগল, ভেড়া। আর এরফলে নারীরা যেমন অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হচ্ছেন আবার গ্রামীণ অর্থনীতিও চাঙ্গা হচ্ছে।

উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন পিএএ ডাঃ মোঃ রায়হান বলেন, সুরভি সহ অনেক বেকার যুবক নারী আজ সফল উদ্যোক্তা হওয়ার বাস্তব গল্প শেরপুরসহ সারা বাংলাদেশেই ছড়িয়ে পড়ছে। ইনশাল্লাহ দেশের মানুষের জন্য, দেশের জন্য সকলের সহযোগিতায় ভালো কাজের সম্প্রসারণ করেই যাবো আজীবন।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ আমির হামজা বলেন, প্রাণিসম্পদের দুয়ার সকলের জন্য খোলা। প্রয়োজনের তাগিদে খামারিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আমরা বিনামুল্যে চিকিৎসা প্রদান করে আসছি। আর এ কারেণে উপজেলায় বর্তমানে গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁস, মুরগী পালনের পাশাপাশি অনেক শাক-স্বব্জির চাষ অথবা পুকুরে মাছ চাষ করছেন।

এতে গ্রামীন অর্থনীতি চাঙ্গ হয়ে উঠছে। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিয়াকত আলী বলেন বলেন, আগে নারীরা তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানোর জন্য গ্রাম থেকে শহরে চলে আসত। এর মূল কারন ছিল গার্মেন্টস শিল্প। মূলত নারীরা শহরেই আসত এসব পোশাক কারখানায় চাকরি করে নিজের খরচ চালানোর জন্য। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য গ্রামীণ অর্থনীতিকেও চাঙ্গা করতে চায় এই সরকার।

এজন্য নেয়া হয়েছে বেশ কিছু উদ্যোগ। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে বর্তমান সরকারের একটি বাড়ী, একটি খামার প্রকল্পে আগ্রহী হয়ে এখন অধিকাংশ বাড়ীতেই গড়ে উঠেছে খামার এতে সাবলম্বী হচ্ছেন বাড়ীর মেয়েরাই বেশি।

বার্তাবাজার/এম.কে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর