মানিকগঞ্জের বালিয়াটি জমিদার বাড়ি বাংলাদেশের ১৯ শতকে রেঁনেসা যুগের স্থাপত্য কৌশলের সাহায্যে নির্মিত অন্যতম একটি নিদর্শন। জেলার সাটুরিয়া উপজেলায় অবস্থিত জমিদার বাড়িতে নির্মিত প্রাসাদসমূহ বাংলাদেশের অন্যতম স্থাপনা বা প্রত্নতত্ত্ব।
জমিদার পরিবারের গোড়াপত্তন করেন খ্রিষ্টীয় আঠার শতকের মাঝামাঝি সময়ের বড় মাপের লবণ ব্যবসায়ী ও মহাজন জনৈক গোবিন্দ রাম সাহা। তিনি চারপুত্র দোধী রাম সাহা, পণ্ডিত রাম সাহা, আনন্দ রাম সাহা ও গোলাপ রাম সাহা উত্তরসূরি রেখে প্রয়াত হয়েছিলেন।

সম্ভবতঃ এই চার পুত্রই উনিশ শতকে বালিয়াটি ৫.৮৮ একর জমির উপর এই বিশাল প্রাসাদগুলো নির্মাণ করেছিলেন। বালিয়াটির প্রাসাদটি বর্তমানে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধিন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক ১৯৬৮ সনের এন্টিকুইটি এ্যাক্ট ১৪ নং ধারা(১৯৭৬ সনে সংশোধিত) এর আওতায় সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত হচ্ছে।

চারদিকে মজবুত প্রাচীরঘেরা চারটি ভাগে দক্ষিণ দিক থেকে উত্তরে ৭ টি খণ্ডে মোট আটটি দ্বিতল ও তিনতলা বিশিষ্ট বিশাল প্রাসাদ রয়েছে। প্রাসাদটির দক্ষিণ দিকে প্রবেশদ্বার হিসেবে চারটি খিলান দরজা ও উপরে কারুকার্য খচিত চারটি সিংহ। উত্তরে বিশাল আকৃতির ছয় ঘাট বিশিষ্ট পুকুর রয়েছে। পুকুরে লাল শাপলার সমারোহে সুন্দর্য্য বৃদ্ধি করেছে। সম্মুখভাগের ইমারতগুলোতে কোরিন্থিয়ানস স্তম্ভের সারি রয়েছে।
এছাড়াও স্থাপনাগুলোতে দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য, ভিতরে অন্ধরমহল, সম্মুখভাগের পশ্চিম পাশে নাট্যমঞ্চ বাড়িটির শোভাবর্ধন করছে। প্রাসাদটিতে রয়েছে বিভিন্ন মাপের ও আকৃতির দুই শতাধিক কোঠা। আরো রয়েছে স্নানাগার, প্রক্ষালন কক্ষ, চারটি অন্ধর মহল, বিভিন্ন ভাগে সুদর্শন কূপ প্রভৃতি। এর আকর্ষণীয় দিক হল সারিবদ্ধ করিথিয়ান থাম, লোহার বীম, ঢালাই লোহার পেচানো সিড়ি, দেয়াল ও সম্মুখভাগে উপরে রয়েছে প্রাচীন কারুকার্য। বর্তমানে বাড়িটির পশ্চিম দিক থেকে দ্বিতীয় প্রাসাদটির নিচতলা ও দ্বিতীয় তলায় জাদুঘর হিসেবে পুরোনো প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষণ করা হয়েছে।
জাদুঘরের নিম্ন তলায় জমিদারদের ব্যবহৃত বিভিন্ন আকৃতির অনেকগুলো প্রাচীন সিন্ধুক রয়েছে। রয়েছে ব্যবহৃত দামী কাঠের খাট, জানালার রঙিন কাচ, বিশাল আকৃতির বেলজিয়াম আয়না, শ্বেতপাথরের দেয়াল,কারুকার্য খচিত পাথর, তাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্রসহ অনেক প্রত্নতত্ত্ব।
প্রাসাদটি সম্পর্কে রক্ষণাবেক্ষণ কর্মকর্তা জেলাল মাহমুদ বলেন, জমিদার পরিবার চলে যাবার পর এখানে উপজেলার দুজন কর্মকর্তা ছিলেন। ২০০৮ এর দিকে এই প্রাসাদকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। আমার জানামতে ২০০৮ সাল পর্যন্ত জমিদারের বংশধর জমিদার বাড়ি থেকে কিছু দূরে বসবাস করতে দেখা গেছে।
বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেকট্রিক মিডিয়ার লেখালেখির কারণেই আজ এই প্রাসাদকে প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ হচ্ছে। এটি ভ্রমণপিপাসুদের জন্য সুন্দর একটা স্থান। যদি ঠিক মত সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হয় তাহলে দেশের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে এটি গুরুত্ব লাভ করবে। সিংগাইরের দর্শনার্থী কুয়েত প্রবাসী বলেন, সন্তান নিয়ে এখানে বেড়াতে এসে খুব আনন্দ উপভোগ করেছি। তারা জমিদার প্রাসাদের কারুকার্য দেখে মুগ্ধ হয়েছে। আগামীতে বন্ধুদের নিয়ে আবার আসবেন বলে জানান।
বার্তাবাজার/এম.কে